
টানা কয়েক ঘণ্টা মঞ্চে নাচ, শক্তিশালী কণ্ঠে গান আর একই সঙ্গে দর্শকদের মাতিয়ে রাখার ক্ষমতা—তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শাকিরার এই প্রাণবন্ত উপস্থিতির পেছনে কোনো জাদু নেই। আছে নিয়মিত শরীরচর্চা, সুষম খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং কঠোর আত্মনিয়ন্ত্রণ। তাঁর জীবনধারা মনে করিয়ে দেয়, ফিটনেস কোনো ৩০ দিনের চ্যালেঞ্জ নয়; এটি প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসের ফল।
অনেকে মনে করেন, ওজন কমানোর সবচেয়ে সহজ উপায় হলো কম খাওয়া। কিন্তু শাকিরার দর্শন ভিন্ন। তাঁর মতে, শরীরকে সুস্থ রাখতে হলে আগে প্রয়োজন যথাযথ পুষ্টি। ক্ষুধার্ত শরীর ভালোভাবে কাজ করতে পারে না, ব্যায়ামও কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় না।
তাঁর খাদ্যতালিকায় সাধারণত থাকে উচ্চমানের প্রোটিন—মাছ, ডিম ও মুরগির মাংস; প্রচুর সবুজ শাকসবজি, তাজা ফল, স্বাস্থ্যকর চর্বি যেমন অ্যাভোকাডো, অলিভ অয়েল ও বাদাম, পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি। অন্যদিকে অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, ভাজাপোড়া ও অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলেন।

একবারে বেশি না খেয়ে তিনি দিনের বিভিন্ন সময়ে পরিমিত খাবার খান। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল থাকে, অতিরিক্ত ক্ষুধা কম লাগে এবং সারাদিন শরীরে শক্তি বজায় থাকে। পুষ্টিবিদদের কাছেও এটি একটি কার্যকর খাদ্যাভ্যাস হিসেবে স্বীকৃত।

শাকিরার ফিটনেসের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো ব্যায়ামে বৈচিত্র্য। শুধু জিমে সময় কাটানো নয়, শরীরের বিভিন্ন সক্ষমতা ধরে রাখতে তিনি একাধিক ধরনের অনুশীলন করেন।
স্ট্রেংথ ট্রেনিং: ওয়েট ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে পেশি শক্তিশালী রাখেন। এতে শরীর টোনড থাকে, পাশাপাশি বয়স বাড়লেও বিপাকক্রিয়া সক্রিয় থাকে।
কার্ডিও: নাচই তাঁর সবচেয়ে বড় কার্ডিও। এর পাশাপাশি দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো বা সাইক্লিংয়ের মতো ব্যায়াম হৃদ্যন্ত্র সুস্থ রাখতে সহায়তা করে।
কোর ট্রেনিং: মঞ্চে দীর্ঘ সময় ভারসাম্য ধরে রাখতে শক্তিশালী কোর অত্যন্ত জরুরি। তাই প্ল্যাঙ্ক ও বিভিন্ন কোর-স্ট্যাবিলিটি অনুশীলনও তাঁর রুটিনের অংশ।
স্ট্রেচিং: প্রতিদিনের অনুশীলনের আগে ও পরে স্ট্রেচিং করতে তিনি কখনো ভুল করেন না। এতে পেশির চাপ কমে, আঘাতের ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং শরীর নমনীয় থাকে।
শাকিরা আর তাঁর নাচ যেন অবিচ্ছেদ্য। একটি কনসার্টে তিনি যে পরিমাণ শক্তি ব্যয় করেন, তা অনেকের কয়েক ঘণ্টার জিম সেশনের সমান হতে পারে। লাতিন নাচ, বেলিড্যান্স এবং উচ্চমাত্রার স্টেজ পারফরম্যান্স তাঁর কাছে শুধু শিল্প নয়, কার্যকর শরীরচর্চাও।

শাকিরার মতে, একদিন অতিরিক্ত পরিশ্রম করার চেয়ে প্রতিদিন নিয়ম মেনে চলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই তিনি সময়মতো ঘুমান, প্রতিদিন শরীরচর্চা করেন, পর্যাপ্ত পানি পান করেন, স্বাস্থ্যকর খাবার খান এবং ব্যস্ততার মধ্যেও বিশ্রাম ও নিজের জন্য কিছুটা সময় রাখেন। তাঁর বিশ্বাস, বড় পরিবর্তনের শুরু হয় ছোট কিন্তু নিয়মিত অভ্যাস থেকে।

শুধু শারীরিক ফিটনেস নয়, মানসিক সুস্থতাকেও সমান গুরুত্ব দেন শাকিরা। ব্যস্ত সময়সূচির মাঝেও পরিবার, সন্তান এবং নিজের ব্যক্তিগত সময়ের জন্য তিনি আলাদা জায়গা রাখেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ কর্টিসল হরমোনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ওজন বৃদ্ধি, ক্লান্তি ও ঘুমের সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই বিশ্রাম, মানসিক প্রশান্তি এবং ইতিবাচক জীবনযাপনও সুস্থ থাকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

শাকিরা বিশ্বাস করেন, কেউই প্রতিদিন শতভাগ নিয়ম মেনে চলতে পারেন না। কোনো দিন ব্যায়াম বাদ পড়তেই পারে, কখনো প্রিয় খাবারও খাওয়া যেতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ হলো আবার নিয়মে ফিরে আসা। একদিনের ব্যতিক্রম পুরো যাত্রাকে ব্যর্থ করে না; দীর্ঘমেয়াদে ফল এনে দেয় ধারাবাহিকতাই।

সুন্দর শরীরের জন্য না খেয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শরীরকে ভালোবাসা, সঠিক পুষ্টি দেওয়া, নিয়মিত সক্রিয় থাকা এবং প্রতিদিন নিজের জন্য কিছুটা সময় বের করা। সত্যিকারের ফিটনেস আয়নার সামনে নিজের সঙ্গে যুদ্ধ নয়; বরং নিজের শরীরের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার নাম।

• না খেয়ে নয়, পুষ্টিকর খাবার খেয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণ
• প্রতিদিন অন্তত কিছু সময় শরীরচর্চা
• ওয়েট ট্রেনিং ও কার্ডিওর সমন্বয়
• পর্যাপ্ত পানি পান
• ভালো ও পর্যাপ্ত ঘুম
• দ্রুত ফলের বদলে ধারাবাহিক অভ্যাসে বিশ্বাস
ফিটনেস কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নয়; এটি একটি চলমান যাত্রা। আর সেই যাত্রার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—নিজের শরীরকে শাস্তি নয়, যত্ন দিন। কারণ সুস্থ জীবন শুরু হয় নিজের প্রতিই যত্নশীল হওয়া থেকে।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম