মেসির 'রোড টু গ্রেটনেস': জীবনের যে ৬টি চরম বাধা পেরিয়ে আজ তিনি সাফল্যের অন্য উচ্চতায়
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা জাদুকর লিওনেল মেসির আজকের এই অনন্য উচ্চ অবস্থানের পেছনে আছে এক রূপকথার মতো উত্থানের গল্প। সময়টা সবসময় তাঁর অনুকূলে ছিল না। তীব্র যন্ত্রণাদায়ক ছিল তাঁর শৈশব, কৈশোর ও তারুণ্যের প্রথম সময়। আজ যিনি কোটি কোটি তরুণের অনুপ্রেরণা, তাঁকে ছোটবেলা থেকেই জীবনে চলার পথে প্রতি পদে পদে চরম প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের এক নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্ম নেওয়া এই ফুটবল মহাতারকার সেই কঠিন লড়াইয়ের গল্পগুলো জানলে তাঁর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর মুগ্ধতা আরও বেড়ে যায়।

কঠিন লড়াইয়ের গল্পগুলো জানলে তাঁর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর মুগ্ধতা আরও বেড়ে যায়
কঠিন লড়াইয়ের গল্পগুলো জানলে তাঁর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর মুগ্ধতা আরও বেড়ে যায়

গ্রোথ হরমোনের ঘাটতি ও যন্ত্রণাদায়ক চিকিৎসা

মাত্র ১১ বছর বয়সে মেসির শরীরে 'গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি' (GHD) ধরা পড়ে। এর ফলে তার শরীরের স্বাভাবিক বৃদ্ধি থমকে যায়। চিকিৎসকেরা আশঙ্কা করেছিলেন, তিনি হয়তো কখনোই সাধারণ মানুষের মতো উচ্চতা পাবেন না। এই রোগ থেকে বাঁচতে ছোট্ট মেসিকে টানা কয়েক বছর প্রতি রাতে নিজের পায়ে অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক হরমোন ইনজেকশন পুশ করতে হতো।

আর্থিক দৈন্যদশা ও ক্লাবগুলোর প্রত্যাখ্যান

মেসির এই হরমোন চিকিৎসার খরচ ছিল প্রতি মাসে প্রায় ১,০০০ মার্কিন ডলার, যা তার কারখানার শ্রমিক বাবার পক্ষে বহন করা অসম্ভব ছিল। আর্জেন্টিনার বিখ্যাত ক্লাব 'নিওয়েলস ওল্ড বয়েজ' এবং 'রিভার প্লেট' মেসির অবিশ্বাস্য প্রতিভা দেখেও শুধুমাত্র এই বিপুল চিকিৎসার খরচ বহন করার ভয়ে তাকে দলে নিতে অস্বীকৃতি জানায়।

বিজ্ঞাপন

স্পেন যাত্রায় স্ট্রাগলের অধ্যায়

১৩ বছর বয়সে বার্সেলোনা ক্লাবের আশ্বাসে মেসি স্পেনে পাড়ি জমান। কিন্তু সেখানে গিয়েও ভাগ্য সহজে সহায় হয়নি। স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের আমলাতান্ত্রিক ও আইনি জটিলতার কারণে আন্তর্জাতিক অনূর্ধ্ব-১৪ খেলোয়াড় হিসেবে মেসি প্রথম কয়েক মাস কোনো অফিসিয়াল ম্যাচ খেলার অনুমতি পাননি। কেবল অনুশীলনের মাঝেই বন্দি থাকতে হয়েছিল তাকে, যা একজন ক্ষুদে প্রতিভার জন্য ছিল চরম মানসিক নির্যাতন।

ছোটবেলতেই অনেক প্রতিকূলতা সইতে হয় মেসিকে
ছোটবেলতেই অনেক প্রতিকূলতা সইতে হয় মেসিকে

