পিৎজা-সফট ড্রিংক ছাড়ার পরই বদলে যায় মেসির ক্যারিয়ার
শেয়ার করুন
ফলো করুন

জুন ২০২৬-এ এসে মেসির বয়স ৩৮ বছর। কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি ৩৯ বছরে পা দেবেন। অথচ এই বয়সেও তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, গোল করছেন, ম্যাচের গতিপথ বদলে দিচ্ছেন এবং প্রতিপক্ষের জন্য ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছেন। অনেক ফুটবলারের ক্যারিয়ার যেখানে ৩৫ বছর পার হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়, সেখানে মেসি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ফুটবলারদের একজন।

ভক্তরা প্রায়ই বলেন, মেসির প্রতিভা ঈশ্বরপ্রদত্ত। কথাটি পুরোপুরি ভুল নয়। কিন্তু তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পেছনের আসল গল্পটা আরও অনেক বেশি আকর্ষণীয়। কারণ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজের শরীর, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনযাপনকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন। আর সেই পরিবর্তনই তাকে আজও প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে টিকিয়ে রেখেছে।

মোড় ঘুরেছিল ২০১৪ সালে

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে মেসি খাবারের বিষয়ে খুব বেশি সচেতন ছিলেন না। পিৎজা, কোমল পানীয়, চিনি এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার ছিল তার দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার শরীর নেতিবাচক সংকেত দিতে শুরু করে।
ম্যাচের সময় বমি বমি ভাব, হজমজনিত সমস্যা এবং শারীরিক অস্বস্তি তাকে ভাবিয়ে তোলে। এরপর ইতালিয়ান পুষ্টিবিদ জিউলিয়ানো পোজারের সঙ্গে কাজ শুরু করেন তিনি। সেই সময় থেকেই তার খাদ্যাভ্যাসে আসে বড় পরিবর্তন।

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, মেসির ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল এই খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন। কারণ এর পর থেকেই তার শারীরিক সক্ষমতা আরও স্থিতিশীল হয় এবং ইনজুরির সমস্যাও তুলনামূলকভাবে কমে আসে।

খাবারই তার প্রথম ওষুধ

বর্তমানে মেসির খাদ্যতালিকা অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক।

প্রচুর পানি, অলিভ অয়েল, তাজা ফল, শাকসবজি এবং সম্পূর্ণ শস্যজাত খাবার তার প্রতিদিনের খাদ্যের মূল অংশ। তিনি যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলেন অতিরিক্ত চিনি, কোমল পানীয়, সাদা ময়দা এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চিনি শরীরে প্রদাহ বাড়াতে পারে এবং পেশির পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া ধীর করে দেয়। মেসি এই কারণেই বহু বছর ধরে চিনিযুক্ত খাবার সীমিত রেখেছেন।

তিনি মাংস খাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করেননি। তবে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। মাছ, মুরগির মাংস এবং উচ্চমানের প্রোটিনকে অগ্রাধিকার দেন। তার প্লেটের বড় অংশজুড়ে এখন থাকে উদ্ভিদভিত্তিক খাবার।

বিজ্ঞাপন

ম্যাচের আগে চলে বিশেষ প্রস্তুতি

মেসির কাছে ম্যাচ প্রস্তুতি শুধু অনুশীলনের বিষয় নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া।

গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে তিনি পর্যাপ্ত পানি পান করেন এবং সহজপাচ্য খাবারের ওপর জোর দেন। ম্যাচের আগের দিন সাধারণত মাছ বা মুরগির মাংস, সেদ্ধ আলু, সবুজ শাকসবজি এবং ফলমূল খেয়ে থাকেন।

খেলার আগে কলা বা আপেলের মতো ফল খেয়ে দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করেন। এতে শরীর প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেট পায়, কিন্তু অতিরিক্ত ভারী অনুভূত হয় না।

মেসির প্রিয় পানীয়: ইয়েরবা মাতে

আর্জেন্টিনার সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ইয়েরবা মাতে। আর এই পানীয় ছাড়া মেসির সকাল কল্পনা করাও কঠিন।

শৈশব থেকেই তিনি মাতে পান করেন। এতে প্রাকৃতিক ক্যাফেইন থাকলেও এনার্জি ড্রিংক বা কোমল পানীয়ের মতো অতিরিক্ত চিনি থাকে না।

অনুশীলন মাঠ, ড্রেসিংরুম কিংবা সফরের সময় মেসির হাতে মাতে কাপ দেখা এখন পরিচিত দৃশ্য। এটি তাকে সতেজ থাকতে, মনোযোগ ধরে রাখতে এবং দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকতে সাহায্য করে।

