টাকার জন্য মাকে খেলা দেখতে আনতে পারেন নি, এক রাতেই ভোজিনহার ফলোয়ার ৫০ হাজার থেকে ৫০ লাখ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের ঐতিহাসিক ০-০ ড্রয়ের ম্যাচে সাতটি অসাধারণ সেভ করে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হওয়া ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহা শেষ বাঁশি বাজার পর আবেগে ভেঙে পড়েন। কেপ ভার্দের এই বিশ্বকাপ নায়কের মা সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে পারেননি, কারণ যুক্তরাষ্ট্রের ভিসার খরচ বহন করার সামর্থ্য তাঁর ছিল না। ভোজিনহা ম্যাচটিকে তাঁর "সারা জীবনের পরিশ্রমের ফল" হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এই বিশেষ মুহূর্তটি তিনি তাঁর প্রয়াত দাদা-দাদি এবং মায়ের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চেয়েছিলেন।

জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র সরকার কেপ ভার্দেকে এমন দেশগুলোর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে, যাদের নাগরিকদের ভিসা ফি ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের আগে সর্বোচ্চ ১৫,০০০ ডলার পর্যন্ত ফেরতযোগ্য জামানত জমা দিতে হয়। এর ফলে ভোজিনহার মা সময়মতো ভিসার আবেদন সম্পন্ন করতে পারেননি। ভোজিনহা গত ১৩ বছর ধরে কেপ ভার্দে জাতীয় দলের গোলরক্ষক।

বিজ্ঞাপন

আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন,"আমি কেঁদেছি কারণ আমি আমার দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছি, আর দুর্ভাগ্যবশত তারা আজ এখানে নেই। কয়েক বছর আগে তারা মারা গেছেন। তারা আমার জীবনের সবকিছু ছিলেন।" তিনি আরও বলেন,"আমি আরও কেঁদেছি কারণ আমার মা এখানে আসতে পারেননি। ভিসার জন্য যে অর্থ পরিশোধ করতে হতো, সেটি জোগাড় করতে পারিনি এবং সময়মতো প্রক্রিয়াটিও সম্পন্ন করা যায়নি। আমি খুব চাইতাম তিনি এখানে থাকুন। তবে আমি একই সঙ্গে খুব আনন্দিতও।"

আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন,"আমি কেঁদেছি কারণ আমি আমার দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছি, আর দুর্ভাগ্যবশত তারা আজ এখানে নেই"
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি বলেন,"আমি কেঁদেছি কারণ আমি আমার দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছি, আর দুর্ভাগ্যবশত তারা আজ এখানে নেই"

ভোজিনহা এরপর তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের কথা স্মরণ করে বলেন,"আমি সারা জীবন এই মুহূর্তটির জন্য পরিশ্রম করেছি। আমার বয়স এখন ৪০ বছর। আমি ২৫ বছর বয়সে পেশাদার ফুটবল খেলা শুরু করি। অনেক সময় ফুটবল ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলাম, কিন্তু এই স্বপ্নের জন্য চালিয়ে গেছি।"

বিজ্ঞাপন

ভোজিনহার গল্প শুধু ফুটবলের নয়; এটি দারিদ্র্য, ত্যাগ, পরিবার এবং অদম্য অধ্যবসায়ের গল্প। যে মানুষটি একসময় অর্থের অভাবে নিজের মাকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মুহূর্তে পাশে আনতে পারেননি, সেই মানুষটিই আজ কোটি মানুষের অনুপ্রেরণা।

ভোজিনহার গল্প শুধু ফুটবলের নয়; এটি দারিদ্র্য, ত্যাগ, পরিবার এবং অদম্য অধ্যবসায়ের গল্প
ভোজিনহার গল্প শুধু ফুটবলের নয়; এটি দারিদ্র্য, ত্যাগ, পরিবার এবং অদম্য অধ্যবসায়ের গল্প

ভোজিনহা (আসল নাম জোসিমার জোসে এভোরা দিয়াস) একজন ৪০ বছর বয়সী কেপ ভার্দিয়ান পেশাদার ফুটবলার। ইউরোপের শক্তিশালী দল স্পেনের বিপক্ষে কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ অভিষেক ম্যাচে গোলপোস্টের নিচে অসাধারণ ও বীরত্বপূর্ণ পারফরম্যান্স দেখিয়ে তিনি বিশ্বজুড়ে আলোচনায় উঠে আসেন। তাঁর দুর্দান্ত সেভগুলোর কারণে কেপ ভার্দে ঐতিহাসিক ০-০ গোলের ড্র আদায় করতে সক্ষম হয়।

