
ঈদ মানেই স্মৃতি, পরিবার আর আনন্দের গল্প। কারও কাছে ঈদ মানে ছোটবেলার বন্ধুদের সঙ্গে ছুটে বেড়ানো, কারও কাছে আবার প্রিয় মানুষদের নিয়ে ঘরে ফেরার উষ্ণতা। অভিনেত্রী মাসুমা রহমান নাবিলার কাছেও ঈদ এক বিশেষ অনুভূতির নাম। তবে সেই অনুভূতি শুধুই স্মৃতিকাতরতায় আটকে নেই, বরং বর্তমান সময়কে ঘিরেই তিনি খুঁজে নিতে চান আনন্দের নতুন মানে। তবে এবারের ঈদ নাবিলার জন্য আরও বিশেষ। কারণ এই ঈদেই মুক্তি পাচ্ছে তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্র বনলতা সেন। সবার প্রশ্ন, নাম ভূমিকায় কি নাবিলাকেই দেখা যাবে? কবি জীবনানন্দ দাশের জীবন ও অনুভূতির ছায়া নিয়ে নির্মিত এই সিনেমাকে ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ এখন তুঙ্গে।

ছোটবেলার ঈদ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাবিলা জানালেন, খুব বেশি স্মৃতিকাতরতায় ডুবে থাকতে তিনি পছন্দ করেন না। তাঁর ভাষায়, সময়ের সঙ্গে মানুষ বদলায়, আনন্দের ধরনও বদলে যায়। তিনি বলেন, ছোটবেলায় ঈদের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো। সেই সময়কে অবশ্যই মিস করেন, কিন্তু এখন আর খুব বেশি পেছনে তাকাতে চান না। কারণ অতীতকে বেশি আঁকড়ে ধরলে মন খারাপ হয়ে যায়। বরং তিনি বর্তমান সময়টাকেই উপভোগ করতে চান।
মেয়েকে ঘিরেই এখন ঈদের আনন্দ
এখন নাবিলার ঈদের বড় আনন্দের জায়গা তাঁর মেয়ে। কোরবানির গরু দেখা থেকে শুরু করে উৎসবের প্রতিটি আয়োজন সবকিছুতেই মেয়ের উচ্ছ্বাস তাঁকে নতুন করে ঈদ অনুভব করায়। হাসতে হাসতে বললেন, “আজকে গরু দেখতে গিয়ে ও বলছিল এটা আমার গরু, ওটা কার গরু। ও এখন বুঝতে শিখছে। আসলে ওকে ঘিরেই এখন উৎসবগুলো উদযাপন করি।” মেয়ের চোখ দিয়ে আবার নতুন করে উৎসবকে আবিষ্কার করছেন তিনি। যেন শৈশবের আনন্দ নতুন রূপে ফিরে এসেছে।

কোরবানির ঈদ মানেই নাবিলার রান্নাঘরে ব্যস্ততা
অভিনয়ের পাশাপাশি নাবিলার আরেকটি পরিচয় তিনি দারুণ রান্না করেন। কুরবানির ঈদ এলেই রান্নাঘরে তাঁর ব্যস্ততা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। বিশেষ করে নেহারি রান্না করতে খুব পছন্দ করেন তিনি।

নিজের মতো করে বিশেষ মসলায় রান্না করা গরুর মাংস পরিবারের সবাই খুব পছন্দ করে। তবে মায়ের আর শাশুড়ির রান্নার কথাও আলাদা করে বললেন নাবিলা। তাঁর মা ভারতীয় ঘরানার ঝাল ও দো-পেঁয়াজা ধরনের রান্না খুব ভালো করেন। সেই স্বাদে এখনও ছোটবেলার স্মৃতি খুঁজে পান তিনি।
ঈদের সাজে সাদামাটা সৌন্দর্য
ফ্যাশনের দিক থেকে নাবিলা বরাবরই সাদামাটা কিন্তু মার্জিত পোশাক পছন্দ করেন। ঈদেও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি জানালেন, সালোয়ার কামিজ তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। খুব বেশি জমকালো নয়, বরং সাদামাটা কিন্তু অভিজাত দেখায় এমন পোশাকেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। রূপসজ্জাতেও তাঁর পছন্দ স্বাভাবিক ও হালকা সাজ। ছবির জন্য হয়তো একটু বাড়তি সাজ নিতে হয়, তবে ব্যক্তিগতভাবে তিনি সবসময়ই সহজ ও স্বাভাবিক থাকতেই ভালোবাসেন।পারফিউম তিনি খুব পছন্দ করেন তাঁর মধ্যে আছে খুব প্রিয় একটি ফরাসী সুগন্ধি। আর তা হলো ক্রিশ্চিয়ান দিওরের জাদোঁ।

