
বলিউডে ক্যাটরিনা কাইফের দীর্ঘ পথচলা শুধু সৌন্দর্য কিংবা পর্দায় তাঁর উপস্থিতির গল্প নয়। নাচের দক্ষতা থেকে অভিনয়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিজেকে আরও ভালো করে তোলার চেষ্টা করেছেন তিনি। তবে এত বছরের অভিজ্ঞতার পরও নারীকে নিজের শরীর নিয়ে নানা প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। বিশেষ করে সন্তান জন্মের পর শরীরের পরিবর্তন হয়ে ওঠে সমালোচনার উপলক্ষ। ক্যাটরিনা সেই প্রত্যাশার কাছে নতি স্বীকার না করে নিজের মতো করে এগিয়ে যেতে চান।
ভোগ ইন্ডিয়ার নভেম্বর-ডিসেম্বর ২০২৬ সংখ্যার প্রচ্ছদ ফিচারে এসব বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন অভিনেত্রী। ২০১৮ সালের পর প্রথমবারের মতো ম্যাগাজিনটির প্রচ্ছদে ফিরেছেন তিনি। সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে অভিনয়জীবন, নাচের প্রতি ভালোবাসা, কে বিউটির কাজ এবং পরিবারকে সময় দেওয়ার প্রসঙ্গ। আর ফটোশুটে তাঁর সাজে মিলেছে ঐতিহ্যবাহী নকশা, কারুশিল্প ও আধুনিক ফ্যাশনের মেলবন্ধন।
গত সেপ্টেম্বরে আম্বানিদের গণেশ চতুর্থীর অনুষ্ঠানে ক্যাটরিনার উপস্থিতির পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর শরীর নিয়ে কটাক্ষ শুরু হয়। সন্তান জন্মের এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে কেন তিনি আগের চেহারায় ফিরে আসেননি, তা নিয়েই ছিল সমালোচকদের প্রশ্ন।
তবে এসব মন্তব্যে নিজের জীবনযাপনের সিদ্ধান্ত বদলাতে চান না অভিনেত্রী। সাক্ষাৎকারে ক্যাটরিনা বলেন, “আমি আমার ফিটনেসের যাত্রা সম্পর্কে খুব সচেতন। আমি নিজের গতিতেই সেখানে পৌঁছাব।”

কাজের ক্ষেত্রেও ক্যাটরিনা বরাবরই মনোযোগী। একসময় তাঁর নাচকে যান্ত্রিক বলা হলেও কথকগুরু বীরু কৃষ্ণনের কাছে প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজেকে তৈরি করেছেন নতুনভাবে। ‘শীলা কি জওয়ানি’, ‘চিকনি চামেলি’ ও ‘কালা চশমা’র মতো গানে তাঁর পারফরম্যান্স সেই অধ্যবসায়েরই পরিচয় দেয়।
তবে এখন তাঁর কাছে কাজের পাশাপাশি ব্যক্তিগত জীবনেও ভারসাম্য রাখা গুরুত্বপূর্ণ। অভিনেত্রী, উদ্যোক্তা, মা, স্ত্রী, মেয়ে ও বোন। সব ভূমিকায় নিজেকে সময় দেওয়াকেই বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করেন তিনি।

ক্যাটরিনার নতুন ফটোশুটের অন্যতম আকর্ষণ তাঁর পোশাক। ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় কারুশিল্প, সমৃদ্ধ রং ও জমকালো গয়নার সঙ্গে আধুনিক কাটের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছে তিনটি আলাদা লুক।

প্রথম লুকে নজর কাড়ে উঁচু স্ট্যান্ড কলারের রঙিন প্যাচওয়ার্ক জ্যাকেট। লাল, সবুজ, টিয়া, সরষে ও কমলা রঙের কাপড়ের টুকরো একসঙ্গে জুড়ে তৈরি হয়েছে পোশাকটি। কোথাও জারদোজির সোনালি নকশা, কোথাও আয়না বা শিশার কাজ। পুঁতি, সিকুইন ও ক্রিস্টালের ঝিলিকও যোগ করেছে আভিজাত্য। জ্যাকেটের কিনারায় লাল পাইপিং রঙিন নকশাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