"ভোজিনহা" শব্দটির অর্থ পর্তুগিজ ভাষায় লিটল গ্র্যান্ড মা
"ভোজিনহা" শব্দটির অর্থ পর্তুগিজ ভাষায় লিটল গ্র্যান্ড মা

নামের উৎস

"ভোজিনহা" শব্দটির অর্থ পর্তুগিজ ভাষায় লিটল গ্র্যান্ড মা। শৈশবে পুরোপুরি দাদা-দাদির কাছেই বড় হওয়ার কারণে তিনি এই ডাকনাম পান।

শৈশবের সংগ্রাম

কেপ ভার্দের সাঁও ভিসেন্তে দ্বীপে বেড়ে ওঠা ভোজিনহা কখনোই বাবা-মায়ের সঙ্গে স্থায়ীভাবে বসবাস করেননি। তাঁর বাবা ছিলেন সেনাবাহিনীর সদস্য এবং মা পরিবার চালানোর জন্য প্রতিদিন বাইরে কাজ করতেন।

পারিবারিক বন্ধন

তিনি বড় হয়েছেন এলাকার বয়সে বড় ছেলেদের সঙ্গে খেলাধুলা ও সময় কাটিয়ে। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল প্রবল প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব এবং কিছুটা বিদ্রোহী স্বভাব। তাঁর ছোট ভাই দেলমিরো-ও পরবর্তীতে কেপ ভার্দের একজন পেশাদার ফুটবলার হন।

জীবনের সংগ্রাম ও দৃঢ়তা

ভোজিনহা ২৫ বছর বয়সের আগে পেশাদার ফুটবলার হতে পারেননি। শৈশবে তাঁর কাছে ভালো বুট বা ঘাসের মাঠ ছিল না। তিনি পুরোনো মোজা গুটিয়ে সেটিকে বলের মতো ব্যবহার করে ফুটবল খেলতেন।

ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল প্রবল প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব এবং কিছুটা বিদ্রোহী স্বভাব
ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল প্রবল প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব এবং কিছুটা বিদ্রোহী স্বভাব

নতুন পরিচয়ের গল্প

পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি নিজের আসল নাম জোসিমার ব্যবহার করতেন। এটি ছিল ১৯৮৬ বিশ্বকাপে খেলা ব্রাজিলিয়ান ডিফেন্ডার জোসিমারের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো। তবে অ্যাঙ্গোলার ক্লাব প্রোগ্রেসোতে যোগ দেওয়ার পর একই নামের আরেক খেলোয়াড় থাকায় বিভ্রান্তি এড়াতে তিনি স্থায়ীভাবে নিজের শৈশবের ডাকনাম ভোজিনহা গ্রহণ করেন।

তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা এই মুহূর্তে ৫ মিলিয়নের বেশি
তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা এই মুহূর্তে ৫ মিলিয়নের বেশি

রাতারাতি তারকাখ্যাতি

স্পেনের বিপক্ষে বিশ্বকাপ অভিষেকের আগে ভোজিনহা ছিলেন তুলনামূলকভাবে অখ্যাত এক অভিজ্ঞ ফুটবলার। ম্যাচ শুরুর সময় তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫০ হাজার। কিন্তু স্পেনের বিপক্ষে সাতটি দুর্দান্ত সেভ করে দলকে গোলশূন্য ড্র এনে দেওয়ার পর ব্রাজিলের একটি সরাসরি সম্প্রচারকারী চ্যানেলে তাঁকে নিয়ে ব্যাপক প্রচারণা শুরু হয়। এর ফলে মাত্র এক দিনের মধ্যেই তাঁর ইনস্টাগ্রাম অনুসারীর সংখ্যা এই মুহূর্তে ৫ মিলিয়নের বেশি হয়ে যায়, আর তিনি পরিণত হন বিশ্ব ফুটবলের নতুন অনুপ্রেরণার প্রতীকে।

সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান, আল জাজিরা

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ০৪: ১৪
বিজ্ঞাপন