৩৪ বছরেও থামেননি মিশরের রাজা সালাহ, জানুন তার ফিট থাকার রহস্য
শেয়ার করুন
ফলো করুন

কিন্তু সালাহর বিশেষত্ব শুধু গোল করা নয়। ৩৪ বছর বয়সেও তিনি যেভাবে নিজের শরীরকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন, দীর্ঘ সময় ইনজুরি থেকে দূরে থেকেছেন এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ে পারফর্ম করে চলেছেন সেটিই তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।

লিভারপুলের এই মিশরীয় তারকা শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একজন সম্পূর্ণ অ্যাথলেট। তার ফিটনেস দর্শন তৈরি হয়েছে কঠোর অনুশীলন, পরিকল্পিত খাদ্যাভ্যাস, আধুনিক রিকভারি পদ্ধতি এবং অসাধারণ শৃঙ্খলার ওপর।

শরীর গড়েছেন, কিন্তু হারাননি গতি

অনেক ফুটবলারের ক্ষেত্রে পেশিশক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গতি ও নমনীয়তা কমে যায়। কিন্তু সালাহ এই জায়গাতেই ব্যতিক্রম। তিনি শক্তি বাড়িয়েছেন, শরীরকে আরও অ্যাথলেটিক করেছেন, কিন্তু একই সঙ্গে ধরে রেখেছেন তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র, গতি। তার শরীরের গঠন এখন শুধু একজন দ্রুতগতির উইঙ্গারের মতো নয়, বরং একজন সম্পূর্ণ আধুনিক ফুটবলারের মতো। শক্তি, ভারসাম্য, ক্ষিপ্রতা এবং সহনশীলতার মধ্যে তিনি তৈরি করেছেন অসাধারণ সমন্বয়।

সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় দিন চলে ট্রেনিং

সালাহর ফিটনেস রুটিন কোনো সাধারণ জিম প্রোগ্রাম নয়। এটি তৈরি করা হয়েছে একজন এলিট ফুটবলারের প্রয়োজন অনুযায়ী। সাধারণত সপ্তাহে পাঁচ থেকে ছয় দিন তিনি অনুশীলন করেন। অনেক সময় তার ট্রেনিং দুই ভাগে বিভক্ত থাকে। সকালে থাকে কার্ডিও ও কোর ট্রেনিং। আর সন্ধ্যার সেশনে গুরুত্ব দেওয়া হয় শক্তি, ওজনভিত্তিক ব্যায়াম এবং শরীরের অ্যাথলেটিক ক্ষমতা বাড়ানোর দিকে। এই নিয়মিত অনুশীলনই তাকে ম্যাচের শেষ মুহূর্তেও একই রকম শক্তি ও গতি ধরে রাখতে সাহায্য করে।

সকালের ট্রেনিং: স্ট্যামিনা ও কোরের শক্তি

সালাহর সকালের অনুশীলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো কার্ডিও। দৌড়, সাইক্লিং, জাম্প রোপ এবং হাইড্রো-রোয়িংয়ের মতো অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি হৃদযন্ত্রের সক্ষমতা এবং দীর্ঘসময় খেলার ক্ষমতা বাড়ান। তার ট্রেনিংয়ে হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভ্যাল ট্রেনিং বা HIIT গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এতে অল্প সময়ে শরীরকে সর্বোচ্চ ক্ষমতায় কাজ করানো হয়, যা ফুটবলের দ্রুতগতির পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে।

এরপর আসে কোর ট্রেনিং। প্ল্যাঙ্ক, লেগ রেইজ, হ্যাংগিং লেগ রেইজ এবং রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ডের মতো অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি শরীরের মধ্যভাগের পেশি শক্তিশালী করেন। একজন ফুটবলারের জন্য শক্তিশালী কোর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি ভারসাম্য বজায় রাখতে, দ্রুত দিক পরিবর্তন করতে এবং প্রতিপক্ষের চাপ সামলাতে সাহায্য করে।

বিজ্ঞাপন

দ্বিতীয় সেশনে শক্তি ও পেশিশক্তির অনুশীলন

দিনের দ্বিতীয় ভাগে সালাহর মনোযোগ থাকে শক্তি ও পাওয়ার বাড়ানোর দিকে। তার অনুশীলনে থাকে বেঞ্চ প্রেস, পুল-আপ, পুশ-আপ, শোল্ডার প্রেস, রো এবং ল্যাট পুলডাউনের মতো উপরের শরীরের ব্যায়াম। অন্যদিকে নিচের শরীরের শক্তির জন্য তিনি করেন স্কোয়াট, লাঞ্জ, লেগ প্রেস, ফ্রন্ট স্কোয়াট এবং স্টিফ-লেগ ডেডলিফট। মাঝেমধ্যে তিনি রিভার্স পিরামিড ট্রেনিং পদ্ধতিও ব্যবহার করেন। এতে প্রথমে ভারী ওজন দিয়ে কম রিপিটেশন করা হয়, পরে ধীরে ধীরে ওজন কমিয়ে রিপিটেশন বাড়ানো হয়। এই পদ্ধতি শক্তি ও পেশির উন্নয়নে কার্যকর।