পরিবারের ভাঙন ও একাকীত্ব

স্পেনের পরিবেশ ও সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিতে না পেরে মেসির মা এবং ভাই-বোনেরা আর্জেন্টিনায় ফিরে যান। বার্সেলোনায় কেবল বাবা হোর্হে মেসির সাথে থেকে যান লিও। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মা, বোন আর বন্ধুদের ছেড়ে এক ভিন্ন দেশে থাকার একাকীত্ব তাকে তীব্র বিষণ্ণতায় ডুবিয়ে দিয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

ড্রেসিংরুমের অবহেলা ও 'বোবা' তকমা

লা মাসিয়া একাডেমির ড্রেসিংরুমে মেসি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত ও অন্তর্মুখী। কাতালান ভাষার ভিন্নতা এবং লাজুক স্বভাবের কারণে তিনি কারও সাথে কথা বলতেন না।

কেউ ভাবতেই পারেনি এই শান্ত ছেলেটিই ফুটবল বিশ্ব কাঁপাবে
কেউ ভাবতেই পারেনি এই শান্ত ছেলেটিই ফুটবল বিশ্ব কাঁপাবে

এই কারণে সতীর্থরা তাকে 'এল মুতো' বা 'বোবা' বলে ডাকত। মাঠে নামার আগ পর্যন্ত কেউ ভাবতেই পারেনি এই শান্ত ছেলেটিই ফুটবল বিশ্ব কাঁপাবে।

গুরুতর ইনজুরি ও ক্যারিয়ারের শঙ্কা

২০০১ সালে একটি জুনিয়র ম্যাচে প্রতিপক্ষের কড়া ট্যাকেলে মেসির বাঁ পায়ের ফিবুলা হাড় ভেঙে যায়। হরমোনের সমস্যার কারণে তার শরীর এমনিতেই নাজুক ছিল। এই ইনজুরির কারণে তাকে মাসের পর মাস মাঠের বাইরে কাটাতে হয়। অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, এই শারীরিক গঠন নিয়ে মেসি হয়তো আর কখনোই পেশাদার ফুটবলে ফিরতে পারবেন না।

প্রতিটি ম্যাচেই তাকে প্রতিপক্ষের বুটের আঘাত আর হেভি ফাউল সহ্য করে খেলে যেতে হতো
প্রতিটি ম্যাচেই তাকে প্রতিপক্ষের বুটের আঘাত আর হেভি ফাউল সহ্য করে খেলে যেতে হতো

শারীরিক গঠন নিয়ে সন্দেহ:

ছোটখাটো গড়নের কারণে প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা তাকে মাঠে পাত্তাই দিতে চাইত না। কিন্তু যখনই মেসি তার জাদুকরী ড্রিবলিংয়ে সবাইকে পরাস্ত করতেন, তখনই তাকে থামাতে ডিফেন্ডাররা হিংস্র ফাউলের আশ্রয় নিত। প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই তাকে প্রতিপক্ষের বুটের আঘাত আর হেভি ফাউল সহ্য করে খেলে যেতে হতো।

গ্রেটেস্ট অব অল টাইম 'গোট' মেসির রোড টু গ্রেটনেস সহজ ছিল না মোটেও
গ্রেটেস্ট অব অল টাইম 'গোট' মেসির রোড টু গ্রেটনেস সহজ ছিল না মোটেও

লিওনেল মেসির জীবনের এইসব বাধা ও সেগুলোকে জয় করার গল্প প্রমাণ করে যে, নিখাদ প্রতিভা থাকলেও সাফল্যের জন্য কতটা ত্যাগ ও ধৈর্যের প্রয়োজন হয়। সমস্ত শারীরিক, আর্থিক এবং মানসিক প্রতিবন্ধকতাকে পায়ের জাদুতে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিয়ে মেসি আজ ফুটবল বিশ্বের মুকুটহীন সম্রাট। গ্রেটেস্ট অব অল টাইম 'গোট' মেসির রোড টু গ্রেটনেস সহজ ছিল না মোটেও। কিন্তু এই বাধাগুলো পেরিয়ে আসার কারণেই আজ তিনি ধরা ছোঁয়ার বাইরে।

সূত্র: মিডিয়াম, উইকিপিডিয়া, ইনসাইড ফিফা

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬, ০১: ৪১
বিজ্ঞাপন