কিয়ারা আদভানি: বিস্তৃত হয়ে ওঠা এক মায়ের গল্প
শেয়ার করুন
ফলো করুন

মুম্বাইয়ের মেহবুব স্টুডিওর স্টেজ টুর ভারী ধাতব দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যায় এটা কোনো চেনা শুটিং সেট নয়। এখানে নেই ব্লকবাস্টার ছবির শুটিংয়ের ব্যস্ততা, নেই অতিরিক্ত কোলাহল; বরং বাতাসে ছড়িয়ে আছে একধরনের শান্ত, মোলায়েম স্পন্দন, যেন সময় নিজেই একটু ধীরে হাঁটছে। ঠিক সেই অনুভূতিটাই যেন ঘিরে রেখেছে কিয়ারা আদভানিকে।

বহু দশকের ইতিহাস বয়ে নেওয়া এই স্টুডিও সাক্ষী থেকেছে অসংখ্য উত্থান-পতন, ভাঙন আর পুনর্জন্মের। কিন্তু আজ স্টেজ ২–এর আবহ আলাদা। প্রায় ত্রিশজন মানুষ ব্যস্ত একজনকে সাজাতে—কেউ খুঁজছে সেফটি পিন, কেউ আবার আলো ঠিক করতে ব্যস্ত। প্রতিটি ছোট ছোট প্রস্তুতির মধ্যেই ধরা পড়ছে একধরনের যত্ন। এসব কোলাহলের ঠিক কেন্দ্রে, প্যাস্টেল রঙের একটি চেয়ারে শান্তভাবে বসে আছেন কিয়ারা আদভানি।

কোনো তাড়াহুড়ো নেই, নেই অতিরিক্ত নাটকীয়তা। মা হওয়ার পর এটাই তাঁর প্রথম ফটোশুট—আর সেই নতুন অধ্যায়ের ছাপ স্পষ্ট তাঁর ভঙ্গিমায়। চোখেমুখে একধরনের স্থির আনন্দ, আত্মবিশ্বাস আর পরিপূর্ণতার ছায়া। যেন মাতৃত্ব তাঁকে আরও বিস্তৃত করেছে। ভোগ ইন্ডিয়ার জানুয়ারি সংখ্যার ফটোশুটের গল্প এটি। নতুন বছরের শুরুতেই কভার স্টার হিসেবে এক নতুন অধ্যায়ে পা রাখলেন কিয়ারা আদভানি। মা হওয়ার পর এই প্রথম ক্যামেরার সামনে ফেরা।

তবে এটা কোনো ‘ম্যাটারনিটি ব্রেক’ থেকে ফিরে আসার গল্প নয়। ২০২৫ সালে তাঁর সবচেয়ে প্রতীক্ষিত ছবিগুলোর একটি ওয়ার-২  ইতিমধ্যেই মুক্তি পেয়েছে, চলতি বছরের  মার্চে আসছে আরেকটি সিনেমা। কাজ থামেনি। বরং জীবন যেন আরও প্রসারিত হয়েছে—নিজের পরিচয়কে আরও বড় করে ধারণ করার মতো জায়গা তৈরি হয়েছে। ভোগের ফটোশুটে নানা ধরনের ওয়েস্টার্ন আউটফিটে ধরা দেন এই স্টাইলিশ নতুন মা। সঙ্গে ব্যক্তিগত জীবনের নানা মুহূর্তও ভাগ করে নিলেন।

ভোগ ইন্ডিয়ার কভারের জন্য কিয়ারা পরেন ভারতীয় ডিজাইনার অনামিকা খান্নার হাতে সেলাই করা আইভরি রঙের স্ট্রাকচার্ড করসেট ড্রেস। লুকটি একই সঙ্গে ক্ল্যাসিক এবং আধুনিক—শক্ত কাঠামোর মধ্যেও একধরনের নরম কোমলতা। করসেটের নিচে পরা ছিল রাজকীয় স্টাইলের শিয়ার ব্লাউজ। পুরো আউটফিটকে জীবন দিয়েছে লেয়ারিং। জুটি হয়েছে ছোট ছোট এয়ারপ্লেন মোটিফের শিয়ার প্যানিয়ার-স্টাইল স্কার্ট। ডায়মন্ড দুল, ন্যুড আই মেকআপ, হালকা গোলাপি গাল, আর ঢিলেঢালা কার্ল চুল—সবই পুরো লুকটিকে পরিপূর্ণ করেছে।

বিজ্ঞাপন

আরেকটি লুকে তিনি পরেন গোলাপি  ড্রেস। ‘গোলাপি রং ছিল আমার প্রথম আনন্দের ভাষা,’ হাসতে হাসতে বলেন তিনি। ‘রিবন, চুড়ি, ফুল—সবকিছুতেই গোলাপি। মানুষ ভাবে গোলাপি মানেই নরম, দুর্বল। কিন্তু কোমলতা শক্তির বিপরীত নয়।’

এই কোমলতাই সেটে দেখা যায়—যখন কিয়ারা লাইটম্যানদের নাম ধরে ধন্যবাদ দেন, যখন নিশ্চিত হন সবাই ঠিকমতো খেয়েছে কি না। ‘মা, স্কুলের বন্ধু, শিক্ষিকা—আমি এমন নারীদের মধ্যেই বড় হয়েছি, যাঁরা একে অপরের খেয়াল রাখতেন। এই শক্তিটাই আমাকে টানে।’

