
পরিচালক সৈয়দ আহমেদ শাওকী ২৫০ বছরের পুরোনো এক রহস্যময় কয়েদির চরিত্রের লুক তৈরির ব্যাপারে আতিয়া রহমানের সঙ্গে আলোচনা করেন। তখন তাঁর কিছুটা বিস্ময় মেশানো প্রশ্ন ছিল, ব্যাপারটি কীভাবে সবাই বিশ্বাস করবে। উত্তরে শাওকী তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতেই বলেন, এ দায়িত্ব তাঁর নয় বরং আতিয়ারই। তখনই আসলে আতিয়ার মনে হয়েছিল, এখানে অনেক কিছু দেওয়ার আছে একজন মেকওভার বিশেষজ্ঞর।

একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ পরিচালকের জায়গা থেকে শাওকীর বলা গল্পের রহস্যময় বন্দী চরিত্রটি চঞ্চল চৌধুরীর অসাধারণ অভিনয়ে মূর্ত হয়ে ওঠার আগে তাঁর রূপটি রচিত হয়েছে ফিল্ম ও ফিকশন ইন্ডাস্ট্রিতে বাংলাদেশের একমাত্র নারী মেকওভার বিশেষজ্ঞের আতিয়া রহমানের হাতের জাদুতে। তাঁর ভাষায়, শাওকীর নেতৃত্বে একেবারে স্বাধীনভাবে, মনের মতো করে তিনি সাদা ক্যানভাসে একটু একটু করে এঁকেছেন চঞ্চল চৌধুরীর করা চরিত্রটিকে। জল্লাদরূপে আফজাল হোসেনসহ সিরিজটির কোনো চরিত্রের লুক তৈরিতেই এতটুকু কম মনোযোগ দেওয়া হয়নি। আর তার ফলাফল এখন সবার সামনে।

‘কারাগার’-এ আটকা পড়েছেন এখন ফিকশন ফিল্মপ্রেমীরা। একটি পর্ব শুরু হলে যেন থামার জো নেই। দেশে তো বটেই, বিদেশেও উচ্ছ্বসিত প্রশংসায় ভাসছে কারাগার। তবে অন্য সবকিছু ছাপিয়ে এই ওয়েব সিরিজে, ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা অথবা এই সময়ের আধুনিক জীবনে অভ্যস্ত চরিত্রগুলোর অবিশ্বাস্য রকমের বিশ্বাসযোগ্য লুক নিয়েই চলছে সবচেয়ে বেশি আলোচনা।

প্রথমেই চলে আসে চঞ্চল চৌধুরীর অভিনীত, মীরজাফরের কথিত খুনি, ২৫০ বছর ধরে বন্দী বলে দাবি করা অত্যন্ত রহস্যময় চরিত্রটির কথা। আতিয়া জানান, প্রতিদিন সকালে অন্তত তিন ঘণ্টা লেগেছে এই সম্পূর্ণ লুকটি তৈরি করতে। লুক টেস্ট করার সুযোগ না পেলেও আতিয়া বেশ কিছুদিন ধরে চঞ্চল চৌধুরীকে নখ, চুল কিছুই কাটতে দেননি। সারা গা ও মুখে প্রোসথেটিক মেকআপে বিশেষ ডাস্ট পাউডারের সঙ্গে মাকে ভুলিয়েভালিয়ে আদায় করা কোকো পাউডার দিয়ে হাত ও পায়ের ময়লা নখের লুক আনা হয়েছে।

চঞ্চল চৌধুরীর আন্তরিকতা আর অধ্যাবসায়ের কথা না বললেই নয়। এ ক্ষেত্রে আতিয়া বললেন, সকালে এই ডিটেইল্ড মেকআপ করার পর সারা দিন তিনি ঠায় সোজা হয়ে বসে থাকতেন, তা ঠিক রাখতে।

রাতে আবার এক ঘণ্টা ধরে আতিয়াই তুলে দিতেন এই মেকআপ ৯০ শতাংশ অ্যালকোহল দিয়ে। চরিত্রটির আঘাতের চিহ্ন, আঁচড়, বহুদিন অযত্নে এবং ভয়াল রকমের নেতিবাচক পরিবেশে বন্ধ হয়ে পড়ে থাকার ফলে সারা শরীর ও মুখে নোংরা ও উষ্কখুষ্ক ভাব আনতে অত্যন্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে আতিয়া ও তাঁর টিমকে। এ ব্যাপারে তিনি আসলে কোনো ছাড় দিতে চাননি। এবড়োখেবড়ো করে কাটা চুলও আতিয়ার হাতেরই কাজ। আবার আঘাতের চিহ্ন কয় দিন পরে কীভাবে কতটুকু সেরে আসে, কেমন রূপ ধারণ করে এ নিয়ে বিস্তর গবেষণা করেছেন তিনি। তাইতো চঞ্চল চৌধুরীর চেহারার আঘাত দেখে কেউ বুঝতেই পারবে না, তা সত্যিকারের নয়।

অন্য চরিত্রগুলোর মেকওভারেও সমান মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন আতিয়া। খ্যাতিমান অভিনেতা আফজাল হোসেনকে প্রথম দেখায় অনেকেই চিনতে পারেনি। কপালের দাগ, চোখের ক্রুর দৃষ্টি আর পান খাওয়া ঠোঁটের সঙ্গে রাফ ভয় ধরানো লুক—এসবই আতিয়ার হাতের ছোঁয়ায় আর কাজল বা লিপ টিন্টের ব্যবহারে জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
তাসনিয়া ফারিনের অত্যন্ত গ্ল্যামার বিবর্জিত লুকের পেছনেও রয়েছে কাহিনী। আতিয়া নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন তাঁকে কোনোরকম শ্যাম্পু ব্যবহারে। অনেক দিনের চুল না আঁচড়ানো, নিজের খেয়াল না নেওয়া, বিপদে পড়া উদ্ভ্রান্ত মেয়েটির লুকে পরিপূর্ণতা এসেছে সত্যিকারের নো মেকাপ এফেক্টে। তবে এথিকাল দিক থেকে আতিয়া সব প্রস্থেটিক মেকাপে সত্যিকারের মানসম্পন্ন মেকআপ–সামগ্রীই ব্যবহার করেছেন অভিনেতাদের স্বাস্থ্য ও স্বস্তিকে গুরুত্ব দিয়ে। তবে মেকআপ–সামগ্রীর দুষ্প্রাপ্যতা কাজের ক্ষেত্রে একটি সীমাবদ্ধতা সৃষ্টি করে, বলেন আতিয়া।

বিজ্ঞাপন দুনিয়া কাঁপিয়ে এসে এখন ফিকশন ফিল্মের জগতে নিজের মুম্বাই থেকে প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যবহারিক জগতে মেকাপের আদ্যোপান্ত শিখে আসা আতিয়া নিজের ছাপ রাখছেন স্পষ্টভাবে। কারাগারের প্রায় সংলাপবিহীন প্রধান চরিত্রটি শুধু লুক দিয়েই প্রথম ছক্কাটি হাঁকিয়েছে প্রথম ইনিংসেই। আতিয়া জানালেন, আরও অনেক চমক আসছে সামনে। আর ‘কারাগার’ সিরিজের অবিশ্বাস্য রকমের বিশ্বাসযোগ্য লুক তৈরির এই কাজ আতিয়া রহমানের অসীম অধ্যাবসায়, নতুন পথ তৈরি করে সে পথে হাঁটার প্রত্যয় আর অনন্য মেধার অকাট্য প্রমাণ।
ছবি: আতিয়া রহমান