ভেতরে জলপাই সবুজ রঙের পেইসলি প্রিন্টের টপ এবং একই রঙের কুঁচিদার স্কার্ট। কোমরের সোনালি ঝালর পোশাকে এনেছে বাড়তি আভিজাত্য। গলায় মুক্তো ও অ্যান্টিক নকশার লকেটযুক্ত চোকার, কানে লম্বা ঝুমকা ও ইয়ার ক্লাইম্বার। খোলা ঢেউখেলানো চুল আর হালকা মেকআপে পুরো সাজে এসেছে কোমলতা।

দ্বিতীয় লুকে সাদা ও ক্রিম রঙের পোশাকে ফুটে উঠেছে লখনউয়ের চিকনকারির সূক্ষ্ম কাজ। কুর্তা ও লেহেঙ্গার সুতোর নকশার সঙ্গে ছোট সিকুইন যোগ করেছে মৃদু ঝিলিক। ভি-আকৃতির গলার নকশা, ফিতে ও ঝালরের ব্যবহারেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য।
তবে পোশাকটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ফোলানো বেলুন হাতা। হালকা ডোরাকাটা টেক্সচার ও কবজির কাছে কুঁচি দিয়ে তৈরি হাতার গড়নে ঐতিহ্যবাহী পোশাকেও এসেছে আধুনিকতা।

সাদা পোশাকের সঙ্গে গয়নায় রয়েছে রুপোর চুড়ি, লাল-সবুজ পাথর বসানো হাতফুল এবং মুক্তোর ঝালরযুক্ত সবুজ পাথরের লম্বা দুল। ব্রোঞ্জের আভা আর পিচ রঙের ঠোঁট পুরো সাজে এনেছে উষ্ণতা। উৎসব কিংবা ছোট অনুষ্ঠানের সাজে সাদা চিকনকারির সঙ্গে রুপোর গয়না মিলিয়ে নেওয়ার ভাবনা এখান থেকেই পাওয়া যেতে পারে।

তৃতীয় লুকে পোশাকের মূল আকর্ষণ গোলাপি ও তামাটে সোনালি টিস্যুর কাপড়। আলো পড়লে কাপড়ে তৈরি হচ্ছে ঝলমলে আভা। কাফতান-ধাঁচের পোশাকটির সামনে রয়েছে র্যাপ স্টাইলের ভি-গলা। কোমরের কাছে হালকা কুঁচি, চওড়া ঘণ্টার মতো হাতা এবং গলা ও হাতার কিনারায় সোনালি-রুপালি জরির সঙ্গে গোটা ও সিকুইনের কাজ সাজটিকে করেছে আরও সমৃদ্ধ। পোশাকের নিচে লাল রঙের অংশের ঝলকও যোগ করেছে বৈচিত্র্য।
গয়নায় এ লুকে রয়েছে ভিন্ন মেজাজ। গলায় মোটা রুপোর চোকার, কানে লম্বা সোনালি দুল এবং পায়ে ভারী রুপোর পায়েল। খালি পায়ে মেঝেতে বসে থাকা ক্যাটরিনার সাজে জমকালো পোশাকের পাশাপাশি স্বাভাবিক ও স্বচ্ছন্দ আবহও তৈরি হয়েছে।

অভিনয় থেকে নাচ, সব ক্ষেত্রেই নিজেকে আরও দক্ষ করে তোলার চেষ্টা করেছেন ক্যাটরিনা। নিজের সৌন্দর্যচর্চার ব্র্যান্ড কে বিউটির কাজেও তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত। পণ্যের গুণমান ও ব্যবহার নিয়ে তাঁর সূক্ষ্ম নজর রয়েছে বলেও জানিয়েছেন সাক্ষাৎকারে।
এখন পরিবারকে সময় দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে কিছুটা দূরে থাকাও তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে অভিনয়ে ফিরলে ভিন্ন ধরনের চরিত্রে নিজেকে দেখতে চান তিনি। বিশেষ করে ভিলেনের চরিত্রে অভিনয়ের আগ্রহের কথাও জানিয়েছেন।
ক্যাটরিনার নতুন ফটোশুটে যেমন ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন দেখা যায়, তেমনি তাঁর বক্তব্যেও স্পষ্ট নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার প্রত্যয়। অন্যের প্রত্যাশা নয়, নিজের প্রয়োজন ও স্বাচ্ছন্দ্য বুঝেই জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ে এগিয়ে যেতে চান তিনি।
ছবি: ভোগ ইন্ডিয়া