
কান চলচ্চিত্র উৎসবে বেলা হাদিদের অনুপস্থিতি সবাইকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছিল। বিশেষ করে ফ্যাশনপ্রেমী ও সমালোচকদের। কারণ, বেলা মানেই রেড কার্পেটে চোখধাঁধানো ফ্যাশনেবল লুক। তাঁকে নিয়ে সবার চিন্তার আরেকটি কারণ হলো, কিছুদিন আগে ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন এই সুপারমডেল। অর্থাৎ তাঁকে আর রানওয়েতে দেখা যাবে না। এ অবস্থায় লালগালিচায় বেলার অনুপস্থিতি অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু দেরিতে হলেও কানে দেখা মিলেছে তাঁর। বরাবরের মতো এবারও সুপার স্টাইলিশ লুকে। তবে সেই সঙ্গে পোশাকের মাধ্যমে দিয়েছেন রাজনীতির বার্তা।


বিভিন্ন সিনেমার প্রিমিয়ার ও অন্যান্য ইভেন্টের মতো বেলাকে ফ্রেঞ্চ রিভেরায় ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে। শুধু লালগালিচা নয়, এর বাইরেও স্টাইল স্টেটমেন্ট তৈরিতে যে কম যান না, সেটাই আরেকবার প্রমাণ করলেন ফ্যাশনপ্রেমীদের প্রিয় এই ট্রেন্ড সেটার। ঘুরে বেড়ানোর সময় তিনি ক্যামেরাবন্দী হন ফিলিস্তিনের ঐতিহ্যবাহী স্কার্ফ কেফিয়াহ-প্রাণিত ড্রেসে। এভাবে বেলা নিজের শিকড় ফিলিস্তিনের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সম্মান জানানোর পাশাপাশি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির নাগরিকদের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন তিনি।
বলে রাখা ভালো যে বর্তমান ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির দুই বিখ্যাত সহোদরা বেলা ও জিজি হাদিদ ফিলিস্তিন বংশোদ্ভূত। তাঁদের বাবা যুক্তরাষ্ট্রের নামকরা রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার মোহামেদ হাদিদের জন্ম ফিলিস্তিনের নাজারাথে। ১৯৪৭-৪৯ সালে যুদ্ধের সময় তাঁর পরিবার হাজারো ফিলিস্তিনির সঙ্গে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর বিভিন্ন আরব দেশে ও গ্রিসে শরণার্থী থাকার পর ১৪ বছর বয়সে মোহামেদ যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। সেখানেই পড়াশোনা শেষ করেন এবং পরে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা শুরু করেন। এখন এই শিল্পে তিনি বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। ফিলিস্তিনের প্রতি মোহামেদের মনে রয়েছে বিশেষ ভালোবাসা। সেটা তিনি নিজের সন্তানদের মধ্যে খুব ভালোভাবে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন। বেলা ও জিজি দুজনই তাঁদের ফিলিস্তিনি পরিচয় নিয়ে গর্ব করেন।


যখনই ফিলিস্তিন ইসরায়েলের আগ্রাসনের শিকার হয়েছে তখনই তাঁরা এর বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান নিয়ে সরব হয়েছেন। প্রাণনাশের হুমকিও বেলা ও জিজিকে থামাতে পারেনি। বেলাকে এর আগে ২০২১ সালে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘প্র-প্যালেস্টাইন র্যালি’-তে কেফিয়াহ পরা অবস্থায় দেখা যায়। এবার কানে তাঁকে কেফিয়াহ-প্রাণিত ড্রেসে দেখে ফ্যাশনপ্রেমীসহ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ফিলিস্তিনপন্থী জনগণ।
কানে পরা বেলার অন্যান্য পোশাকের মতো এটাও একটি ভিনটেজ ড্রেস। চেকার্ড প্যাটার্নের স্প্যাগেটি স্ট্র্যাপ মিডি ড্রেসটি নিউইয়র্ক-ভিত্তিক ডিজাইনার জুটি মাইকেল সিয়ার্স ও হাশিদার মোর্তেজার ২০০১ সালে তৈরি কালেকশন থেকে নেওয়া হয়েছে। সেই সময় এই কালেকশন ফ্যাশনমহলে বেশ সমালোচনার শিকার হয়েছিল। এমনকি ব্রিটিশ ভোগ শুধু এই সংগ্রহের জন্য মাইকেল ও হাশিকে ‘এই প্রজন্মের সন্ত্রাসী’ বলে সম্বোধন করেন।
কিন্তু তাতেও কালেকশনের গ্রহণযোগ্যতা ছিটেফোঁটাও কমেনি। সে সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ফ্যাশননির্ভর টিভি সিরিজ ‘সেক্স অ্যান্ড সিটি’তে সারা জেসিকা পার্কারকে ওই সংগ্রহের একটি কেফিয়াহ ট্যাংক টপে দেখা যায়।
উল্লেখ্য, ফিলিস্তিনিরা যখন ব্রিটিশ দখলদারির অবসান ঘুচিয়ে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল, তখন তারা শান্তি ও সংহতির প্রতীক হিসেবে সাদা-কালো কেফিয়াহ পরত। এবং এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। পরে লাল-সাদা কেফিয়াহও বেশ জনপ্রিয় হতে থাকে।


সিএনএনের একটি প্রতিবেদনের মতে, উনিশ শতকের দিকে কেফিয়াহ সাধারণত তুলা, সিল্ক ও সূক্ষ্ম উল দিয়ে তৈরি করা হতো, যা সাদা, কালো, সবুজ ও লাল সুতা দিয়ে মোড়ানো থাকত। এর বুনন ফিলিস্তিনের একেকটি দিককে প্রতিফলিত করে। যেমন জলপাইগাছ, ভূমধ্যসাগর ইত্যাদি।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম