
ঝলমলে রাইনস্টোনে মোড়া পোশাক, পাঁচ ফুট উচ্চতার শরীরকে আরও লম্বা দেখাতে আকাশছোঁয়া হিল, বিশাল ঢেউখেলানো স্বর্ণালি পরচুলা আর করসেটে বাঁধা পুশ আপ ব্রা-এর আবেদন। দুইদিন আগে মৃত্যু হওয়া মার্কিন কিংবদন্তি সঙ্গীতশিল্পী ডলি পার্টনের সাজপোশাক ছিল একেবারেই তাঁর নিজস্ব। নিজের এই ব্যতিক্রমী স্টাইল নিয়ে তিনি প্রায়ই রসিকতা করে বলতেন, এত সস্তা দেখতে হলে অনেক টাকা খরচ করতে হয়!

মঞ্চে কিংবা মঞ্চের বাইরে ডলির পোশাকে যেমন ফুটে উঠত মার্কিন মুলুকের টেনেসি রাজ্যের শিকড়, তেমনি ছিল তাঁর নিজস্ব আবেদনের অতিরঞ্জিত ফেমিনিটি ও এক্সট্রাভ্যাগাঞ্জার প্রকাশ।


ব্যাকউডস বার্বি; নিজের দেওয়া এই নিকনেম এবং অ্যালবামের নামেও সেই ভাবনার প্রতিফলন ছিল। লম্বা অ্যাক্রিলিক নখ, ভারী মেকআপ আর প্রচুর ঝলমলে গয়না ছাড়া তাঁকে খুব কমই দেখা যেত। তাঁর লুকের হাইলাইট ছিল বিশাল পরচুলা, পুশ-আপ ব্রা, আকাশছোঁয়া হিল।
মঙ্গলবার ৮০ বছর বয়সে মারা যাওয়া এই সংগীতশিল্পী, অভিনেত্রী ও মানবহিতৈষী ব্যক্তিত্ব তাঁর চোখধাঁধানো ফ্যাশন নিয়ে সমালোচনার জবাবও দিতেন রসবোধের সঙ্গে। নিজের বিশাল চুলকে কখনো কখনো 'ফায়ার হ্যাজার্ড' বলে ঠাট্টা করতেন। একবার গান পরিবেশনের সময় বাদ্যযন্ত্রের বদলে শুধু আগুনলাল অ্যাক্রিলিক নখ ব্যবহার করেও দর্শকদের চমকে দিয়েছেন।

ঝলমলে পোশাকের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল অকপট। ব্রড শোল্ডার, গভীর নেকলাইন, সরু করে করসেটে বাঁধা কোমর ও লেস দেওয়া পুশ আপ ব্রা—এসব ছিল তাঁর পোশাকের প্রায় অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে নিজের স্টাইল সম্পর্কে তাঁর তীক্ষ্ণ আত্মসচেতনতা তাঁকে আরও জনপ্রিয় করে তুলেছিল।
নিজের স্টাইলের প্রতি অটল
ডলি পার্টনের ব্যক্তিত্বের অন্যতম ভিত্তি ছিল নিজের পছন্দের প্রতি তাঁর দৃঢ়তা। ২০২৩ সালে প্রকাশিত তাঁর বই বিহাইন্ড দ্য সিমস–এ তিনি লিখেছেন, ১৯৬৪ সালে ন্যাশভিলে যাওয়ার সময়ই মঞ্চ ও মঞ্চের বাইরের নিজের চেহারা নিয়ে তাঁর কিছু নির্দিষ্ট ভাবনা ছিল। তাঁর ভাষায়, তখনকার কান্ট্রি তারকাদের বড় চুল, কিছুটা ঝলমলে সাজ এবং একটি ক্যাডিলাক থাকা যেন নিয়মের মতো ছিল। তাঁর বড় চুল ছিল, কিন্তু তখনো ক্যাডিলাক ছিল না, ছিল না পর্যাপ্ত ঝলমলে সাজও। গ্র্যান্ড ওলে অপ্রির মঞ্চে দেখা জনপ্রিয় তারকাদের পোশাক তাঁকে অনুপ্রাণিত করত। তাঁদের মধ্যে ছিলেন জিন শেপার্ড। ছোটবেলায় চোখে পড়া বিতর্কিত ও খোলামেলা পোশাকের ক্যাটালগ ‘ফ্রেডেরিকস অব হলিউড’ থেকেও তিনি অনুপ্রেরণা নিয়েছেন বলেও এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেন।

ডলির কাছে গ্ল্যামার মানেই নিখুঁত রুচির প্রচলিত সংজ্ঞা মেনে চলা নয়। বরং কখনো কখনো ইচ্ছা করেই তিনি ‘রুচির সীমা’ ছুঁয়ে যেতেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি একটু, কী বলব, নিজেকে চটকদার দেখাতে চাই। খারাপ অর্থে বলছি না। এই কৃত্রিম ধরনের চেহারাটা আমার ভালো লাগে। বাড়াবাড়ি করা সাজ পছন্দ করি। ব্লিচ করা চুলও আমার ভালো লাগে।’
ষাটের দশকের ছাঁচে নিজেকে বাঁধেননি
১৯৬৫ সালে মনুমেন্ট রেকর্ডসে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর রেকর্ড কোম্পানির প্রেসিডেন্ট চেয়েছিলেন ডলির চুল একটু চ্যাপ্টা করে ষাটের দশকের পপ তারকাদের মতো পোশাক পরাতে। কিন্তু ডলির তা একেবারেই পছন্দ হয়নি। তিনি বলেছিলেন, ‘ওরা যা করেছিল, তার সবকিছুই আমার অপছন্দ হয়েছিল। নিজেকে নগ্ন মনে হচ্ছিল।’

নিজের সৌন্দর্যের সংজ্ঞা যে অন্য কেউ নির্ধারণ করে দেবে না, তা স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন ডলি। তিনি লিখেছেন, ‘সৌন্দর্য সম্পর্কে আমার নিজস্ব ধারণা আছে। যা আছে, তা দিয়েই নিজেকে যতটা সম্ভব সুন্দর করে তুলতে চাই। আমার নেতিবাচক দিকগুলোকে ইতিবাচক করার চেষ্টা করি। আর নিজেকে যতটা বেশি বর্ণিল ও চটকদারভাবে প্রকাশ করতে পারি, ততই ভালো লাগে।’
এমনকি তাঁর তুলনামূলক সফট ও সাদামাটা লুকেও থাকত যথেষ্ট আভিজাত্য ও ভলিউম। ১৯৭৩ সালের জনপ্রিয় অ্যালবাম জোলিন–এর প্রচ্ছদে তাঁকে দেখা যায় ডোরাকাটা পোশাক, পাফড সাদা স্লিভস ও চেহারা ঘিরে থাকা ঘন ব্লন্ড চুলে। তবে মঞ্চ কিংবা লালগালিচায় ডলি আরও বেশি চটকদার পোশাক বেছে নিতেন। উজ্জ্বল গোলাপি জাম্পস্যুট, আইস ব্লু অফ দ্য শোল্ডার গাউন কিংবা মুক্তাখচিত ক্রপড জ্যাকেট ছিল তাঁর পছন্দের তালিকায়। কিংবদন্তি ডিজাইনার বব ম্যাকির সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ১৯৭৯ সালে ম্যাকি তাঁর জন্য প্রজাপতির ডানার আদলে ‘বাটারফ্লাই’ গাউন তৈরি করেছিলেন।

ডলির আরেকটি পরিচিত ফ্যাশন বৈশিষ্ট্য ছিল ফ্রিঞ্জ বা ঝালর। কাউবয় হ্যাট কিংবা বেল-বটম জিনসের মতো চিরাচরিত কান্ট্রি ফ্যাশনের উপাদানও তাঁর পোশাকে থাকত।

তবে সেগুলোও হয়ে উঠত একেবারে ডলি-সুলভ। থাকত ঝলমলে অলংকরণ আর উজ্জ্বল রঙের বাড়তি ব্যবহার।
বছরে প্রায় ৩০০ পোশাক!
ডলির দীর্ঘদিনের স্টাইলিস্ট ও সহযোগী স্টিভ সামার্সের পরিকল্পনায় বছরে প্রায় ৩০০টি বিশেষভাবে তৈরি পোশাক পরতেন তিনি। ভোগ ম্যাগাজিনকে সামার্স জানিয়েছিলেন, ডলির জন্য সব পোশাকই বিশেষভাবে তৈরি করা হতো। এমনকি দোকানে তৈরি পোশাক দিয়ে কাজ শুরু হলেও সেটিকে তাঁর জন্য নতুন করে সাজানো হতো।

তিনি বলেন, ‘প্রতিদিনই তাঁর জন্য অন্তত একটি পোশাক তৈরির কাজ চলত। আর যদি তিনি ব্যক্তিগত কোনো অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন, এক দিনে ১০টি পোশাক পরাও অস্বাভাবিক ছিল না।’
বিশাল পরচুলাই হয়ে উঠেছিল ডলির পরিচয়
ডলি পার্টন পরচুলা পরতেন মূলত নিজের তৈরি করা স্বতন্ত্র চেহারা ও স্টাইল ধরে রাখার জন্য। বড়, ঘন ও উঁচু করে তোলা চুলকে তিনি নিজের সিগনেচার লুক বানিয়েছিলেন। প্রতিদিন চুলে অতিরিক্ত স্প্রে, টিজিং ও স্টাইলিং করলে স্বাভাবিক চুলের ক্ষতি হতে পারে। পরচুলা তাঁকে সেই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করত।