স্কুলের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে আজও জন্মদিনের শুভেচ্ছা আসে। সহ-অভিনেত্রীদের ট্রেলার মুক্তি পেলে তিনি উচ্ছ্বসিত হন। নতুন ডিজাইনারদের পোশাক পরেন রেড কার্পেটে। আর মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর স্বপ্ন? সেখানে কণ্ঠ নরম হয়ে আসে কিয়ারার। ‘সারায়াহ’, নামটা উচ্চারণ করেই যেন থেমে যান। ‘মানে—ঈশ্বরের রাজকন্যা। ও নিজের আলো নিয়েই এসেছে।’ মাতৃত্ব কিয়ারার ক্যারিয়ারকে মুছে দেয়নি, বরং আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। ‘আমি যখন সারায়াহর সঙ্গে থাকি, পুরোপুরি থাকি। ওর চোখের পাতা, আঙুল, হাসি—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলো অমূল্য।’

এই ব্যস্ত মুহূর্তগুলোর ফাঁকেই কাজ সারেন কিয়ারা। ‘ফিডের মাঝখানে কল, শিশুর ঘুমের সময় স্ক্রিপ্ট শোনা। এখন সময়ের ফাঁকগুলো কীভাবে ব্যবহার করছি, সেটা নিয়ে খুব সচেতন,’ বলেন কিয়ারা। আগে সময় গড়িয়ে যেত। এখন তাঁর দায়িত্ববোধ এসেছে। অনেক অনুষ্ঠান, উপস্থিতি—যেগুলো একসময় জরুরি মনে হতো—এখন তিনি ছেড়ে দিতে শিখেছেন।

নিজের শৈশবের কথাও মনে করেন কিয়ারা। ল্যান্ডলাইন ফোন, ক্যাসেট রিওয়াইন্ড করা, বিকেলে বাড়ির নিচে খেলাধুলা। ‘আমি চাই সারায়াহও সেই বাস্তবতাটা পাক,’ বলেন তিনি। ‘ঘাসে পা রাখুক, রং পেনসিলে বই দাগাক, বাইরে খেলতে খেলতে গাল গোলাপি হয়ে যাক।’

বিজ্ঞাপন

ছোটবেলায় মায়ের আলমারি থেকে ওড়না বের করে নিজেকে অভিনেত্রী ভাবা কিয়ারার গল্প এখন অন্য রূপ নিচ্ছে। তিনি জানান, ‘সাজের আনন্দ বদলে গেছে। এখন আমি সারায়াহকে সাজাতে ভালোবাসি।’ মা-মেয়ের সম্পর্ক যে সহজ নয়, সে কথাও জানেন কিয়ারা। কিন্তু তাঁর আশা—কিশোর বয়সের ঝড় এলে মেয়েটি যে গুণটা বেছে নেবে, তা হলো ‘নরম হওয়া’।

ভ্রমণ কিয়ারা ও সিদ্ধার্থ মালহোত্রার ভালোবাসার বড় অংশ। সেই স্বপ্নও তাঁরা ভাগ করে নিতে চান মেয়ের সঙ্গে। সারায়াহ ইতিমধ্যে মাসাই মারায় গেছে। ‘ভ্রমণ ইতিহাসকে বাস্তব করে,’ বলেন কিয়ারা। ‘আমি চাই ও পৃথিবী দেখুক, আর নিজের ভেতরেই ঘরের অনুভূতি খুঁজে পাক।’

সেটে কিয়ারা যেন সেই ফ্রন্ট-বেঞ্চের ছাত্রী—প্রস্তুত, মনোযোগী। মাতৃত্ব যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা কমায়, সেই চেনা ধারণা ভাঙেন তিনি। ‘আমি কখনো এতটা উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিলাম না,’ বলেন কিয়ারা। ‘মাতৃত্ব আপনাকে বড় করে দেবে।’

গর্ভাবস্থায় সাত মাস শুটিং করেছেন কিয়ারা। আবেগী দৃশ্যের আগে ট্রেলারের বাথরুমে গিয়ে পেটে হাত রেখে বলতেন, ‘মা শুধু অভিনয় করছে, এটা সত্যি না।’ কাজ আর মাতৃত্বের মাঝে এক নীরব সেতু ছিল সেটা। আর এখন দিনের শেষে তাঁর ক্লান্তি কাটানোর সবচেয়ে বড় ওষুধ?

কিয়ারা বলেন, ‘সারায়াহর ঘুমের মধ্যে হাসির শব্দ।’ ওয়ার ২-এর সেই আলোচিত বিকিনি দৃশ্যের কঠোর প্রস্তুতি থেকে শুরু করে, ডেলিভারির পর বদলে যাওয়া শরীর—সবকিছুর পর তাঁর উপলব্ধি একটাই। ‘এই শরীর একটা জীবন তৈরি করেছে। এর চেয়ে বড় কিছু নেই। এখন যে আকারেই থাকি না কেন, আমি আমার শরীরকে সম্মান করব।’ কিয়ারা আদভানির এই নতুন অধ্যায় তাই শুধু একজন অভিনেত্রীর নয়— এটা এক নারীর, এক মায়ের, এক বিস্তৃত হয়ে ওঠা মানুষের গল্প।

সূত্র: ভোগ ইন্ডিয়া

ছবি: ভোগ ইন্ডিয়ার ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৪: ০০
বিজ্ঞাপন