
বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা সিয়াম আহমেদ। অভিনয়ে যেমন নিজেকে ভেঙে নতুনভাবে হাজির করেন, তেমনি ব্যক্তিজীবনেও তিনি ভীষণ পরিবারমুখী একজন মানুষ। কোরবানির ঈদ এলেই তাই তাঁর মনে ভিড় করে ছোটবেলার অসংখ্য স্মৃতি, বাবার হাত ধরে গরুর হাটে যাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে রাতভর আড্ডা আর এলাকার ঈদের সেই চেনা উচ্ছ্বাস।
ঈদ উপলক্ষে হাল ফ্যাশনের সঙ্গে আলাপচারিতায় নিজের শৈশব, পরিবার, পছন্দের খাবার, পোশাক, ভক্তদের ভালোবাসা ও নতুন কাজ নিয়ে কথা বলেছেন এই অভিনেতা।

ছোটবেলার ঈদ এখনও হৃদয়ে গেঁথে আছে
সিয়াম বলেন, ছোটবেলার কোরবানির ঈদের সবচেয়ে প্রিয় স্মৃতি হলো বাবাকে সঙ্গে নিয়ে গরুর হাটে যাওয়া। শুধু গরু কেনা নয়, পুরো ব্যাপারটাই ছিল এক ধরনের উৎসব। কখনো কখনো এমনও হয়েছে, সকালে হাটে গিয়ে পরদিন গরু নিয়ে বাসায় ফিরেছেন।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, তখন শাহজাহানপুরের ঈদ ছিল অন্যরকম। এলাকায় কার বাসায় কেমন গরু এসেছে, কে কী কিনেছে—এসব দেখতে সবাই সবার বাসায় যেত। একে অন্যের গরুর প্রশংসা করত। সেই আন্তরিকতা আর একসঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির দিনগুলো এখন খুব মিস করেন তিনি।
সময় বদলেছে, মানুষ ব্যস্ত হয়েছে। বাবারও এখন আগের মতো হাটে যাওয়ার শারীরিক সামর্থ্য নেই। বন্ধুদের সঙ্গেও নিয়মিত দেখা হয় না। তবু পুরোনো দিনের সেই ঈদের অনুভূতি এখনও তাঁর মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে।
গরুর হাট এখনও টানে তাঁকে
ছোটবেলা থেকেই প্রতি বছর কোরবানির হাটে যেতেন সিয়াম। পরিবারের কোরবানির পশু কেনার দায়িত্বও অনেকটা নিজের কাঁধেই ছিল। যদিও এখন কাজের ব্যস্ততায় সময় বের করা কঠিন হয়ে যায়, তবু সুযোগ পেলেই হাটে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তাঁর ভাষায়, ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে গরু পছন্দ করার যে আনন্দ ছিল, সেটাই ছিল সবচেয়ে সুন্দর সময়। তখন দায়িত্ব কম ছিল, আনন্দটাই বেশি ছিল। এখন হাটে গেলে দরদাম, ব্যবস্থাপনা—সবকিছুর চাপ থাকে। তবু কোরবানির হাট তাঁর কাছে এখনও ভীষণ আকর্ষণীয় একটি জায়গা।

ঈদের সকালের সবচেয়ে প্রিয় খাবার
কোরবানির ঈদের সকাল মানেই ঘরোয়া খাবারের আয়োজন। আর সেই আয়োজনেই সবচেয়ে সুখ খুঁজে পান সিয়াম।
তিনি বলেন, তাঁর মায়ের বানানো সেমাই আর স্ত্রীর হাতে তৈরি লুচি ও আলুর দম তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। ঈদের সকাল এই খাবার ছাড়া যেন পূর্ণতা পায় না।
আরামদায়ক পোশাকেই স্বাচ্ছন্দ্য
ব্যক্তিগত জীবনে খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক পছন্দ করেন না সিয়াম। ঈদের দিনেও তাঁর পছন্দ থাকে হালকা, আরামদায়ক আর সুতির পোশাক।
তিনি জানান, কোরবানির ঈদে অনেক দায়িত্ব থাকে। দীর্ঘ সময় নিচে থাকতে হয়, মাংস বিলি করতে হয়। তাই যেই পোশাকে সবচেয়ে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য পাওয়া যায়, সেটাই পরেন তিনি। কখনো সুতির পাঞ্জাবি, কখনো কাবলি ধরনের পোশাক।
রঙের ক্ষেত্রে তাঁর পছন্দ সাদা, কালো আর বাদামি। তবে এখন নিজের পছন্দের চেয়ে ছেলের পছন্দই বেশি গুরুত্ব পায়। তাঁর ছেলে লাল রঙ খুব পছন্দ করে, তাই এখন সেই রংকেই বেশি গুরুত্ব দিতে হয়।

