
ডিফেন্ডারদের চোখের পলকে পেছনে ফেলে দেওয়া, মুহূর্তের মধ্যে গতি বাড়ানো, দুর্দান্ত বল কন্ট্রোল এবং আক্রমণে ভয়ংকর উপস্থিতি ভিনির খেলা দেখলেই বোঝা যায় কেন তিনি বিশ্বের অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়দের একজন। তবে মাঠে তার এই বিস্ফোরক পারফরম্যান্সের পেছনে শুধু প্রতিভা নয়, রয়েছে কঠোর শৃঙ্খলা, বৈজ্ঞানিক ফিটনেস পরিকল্পনা, নিখুঁত খাদ্যাভ্যাস এবং স্মার্ট রিকভারি পদ্ধতি। এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল সমর্থকদের অন্যতম বড় ভরসা হয়ে মাঠে নামছেন ভিনিসিউস জুনিয়র। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কীভাবে এত চাপের মধ্যেও তিনি ধরে রাখেন তার গতি, শক্তি ও ফিটনেস? উত্তর লুকিয়ে আছে তার প্রতিদিনের জীবনযাপনে।

ভিনিসিউস জুনিয়রের ডায়েটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো—বিশ্ব ফুটবলের বড় তারকা হওয়ার পরও তিনি নিজের শিকড়কে ভুলে যাননি। তার খাদ্যতালিকায় এখনো গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে ব্রাজিলের ঐতিহ্যবাহী খাবার ‘আরোজ কম ফেইজাও’ অর্থাৎ ভাত ও বিনসের জনপ্রিয় সংমিশ্রণ। এর সঙ্গে থাকে চর্বিহীন প্রোটিন, যেমন গ্রিল করা মুরগি, মাছ কিংবা গরুর মাংস। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে সালাদও থাকে তার খাবারের অংশ। ভিনিসিউসের ব্যক্তিগত শেফ ও পুষ্টিবিদ নিশ্চিত করেন, প্রতিযোগিতামূলক মৌসুমে তিনি যেন প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি এবং অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকেন। কারণ এসব খাবার শরীরে প্রদাহ বাড়াতে পারে এবং কঠিন অনুশীলনের পর শরীরের রিকাভারি ধীর করে দিতে পারে।
ম্যাচের আগে শক্তি ধরে রাখতে ভিনি নিয়মিত গ্রহণ করেন অ্যাসাই বাউল, তাজা ফল এবং নারকেলের পানি। বিশেষ করে আনারসের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল তার পছন্দের তালিকায় রয়েছে, যা হজম ও পেশির পুনরুদ্ধারে সহায়ক।

ভিনিসিউসের দিন শুরু হয় ব্যক্তিগত অ্যাক্টিভেশন ড্রিল দিয়ে। সাধারণত সকাল ১০টার দিকে শুরু হয় তার এই বিশেষ প্রস্তুতি।
এই সেশনে থাকে–
* স্পিড ড্রিল
* ডাইনামিক স্ট্রেচিং
* ছোট দূরত্বের অ্যাক্সিলারেশন রান
এরপর প্রায় ৩০ মিনিট পর শুরু হয় মূল দলীয় অনুশীলন।
তার ট্রেনিংয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো হলো–
* বিস্ফোরক স্প্রিন্ট ট্রেনিং
* লোয়ার বডি পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট
* স্ট্যামিনা ও সহনশীলতা বৃদ্ধি
* দ্রুত দিক পরিবর্তনের ড্রিল
* ওয়ান-অন-ওয়ান ড্রিবলিং সেশন
তবে দলের অনুশীলন শেষ হলেই ভিনির দিন শেষ হয় না। নিজের খেলার আরও উন্নতির জন্য অতিরিক্ত প্রায় ৩০ মিনিট সময় দেন তিনি। এই সময়ে কাজ করেন ড্রিবলিং, ফিনিশিং এবং গতি বাড়ানোর ওপর। তার ফিটনেস দর্শনে প্রভাব রয়েছে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর কাছ থেকেও। রোনালদোর মতোই শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবনযাপন এবং অতিরিক্ত পরিশ্রমের মানসিকতা ভিনিকে অনুপ্রাণিত করেছে। নিজের বাড়ির ব্যক্তিগত জিমেও তিনি নিয়মিত শক্তি বৃদ্ধি ও কন্ডিশনিং ট্রেনিং করেন।

একজন অ্যাথলেটের জন্য শুধু কঠিন অনুশীলনই যথেষ্ট নয়, শরীরকে সঠিকভাবে বিশ্রাম দেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভিনিসিউস তার রিকভারিকে খুব গুরুত্ব দেন। তিনি দিনে প্রায় ৯ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করেন। রাতের ঘুমের পাশাপাশি বিকেলে প্রায় ৯০ মিনিটের একটি পাওয়ার ন্যাপও তার রুটিনের অংশ। এই বিশ্রাম শরীরকে দ্রুত পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে এবং পরবর্তী অনুশীলন বা ম্যাচের জন্য শক্তি ফিরিয়ে আনে।
কঠিন অনুশীলন ও ম্যাচের পর ভিনিসিউস ব্যবহার করেন আধুনিক রিকভারি প্রযুক্তি।
তার রুটিনে রয়েছে–
* ক্রায়োথেরাপি বা কোল্ড থেরাপি
* হাইড্রোথেরাপি
* ফিজিওথেরাপি
* কমপ্রেশন রিকভারি প্রযুক্তি
এসব পদ্ধতি শরীরের ক্লান্তি কমাতে, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং ইনজুরির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।
অনেক ফুটবলার মৌসুম শেষ হলে বিশ্রামে চলে যান। কিন্তু ভিনিসিউস জুনিয়রের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। অফ-সিজনেও তিনি নিজের ফিটনেস ধরে রাখতে নিয়মিত ব্যক্তিগত অনুশীলন, টেকনিক্যাল ট্রেনিং এবং জিম সেশনে সময় দেন। অনেক সময় প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত নিজের শরীর ও দক্ষতার উন্নতিতে কাজ করেন তিনি। কারণ তার লক্ষ্য, নতুন মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই নিজের সেরা অবস্থায় ফিরে আসা।

ভিনিসিউস জুনিয়রের ফিটনেসের পেছনের রহস্য কোনো একটি ম্যাজিক ফর্মুলা নয়। পরিষ্কার খাবার, বৈজ্ঞানিক ট্রেনিং, পর্যাপ্ত ঘুম, আধুনিক রিকভারি এবং প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রম এই সবকিছুর সমন্বয়েই তৈরি হয়েছে তার বর্তমান রূপ। মাঠে তার প্রতিটি স্প্রিন্ট, প্রতিটি ড্রিবল এবং প্রতিটি গোলের পেছনে রয়েছে এমন এক অদৃশ্য শৃঙ্খলা, যা সাধারণ প্রতিভাকে বিশ্বমানের পারফরম্যান্সে পরিণত করে।
ভিনিসিউস প্রমাণ করেছেন প্রতিভা একজন খেলোয়াড়কে শীর্ষে নিয়ে যেতে পারে, কিন্তু কঠোর পরিশ্রমই তাকে সেখানে ধরে রাখে।