
খেলা আসলে সব সময় খেলার মাঠে সীমাবদ্ধ থাকে না। খেলোয়াড়, দর্শক ও সমর্থকদের নানা ধরনের আবেগ জড়িয়ে থাকে এর সঙ্গে। বিভিন্ন দেশের মধ্যকার হাইভোল্টেজ ম্যাচে রাজনৈতিক ইস্যুও সামনে চলে আসে। এবারের ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার ম্যাচেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ফিরে এসেছে ফকল্যান্ড যুদ্ধের প্রসঙ্গ। পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। আর সেই আগুনে ঘি ঢেলেছেন দাপুটে আর্জেন্টাইন নেত্রী ভিক্টোরিয়া ভিয়ারুয়েল। ম্যাচের আগে ইংল্যান্ডকে ''দখলদার পাইরেট'' বলে তিনি তুমুল আলোচনায় আসেন।


ভিক্টোরিয়া ভিয়ারুয়েল একজন আর্জেন্টাইন আইনজীবী, লেখক ও রাজনীতিবিদ। তিনি বর্তমানে আর্জেন্টিনার ভাইস প্রেসিডেন্ট। সামরিক ঐতিহ্যবাহী একটি পরিবারে বেড়ে ওঠা ভিয়ারুয়েল প্রথম পরিচিতি পান সেন্টার ফর লিগ্যাল স্টাডিজ অন টেররিজম অ্যান্ড ইটস ভিকটিমস (সেলটিভি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এই সংগঠনটি বামপন্থী গেরিলা সংগঠনের সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পক্ষে কাজ করে।
২০২১ সালে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। পরে হাভিয়ের মিলেইর সঙ্গে জোট বেঁধে ২০২৩ সালে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০২৬ সালে যুক্তরাজ্যের ভূখণ্ডগত দাবিকে ঘিরে তাঁর মন্তব্য এবং সরকারপ্রধানের ঘনিষ্ঠ মহলের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়।

ব্রিটিশদের সঙ্গে সেই বৈরী সম্পর্কের প্রকাশে তিনি সেমিফাইনালের আগেও ছিলেন অকুণ্ঠ। ম্যাচের পর ফিফার নিয়ম ভেঙে আর্জেন্টিনা দলের রাজনৈতিক ফকল্যান্ড ব্যানার প্রদর্শনের ছবিও তিনি নিজের ইনস্টাগ্রামে কড়া বার্তাসহ শেয়ার করেন।
জ্বালাময়ী বক্তব্যের পাশাপাশি ''ফার্স্ট লেডি অ্যাসথেটিক''-এর জন্যও ভিক্টোরিয়া সমানভাবে নজর কাড়েন। চলুন জেনে নেওয়া যাক এই জাদরেল আর্জেন্টাইন নেত্রীর জীবন, জীবনযাপন ও স্টাইল সম্পর্কে।
গভীর ধর্মীয় বিশ্বাস
ভিক্টোরিয়া একজন অনুশীলনকারী ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। তিনি নিয়মিত ঐতিহ্যবাহী লাতিন মিসায় অংশ নেন, যা তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে।
ব্যক্তিগত জীবনে উত্থান-পতন
প্রায় ২০ বছর বয়সে তিনি একজন রাজনৈতিক কর্মীকে বিয়ে করেন। ২০০৮ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়। পরে ক্যাথলিক চার্চ সেই বিয়ে বাতিল ঘোষণা করে।
দ্বিতীয় বিয়ে
পরে ধর্মীয় পরিচয়ের সূত্রে তাঁর পরিচয় হয় প্রকৌশলী ও ওয়াইন প্রস্তুতকারক সেবাস্তিয়ান বাজসেতিচের সঙ্গে। এরপর তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

সন্তান না নেওয়ার সিদ্ধান্ত
তাঁদের কোনো সন্তান নেই। ভিয়ারুয়েল একাধিকবার বলেছেন, পরিবার গড়ে না তোলার বিষয়টি তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে ভাবায়। তবে তিনি কর্মজীবনকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন।
সামরিক পরিবারের উত্তরসূরি
তাঁর বাবা এদুয়ার্দো ভিয়ারুয়েল ছিলেন একজন উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা এবং ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধের অংশগ্রহণকারী। তাঁর নানা ছিলেন নৌবাহিনীর ইতিহাসবিদ।

বিতর্কিত পারিবারিক অধ্যায়
তাঁর এক চাচা সামরিক শাসনামলে গোপন আটককেন্দ্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে ২০১৫ সালে গ্রেপ্তার হন। এ বিষয়ে তিনি সাধারণত প্রকাশ্যে কথা বলেন না।

ফুটবল ও জাতীয়তাবাদ
ফুটবলকে ঘিরে জাতীয়তাবাদী বক্তব্য দেওয়ার জন্যও তিনি পরিচিত। এবার সেমিফাইনালের আগে ইংল্যান্ডবিরোধী মন্তব্য তাঁকে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের শিরোনামে নিয়ে আসে।
ফ্যাশন ও স্টাইল
ভিয়ারুয়েলের পোশাক-পরিচ্ছদ অত্যন্ত পরিমিত, আনুষ্ঠানিক ও আভিজাত্যপূর্ণ। তাঁর স্টাইলকে অনেকেই ''ফার্স্ট লেডি অ্যাসথেটিক'' বলে অভিহিত করেন।

এমনিতে তাঁকে সব রঙে্র সব ধরনের পোশাকে মানিয়ে গেলেও গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তিনি টেইলর্ড ড্রেস বা স্যুট পরতে পছন্দ করেন।

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সফরের সময় তিনি ঐতিহ্যবাহী পঞ্চো ও স্থানীয় কাপড় ব্যবহার করেন।


সাধারণত প্যাস্টেল শেড, নেভি ব্লু, ধূসর ও কালো রঙের পোশাক, ব্লেজার, মিনিমাল গয়না এবং বাহুল্যহীন লম্বা কালো চুলে তিনি নিজেকে উপস্থাপন করেন।
খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন
ওয়াইন প্রস্তুতকারক স্বামীর কারণে তিনি আর্জেন্টিনায় উৎপাদিত উন্নতমানের ওয়াইনের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তিনি আর্জেন্টিনার ঐতিহ্যবাহী ক্রিওয়ো খাবার পছন্দ করেন। বিশেষ করে বিফ আসাদো, এম্পানাদা এবং বিভিন্ন আঞ্চলিক খাবার তাঁর প্রিয়। প্রতিদিনের জীবনে তিনি নিয়মিত মাতে পান করেন। এমনকি ব্যস্ত সংসদীয় কাজের সময়ও নিজের মাতে সেট সঙ্গে রাখেন।

দৈনন্দিন জীবন ও শখ
তাঁর সামাজিক পরিসর মূলত রক্ষণশীল সামরিক পরিবার, ইতিহাসবিদ এবং ধর্মীয় পরিচিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। অবসর সময়ে তিনি ইতিহাস নিয়ে গবেষণা, সামরিক নথি পড়া এবং বই লেখায় সময় ব্যয় করেন।

নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে তিনি অত্যন্ত গোপন রাখেন। বাসস্থান, দৈনন্দিন রুটিন কিংবা ব্যক্তিগত শখ সম্পর্কে খুব কম তথ্যই প্রকাশ করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটি তাঁর সচেতন জন-ভাবমূর্তি গড়ে তোলার অংশ।
সুত্র: উইকিপিডিয়া, বুয়েনস আইরেস টাইমস
ছবি: ইন্সটাগ্রাম