ভারী জিম নয়, স্মার্ট ট্রেনিং

মেসির শরীর কখনোই বডিবিল্ডারের মতো ছিল না। কারণ তার লক্ষ্য বড় পেশি তৈরি করা নয়, বরং নমনীয়তা, ভারসাম্য এবং বিস্ফোরণধর্মী গতি ধরে রাখা।

তার প্রশিক্ষণের বড় অংশজুড়ে থাকে স্ট্রেচিং এবং মোবিলিটি ওয়ার্ক। জিমে সাধারণত তিনি হালকা ওজন ব্যবহার করেন।

স্কোয়াট, লাঞ্জ, গ্লুট ব্রিজ, কোর ট্রেনিং এবং বডিওয়েট এক্সারসাইজ তার নিয়মিত রুটিনের অংশ। এসব ব্যায়াম শরীরকে শক্তিশালী রাখে, কিন্তু অপ্রয়োজনীয় ওজন বাড়তে দেয় না।

বিজ্ঞাপন

গতির রহস্য লুকিয়ে আছে অ্যাজিলিটিতে

অনেকেই মনে করেন মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি তার ড্রিবলিং। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, তার সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো অ্যাজিলিটি বা ক্ষুদ্র জায়গায় দ্রুত দিক পরিবর্তনের ক্ষমতা।

অল্প জায়গায় প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে যাওয়া, বল নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং মুহূর্তের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে।

এই দক্ষতা ধরে রাখতে তিনি ছোট দূরত্বের স্প্রিন্ট, অ্যাজিলিটি ড্রিল, ল্যাটারাল মুভমেন্ট, ফুটওয়ার্ক ট্রেনিং এবং হাডল জাম্পের মতো অনুশীলন নিয়মিত করেন।
বয়স বাড়লেও তার শরীরকে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর সক্ষমতা ধরে রাখতে এসব অনুশীলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

ঘুম ও রিকভারিকেই মনে করেন সাফল্যের চাবিকাঠি

মেসির দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অবমূল্যায়িত রহস্য সম্ভবত রিকভারি।
তিনি জানেন, অনুশীলন যতটা গুরুত্বপূর্ণ, বিশ্রামও ততটাই জরুরি। তাই পর্যাপ্ত ঘুম, সঠিক হাইড্রেশন এবং ম্যাচের পর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব দেন।
আধুনিক ক্রীড়াবিজ্ঞানে দীর্ঘ ক্যারিয়ারের অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে রিকভারিকে বিবেচনা করা হয়। মেসিও সেই দর্শনেই বিশ্বাসী।

২০২৬ বিশ্বকাপেও ইতিহাসের পেছনে ছুটছেন

২০২৬ বিশ্বকাপ মেসির ক্যারিয়ারের আরেকটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। এটি তার ষষ্ঠ বিশ্বকাপ, যা পুরুষ ফুটবলের ইতিহাসে এক অনন্য রেকর্ড। বিশ্বকাপ শুরুর আগে আর্জেন্টিনা দলের সতীর্থ ও কোচরা বারবার বলেছেন, বয়স বাড়লেও মেসির প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা একটুও কমেনি। তাকে এখনও দলের অনুপ্রেরণার সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে দেখা হয়।

বিশ্বকাপের আগে সামান্য পেশির সমস্যার কারণে তাকে নিয়ে কিছু শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। তবে আর্জেন্টিনা শিবিরের বিশ্বাস, নিজের শরীরকে কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, তা মেসি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো জানেন।

প্রতিভার সঙ্গে শৃঙ্খলার জয়

লিওনেল মেসির গল্প আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। প্রতিভা একজন খেলোয়াড়কে বিশ্বমঞ্চে পরিচিতি এনে দিতে পারে, কিন্তু দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সেরাদের কাতারে থাকতে প্রয়োজন কঠোর শৃঙ্খলা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং নিজের শরীরের প্রতি দায়িত্বশীলতা।

৩৯ বছরে পা দেওয়ার মুখে দাঁড়িয়েও যখন তিনি বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নামেন, তখন সেটি শুধু ফুটবল প্রতিভার উদযাপন নয়। সেটি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ এবং অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তারও এক অনন্য উদাহরণ।

হয়তো এ কারণেই লিওনেল মেসি শুধু একজন ফুটবলার নন। তিনি দীর্ঘস্থায়ী উৎকর্ষতার প্রতীক। আর ভক্তদের ভাষায়, তিনি এখনও ‘গোট’– গ্রেটেস্ট অব অল টাইম।

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ১৬: ০০
বিজ্ঞাপন