ঈদের উপহার প্রসঙ্গে নাবিলা জানালেন, স্বামীর জন্য কিনেছেন পাঞ্জাবি। আর মেয়ের জন্য নতুন পোশাক কেনার চেয়ে এবার আলমারিতে জমে থাকা সুন্দর জামাগুলো থেকেই ঈদের পোশাক বেছে রাখছেন। হাসতে হাসতে বললেন, “ওর তো বাড়ন্ত বয়স। দেখা যায় একটা জামা এক-দুবার পরার পরই ছোট হয়ে যায়। তাই ভাবলাম, যা আছে সংগ্রহে সেখান থেকেই ঈদের দিন পরাব।”
‘বনলতা সেন’: তিনটি অডিশনের পর পাওয়া চরিত্র
ঈদের সবচেয়ে বড় চমক অবশ্যই ‘বনলতা সেন’। সিনেমাটি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে নাবিলা জানালেন, এই চরিত্র পাওয়ার পেছনে ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি ও কঠিন পরিশ্রম। তিনি বলেন, তিনবার অডিশন দেওয়ার পর এই চরিত্রে নির্বাচিত হন। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ মহড়া। প্রতিদিন পোশাক, রূপসজ্জা ও চুলের সাজসহ পুরো প্রস্তুতি নিয়ে মহড়া হতো। এমনকি চরিত্রের জন্য নিজের কণ্ঠ নিয়েও আলাদা কাজ করতে হয়েছে তাঁকে। পরিচালক মাসুদ হাসান উজ্জ্বল চেয়েছিলেন একটু ভারী ও গভীর কণ্ঠ। এজন্য নাবিলাকে প্রতিদিন কণ্ঠচর্চার ব্যায়াম করতে হয়েছে ডাবিং পর্যন্ত।

দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে হয়েছে সিনেমাটির শুটিং। মাঝখানে নির্মাণ পরবর্তী জটিলতায় ছবির মুক্তিও আটকে যায়। একসময় নাবিলারা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলেন সিনেমাটির কথা। তবে ছাড়পত্র পাওয়ার পর আবার নতুন করে শুরু হয় উত্তেজনা। সিনেমার পোস্টার, গান ও প্রচারণার প্রতিটি ধাপে নাবিলারাও নিজেদের মতামত দিয়েছেন। দর্শকদের মধ্যে কিভাবে আগ্রহ তৈরি করা যায়, সেটি নিয়েও ভেবেছেন সবাই।
শুটিংয়ের বিশেষ স্মৃতি নিয়ে বলেন, বনলতা সেন’-এর শুটিংয়ের একটি অভিজ্ঞতা আজও ভুলতে পারেন না নাবিলা। একটি দৃশ্যে তাঁকে বারবার হাঁটু গেড়ে বসে উঠতে হয়েছিল। সেই দৃশ্য করতে গিয়েই হাঁটুতে গুরুতর চোট পান তিনি। প্রথমে ভেবেছিলেন কিছুদিন বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আড়াই বছর পরও সেই ব্যথা রয়ে গেছে। হাসতে হাসতেই বললেন, “যখনই ব্যথাটা চাড়া দিয়ে ওঠে, তখনই ওই দৃশ্যটার কথা মনে পড়ে।” তবে তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তি, দৃশ্যটি পর্দায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
সমাজ, শিক্ষা আর মানবিকতার কথা
আড্ডার একপর্যায়ে উঠে আসে সমাজের অস্থিরতা, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং শিশু নির্যাতনের বিষয়ও। একজন মা হিসেবে এই বিষয়গুলো তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। নাবিলার মতে, সমস্যার মূল জায়গা পরিবার ও শিক্ষা ব্যবস্থা। ছোটবেলা থেকেই ছেলে-মেয়েদের মানবিকতা, সম্মানবোধ এবং অপরাধের পরিণতি সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে। তিনি মনে করেন, শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ জানালেই হবে না, শিক্ষা ও আইনের জায়গা থেকে বড় পরিবর্তন আনতে হবে।

“সবাই যেন বাংলা সিনেমা দেখে”
ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে নাবিলা বললেন, ‘বনলতাসেন’ শুধু একটি সিনেমা নয়, এটি কবি জীবনানন্দ দাশের প্রতি একধরনের শ্রদ্ধাঞ্জলি। তিনি আশা করেন, যারা জীবনানন্দকে ভালোবাসেন তারা যেমন সিনেমাটি উপভোগ করবেন, তেমনি নতুন প্রজন্মও এই সিনেমার মাধ্যমে কবিকে নতুন করে আবিষ্কার করবে। নাবিলার ভাষায়, “সবাই যেন বাংলা সিনেমা দেখে।সব সিনেমাই আমাদের সিনেমা। এভাবেই এগিয়ে যাক দেশের চলচ্চিত্র।”
ছবি: মাসুমা রহমান নাবিলা