উপহার পাওয়ার চেয়ে দেওয়াতেই আনন্দ
একসময় ঈদে উপহার পাওয়ার অপেক্ষা থাকলেও এখন সেই জায়গাটা বদলে গেছে বলে মনে করেন সিয়াম। এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাছের মানুষদের জন্য কিছু করতে পারা।
পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি বাসার সহকারী, সহকর্মী, তাঁর সঙ্গে কাজ করা মানুষদের জন্যও ঈদের কেনাকাটা করেন তিনি। সবার মুখে হাসি ফোটাতেই যেন তাঁর আনন্দ।
প্রিয় সুগন্ধিতে বিশেষ পছন্দ
পারফিউমের ব্যাপারে সিয়ামের পছন্দ বেশ নির্দিষ্ট। ছোটবেলা থেকেই তিনি ডানহিল ডিজায়ার রেড ব্যবহার করেন। এটিকে তিনি নিজের ‘গো টু’ পারফিউম বলেই উল্লেখ করেছেন।
এছাড়া বর্তমানে জন পল গল্টিয়ার ও ক্যারোলিনা হেরেরা ব্যাড বয় সুগন্ধিও ব্যবহার করেন তিনি। আর ঈদের সময় বিশেষভাবে উদের ঘ্রাণ তাঁর খুব পছন্দ।

‘রাক্ষস’-এর ভালোবাসা এখনও ঘিরে রেখেছে
গত ঈদে ‘রাক্ষস’ দিয়ে দর্শকদের দারুণ সাড়া পেয়েছিলেন সিয়াম। এখনও সেই ভালোবাসা অনুভব করেন তিনি। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তির পর নতুন দর্শকরাও কাজটি দেখছেন, প্রশংসা করছেন, সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট ও ট্যাগ করছেন।
তবে এবারের ঈদে ‘আন্ধার’ না আসা নিয়ে দর্শকদের কিছুটা হতাশার কথা জানিয়ে সিয়াম বলেন, শুরু থেকেই এই কাজটি ঈদে মুক্তির পরিকল্পনায় ছিল না। নির্মাতারা ঈদের বাইরের বিশেষ সময়ে এটি আনতে চেয়েছেন।
দর্শকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, অপেক্ষা খুব বেশি দীর্ঘ হবে না। খুব শিগগিরই ‘আন্ধার’ নিয়ে হাজির হবেন তাঁরা এবং সেই অপেক্ষা সার্থক হবে বলেই তাঁর বিশ্বাস।
অভিনয়ের বাইরেও গল্পেই ডুবে থাকেন
অভিনয়ের বাইরে সিয়ামের বড় একটি আগ্রহ গল্প নিয়ে কাজ করা। তাঁদের একটি প্রোডাকশন হাউস রয়েছে—‘মেড ইন বাংলাদেশ’ বা এমআইবি স্টুডিওস। সেখানে মাঝে মাঝে গল্প লেখা, নতুন আইডিয়া তৈরি ও বিভিন্ন কনটেন্ট নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেন তিনি।
তাঁর কথায়, সবকিছু ঘুরেফিরে চলচ্চিত্র ও গল্পের জগতেই এসে মিশে যায়। কারণ গল্পের মধ্যেই থাকতে ভালো লাগে তাঁর।

মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান
ঈদ উপলক্ষে সবাইকে শুভেচ্ছা জানাতে গিয়ে খুব মানবিক এক বার্তা দিয়েছেন সিয়াম আহমেদ।
তিনি বলেন, চারপাশে অনেক মানুষ আছেন যারা নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু মুখ ফুটে বলতে পারেন না। সবার উচিত আশেপাশের মানুষের খোঁজ নেওয়া, তাদের প্রয়োজন বোঝার চেষ্টা করা।
শুধু অর্থ দিয়ে সাহায্য নয়, কারও পাশে বসে কথা বলা, তার সমস্যার কথা শোনা কিংবা একটু সহানুভূতি দেখানোও অনেক বড় সহায়তা হতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
সিয়ামের ভাষায়, “আমরা যদি একজন আরেকজনের পাশে দাঁড়াই, তাহলে অন্তত একে অন্যের জন্য ভরসা হয়ে উঠতে পারবো।”
ছবি: সিয়াম আহমেদ