এ ছাড়া মঞ্চে ওঠার আগে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা চুল সাজানোর বদলে পরচুলা ব্যবহার করা ছিল অনেক সহজ। বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য ভিন্ন ভিন্ন পরচুলাও ব্যবহার করতে পারতেন তিনি।

ষাট ও সত্তরের দশকের কান্ট্রি সংগীতে বড় চুল ও ঝলমলে সাজ জনপ্রিয় ছিল। ডলি সেই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করেন। তাঁর বিশাল স্বর্ণালি চুল তাঁর পোশাক ও মেকআপের মতোই পরিচিত হয়ে ওঠে।
তাঁর স্বাভাবিক চুল খুব বেশি বড় বা ঘন নয়, ডলি নিজেই জানিয়েছিলেন। তাই কাঙ্ক্ষিত বিশাল ‘বিগ হেয়ার’ লুক তৈরি করতে পরচুলা ছিল কার্যকর। নিজের চেহারা নিয়ে তাঁর দর্শনও ছিল স্পষ্ট: যা আছে, সেটিকে নিজের পছন্দমতো আরও আকর্ষণীয় করে তোলা।
একবার রসিকতা করে নিজের বিশাল চুলকে ‘ফায়ার হ্যাজার্ড’ বা আগুন লাগার ঝুঁকিও বলেছিলেন তিনি। পরচুলা তাই তাঁর কাছে শুধু সাজের উপকরণ ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল ডলি পার্টন ব্র্যান্ডেরই একটি অংশ।
পুশ-আপ ব্রাতেও ছিল স্টাইলের ছোঁয়া
ডলি পার্টনের অন্তর্বাস নিয়েও তিনি বিভিন্ন সময় রসিকতা করেছেন। তাঁর মঞ্চের ঝলমলে ও শরীরের গড়নকে জোরালোভাবে তুলে ধরা পোশাকের সঙ্গে ফিটিং ও ভালো সাপোর্ট দেওয়া, পুশ-আপ ধরনের ব্রা ব্যবহারের কথা তাঁর সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে।

তাঁর পরিচিত স্টাইলের সঙ্গে মানানসই ছিল পুশ-আপ বা ভারী প্যাডিংযুক্ত ব্রা, যা পোশাকের সিলুয়েটকে আরও স্পষ্ট করত। আঁটসাঁট বা গভীর গলার পোশাকের সঙ্গে ফুল-কাপ ও ভালো সাপোর্ট দেওয়া ব্রাও ব্যবহার করতেন তিনি। কখনো পোশাকের নকশা অনুযায়ী কাস্টমাইজড অন্তর্বাস বা বডি-শেপিংও ব্যবহার করা হতো।
তারকাদেরও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন
ডলির ফ্যাশন বছরের পর বছর ধরে অন্য অনেক তারকাকেও অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর গডডটার মাইলি সাইরাসের সঙ্গে তাঁকে বহুবার একই ধরনের পোশাকে দেখা গেছে।

বিয়ন্সে নিজের ‘জোলিন’ গানের পরিবেশনায় ডলির স্টাইলকে তুলে ধরেছেন নতুনভাবে।

সাবরিনা কার্পেন্টারও তাঁর সঙ্গে ডুয়েট গান গেয়েছেন এবং ডলির সেই অকপট ফেমিনিটি ও মাখন-হলুদ রঙের কোঁকড়ানো চুলের লুককে ধারণ করেছেন।

ডলি নিজেও একবার এই ট্রেন্ডে যোগ দিয়েছিলেন। ওয়েস্ট হলিউডের একটি বারে আয়োজিত 'ডলি পার্টন লুক অ্যালাইক' প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছিলেন তিনি। মজার বিষয়, প্রতিযোগিতায় তিনি হেরে যান। ডলি পার্টনের পোশাক হয়তো অনুকরণ করা যায়, কিন্তু তাঁর স্টাইলের মূল বার্তাটি আরও সহজ; চকচকে সাজ থাকুক বা না থাকুক, নিজের মতো করে বাঁচা। তাঁর ভাষায়, ‘আমি আমার মতোই থাকব, কারণ আমি জানি আমি কে। আর তুমি তা জানো না।’
সূত্র: ভোগ, ইন স্টাইল, দ্য গার্ডিয়ান
ছবি: ইন্সটাগ্রাম