রিকভারি: ফিট থাকার সবচেয়ে বড় রহস্য

শুধু কঠোর অনুশীলন করলেই একজন অ্যাথলেট দীর্ঘদিন টিকে থাকতে পারেন না। সালাহ এই বিষয়টি খুব ভালোভাবে বোঝেন। তাই তার ফিটনেস রুটিনের বড় অংশজুড়ে রয়েছে রিকভারি। আইস বাথ, ক্রায়োথেরাপি, রেড-লাইট থেরাপি, স্ট্রেচিং এবং যোগব্যায়ামের মাধ্যমে তিনি শরীরকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করেন। এছাড়া পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক প্রশান্তিকেও তিনি গুরুত্ব দেন। মজার বিষয় হলো, সালাহ মানসিক ফোকাস বাড়াতে ধ্যান করেন এবং দাবা খেলতেও পছন্দ করেন। তার মতে, ফুটবলে শুধু শরীর নয়, মস্তিষ্কের প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

খাদ্যাভ্যাস: পরিচ্ছন্ন খাবারেই শক্তি

সালাহর ফিটনেসের আরেকটি বড় ভিত্তি হলো তার খাদ্যাভ্যাস। তিনি দিনে সাধারণত পাঁচ থেকে ছয়টি ছোট মিল গ্রহণ করেন। অতিরিক্ত চিনি, অ্যালকোহল এবং অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার থেকে দূরে থাকেন। তার সকালের খাবারে থাকতে পারে পরোটা বা কম-ক্যালরির ফ্ল্যাটব্রেড, দুধ এবং তাজা ফল। কখনও কখনও ডিম, অ্যাভোকাডো এবং গ্লুটেন-ফ্রি ব্রেডও যোগ হয়। দুপুরের খাবারে থাকে চিকেন ব্রেস্ট, স্যামন, ডাল, শাকসবজি এবং দই। রাতের খাবার তুলনামূলক হালকা—রোস্টেড সবজি, সালাদ এবং চিনি ছাড়া তাজা ফলের রস।

বিজ্ঞাপন

প্রিয় খাবার কুশারি, তবে নিয়ন্ত্রিত

নিজের দেশের ঐতিহ্যবাহী খাবারের প্রতি সালাহর ভালোবাসা রয়েছে। তার প্রিয় খাবারের মধ্যে অন্যতম মিশরের বিখ্যাত কুশারি। ভাত, মসুর ডাল, ম্যাকারনি, ছোলা এবং টমেটো সসের সমন্বয়ে তৈরি এই খাবারটি মিশরীয় সংস্কৃতির অংশ। তবে পেশাদার অ্যাথলেট হিসেবে তিনি জানেন, সবকিছুরই প্রয়োজন ভারসাম্য। মাঝেমধ্যে পিজ্জাও উপভোগ করেন, কিন্তু সেটি থাকে সীমিত পরিমাণে।

পুষ্টিকে দেখেন পারফরম্যান্সের অংশ হিসেবে

সালাহর মতে, পুষ্টি শুধু শরীরের গঠন নয়, মাঠের পারফরম্যান্সের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। সঠিক খাবার তাকে দ্রুত রিকভার করতে, ভালো ঘুমাতে এবং দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ের পারফরম্যান্স ধরে রাখতে সাহায্য করে। এই কারণেই তিনি খাবারকে শুধু দৈনন্দিন প্রয়োজন হিসেবে দেখেন না, বরং ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।

নেতৃত্বের নতুন অধ্যায়ে সালাহ

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সালাহ শুধু লিভারপুলের গোলদাতা নন, বরং একজন অভিজ্ঞ নেতা হিসেবেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মিশর জাতীয় দলের অধিনায়ক হিসেবে তিনি তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য অনুপ্রেরণা। ২০২৬ বিশ্বকাপকে সামনে রেখে মিশরের অন্যতম বড় ভরসা তিনি। বয়স বাড়লেও তার গতি, ফিটনেস এবং গোল করার ক্ষুধা এখনও আগের মতোই তীব্র।

প্রতিভার সঙ্গে শৃঙ্খলার গল্প

মোহাম্মদ সালাহর ফিটনেস গল্প প্রমাণ করে, একজন বিশ্বমানের অ্যাথলেট শুধু প্রতিভা দিয়ে তৈরি হয় না। এর পেছনে থাকে প্রতিদিনের অনুশীলন, নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, সঠিক খাবার, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং নিজের প্রতি কঠোর দায়িত্ববোধ। ৩৪ বছর বয়সেও সালাহ যেভাবে তরুণদের মতো দৌড়ান, লড়াই করেন এবং গোল করেন, তা দেখিয়ে দেয়—ফুটবলে বয়স নয়, প্রস্তুতিই সবচেয়ে বড় শক্তি। হয়তো এ কারণেই মোহাম্মদ সালাহ শুধু মিশরের গর্ব নন, তিনি আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সম্পূর্ণ অ্যাথলেট।

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ১৩: ৫৮
বিজ্ঞাপন