
ঈদ এখন নস্টালজিয়া বলতে পারি। ঈদের নাম শুনলেই মনের কোণে এক টুকরা রঙিন শৈশব ভেসে ওঠে। আমার কাছে শৈশবের ঈদ মানেই ছিল এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। আজকের পরিণত বাঁধনের কাছে ঈদ মানে যতটা দায়িত্ব, ছোটবেলার সেই বাঁধনের কাছে ঈদ ছিল ততটাই বাঁধভাঙা উল্লাস। সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আজও বুকের ভেতরটা নস্টালজিয়ায় হাহাকার করে ওঠে।

আমার বাবা সরকারি চাকরিজীবী ছিলেন, তাই তাঁর কর্মসূত্রে আমাদের বেশির ভাগ সময় কাটত ঢাকার বাইরে। ফলে আমাদের কাছে ঈদ মানেই ছিল নাড়ির টানে ঢাকা ফেরা। রোজার ঈদে আমরা চলে আসতাম নানাবাড়িতে। সারা বছর ধরে ক্যালেন্ডারের পাতার দিকে তাকিয়ে থাকতাম কবে সেই বিশেষ দিনটি আসবে! নানাবাড়িতে সব কাজিনরা যখন এক হতাম, তখন মনে হতো উৎসবের ষোলোকলা পূর্ণ হয়েছে। সারা দিন ঘুরে বেড়ানো, বড়দের ফাঁকি দিয়ে দুষ্টুমি আর মামাবাড়ির সেই অনাবিল আদর—সব মিলিয়ে এক অন্য জগৎ ছিল সেটি। আর কোরবানির ঈদে আমাদের গন্তব্য ছিল বিক্রমপুর। গ্রামীণ পরিবেশে ঈদের সেই ভিন্ন আমেজ আজও আমার স্মৃতিতে অমলিন।
ছোটবেলার ঈদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল নতুন জামা। এখনকার মতো যখন-তখন কেনাকাটার সুযোগ তখন ছিল না। ঈদুল ফিতর আর ঈদুল আজহা—এই দুটো ঈদই ছিল মনের মতো ভালো পোশাক পাওয়ার প্রধান উপলক্ষ।

সেই নতুন কাপড়ের গন্ধ আর তা যত্ন করে আলমারিতে তুলে রাখার যে আনন্দ, তা আজকের দামি ব্র্যান্ডের পোশাকে খুঁজে পাওয়া দায়। সেই একটি বা দুটি পোশাকই ছিল সারা বছরের শ্রেষ্ঠ সঞ্চয়। আর ছিল ঈদের সালামির তীব্র আকর্ষণ। কার সালামি কত হলো, তা নিয়ে কাজিনদের মধ্যে চলত সূক্ষ্ম প্রতিযোগিতা। সেই ছোট্ট হাতের মুঠোয় নোটগুলো ধরে রাখার আনন্দ ছিল অমূল্য।
সময় বহমান, আর সেই সময়ের স্রোতে আমি এখন ‘বড়বেলার’ ঈদে উপনীত হয়েছি। এখনকার ঈদে আনন্দের চেয়ে দায়িত্বের পাল্লাটাই বেশি ভারী। আগে কেবল নিজে কী পাব, সেই ভাবনায় বিভোর থাকতাম, আর এখন পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটানোই আমার প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জীবনের এই পর্যায়ে এসে ঈদের সংজ্ঞাই বদলে গেছে।

তবে আমার বর্তমান ঈদের সবটুকু আনন্দ এখন আবর্তিত হয় আমার মেয়েকে ঘিরে। ঈদের সকালে ওর চোখে-মুখে যে খুশির ঝিলিক দেখি, তাতেই আমার ঈদ সার্থক হয়। ও যখন নতুন জামা পরে আয়নার সামনে দাঁড়ায় কিংবা ওর ছোট্ট আবদারগুলো পূরণ করি, তখন ওর মাঝেই আমি আমার হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে খুঁজে পাই। মেয়ের খুশিই এখন আমার খুশির একমাত্র উৎস।
শৈশবের সেই দলছুট আনন্দ আর মামাবাড়ির সেই আড্ডা হয়তো আর ফিরে আসবে না। ব্যস্ততা বেড়েছে, জীবন বদলেছে, সমাজ বদলেছে। তবু প্রতিটি ঈদে যখন মেয়ের হাত ধরি, তখন মনে হয় শৈশব হয়তো এভাবেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে। ছোটবেলার সেই ঈদ আজও ভীষণ মিস করি, কিন্তু বর্তমানের এই দায়িত্বশীল আনন্দের মাঝেও একধরনের তৃপ্তি আছে। এই প্রাপ্তি আর হারানো স্মৃতির মেলবন্ধনেই কাটছে আমার বড়বেলার ঈদ।
অনুলিখন: আশা জাহিদ
ছবি: আজমেরী হক বাঁধনের ইন্সটাগ্রাম