
অবশেষে বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন পর্তুগিজ ফুটবলের মহাতারকা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও তাঁর ১০ বছরের জীবনসঙ্গী জর্জিনা রদ্রিগেজ। সবাইকে অনেকটা চমকে দিয়ে নিজেদের বাড়ির লিভিং রুমেই হয়েছে তাঁদের অত্যন্ত ব্যক্তিগত বিয়ের আয়োজন। সেই বিয়ের প্রথম ঝলক দেখা গেছে ভোগ ম্যাগাজিনের সামার ডিজিটাল কভার ও প্রচ্ছদকাহিনিতে। আর সেখানেই জানা গেল, সিআর সেভেনের বিয়েতে সাত যেন এক অদৃশ্য সুতোয় সবকিছুকে বেঁধে রেখেছে। রোনালদো–জর্জিনার জীবনে সেভেন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ক্যারিয়ারে সাত সংখ্যাটির আলাদা তাৎপর্য আছে। সৌভাগ্যের সংখ্যা হিসেবেও সাতকে গুরুত্ব দেন এই বিশ্বখ্যাত ফুটবল তারকা। বিয়ের পাঁচ দিন আগে পর্তুগালের কাশকাইশে নিজেদের নতুন গ্রীষ্মকালীন বাড়ি থেকে ভোগ-এর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সময় রোনালদো ও জর্জিনার আলাপে উঠে আসে সেই সাত-এর গল্পও।
বছরের সপ্তম মাস জুলাইয়ে বাড়িটির মালিকানা পান তাঁরা। আর বাড়িটি তৈরি করতেও লেগেছে সাত বছর। জর্জিনার কাছে এসব নিছক কাকতাল নয়। তাঁর ভাষায়,বাড়িটি একেবারে নিখুঁত। সাত সংখ্যার প্রতিটি ঘটনাই যেন কোনো না কোনো সংকেত।’
এখন রোনালদো–জর্জিনার সংসারের সদস্যসংখ্যাও সাত। আর এই সাতজনই ছিলেন তাঁদের বহুলপ্রতীক্ষিত বিয়ের অনুষ্ঠানে। এর সঙ্গে যোগ করুন রোনালদোর বিখ্যাত জার্সি নম্বর ৭। তাই সিআর সেভেনের জীবনের এই বিশেষ অধ্যায়ে সাত যে একটু বেশিই বিশেষ, তা বলাই যায়।
প্রথম দেখা, একই তারিখে সেই গুচ্চি শোরুমে
ঠিক এক দশক আগে, ১১ আগস্ট মাদ্রিদের গুচ্চি স্টোরে প্রথম দেখা হয়েছিল রোনালদো ও জর্জিনার। সেই বিশেষ দিনটিকেই বিয়ের জন্য বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা। অবশ্য বিয়েকে ঘিরে এর আগে কম জল্পনা হয়নি। কয়েক সপ্তাহ ধরে কখনো ছড়িয়েছে, এই সপ্তাহান্তেই বিয়ে; আবার কখনো শোনা গেছে, পরের সপ্তাহান্তে। সম্ভাব্য অতিথিদের তালিকাও ছিল আলোচনার বিষয়। রিও ফার্দিনান্দ থেকে রিয়ানা; তারকায় ভরা সেই তালিকায় ছিল অনেকের নাম।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত জল্পনার আবহ থেকে অনেক দূরেই ছিল আসল আয়োজন। ১১ আগস্ট ২০২৬, পর্তুগালের সমুদ্রতীরবর্তী শহর কাশকাইশে নিজেদের বাড়িতে শুধু পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে বিয়ে করেন রোনালদো ও জর্জিনা।
১০ বছরের সম্পর্ক, সন্তানদের নিয়ে গড়ে ওঠা বড় পরিবার আর বিশ্বজুড়ে খ্যাতির বিপরীতে তাঁদের বিয়ের আয়োজন ছিল আশ্চর্য রকমের ব্যক্তিগত। বড় কোনো অনুষ্ঠানস্থল নয়, অসংখ্য অতিথির ভিড়ও নয়, নিজেদের বাড়ির পরিচিত পরিসরেই ভালোবাসার নতুন অধ্যায় শুরু করেন তাঁরা।

যেদিন প্রথম দেখা
২০১৬ সালের আগস্টে মাদ্রিদের সেরানো সড়কের গুচ্চি শোরুমে ছেলে ক্রিস্টিয়ানো জুনিয়রকে নিয়ে ঢুকেছিলেন রোনালদো। সেদিন শোরুমে থাকার কথা ছিল না জর্জিনার। এক সহকর্মীর হয়ে দায়িত্ব পালন করছিলেন তিনি। ইংল্যান্ডে বেবিসিটার হিসেবে কাজ করে সবে স্পেনে ফিরেছিলেন ২২ বছর বয়সী জর্জিনা। সেই কাকতালীয় সাক্ষাৎকেই তিনি মনে করেন নিয়তি। রোনালদোও বলেছেন, প্রথম চোখাচোখির পর থেকেই সবকিছু যেন স্বপ্নের মতো এগিয়েছে।
এরপরের বছরগুলোয় একে একে তাঁদের পরিবারে আসে সন্তান। জমজ এভা ও মাতেও, আলানা এবং ২০২২ সালে আরেক জোড়া সন্তান বেলা ও অ্যাঞ্জেল। তবে দুঃখজনকভাবে জন্মের পর অ্যাঞ্জেল মারা যায়। রোনালদোর আগের সম্পর্কের সন্তান ক্রিস্টিয়ানো জুনিয়রকে নিয়ে গড়ে ওঠে তাঁদের বড় পরিবার।

কেন এত ঘরোয়া আয়োজন?
বিয়ের তারিখ হিসেবে ১১ আগস্ট বেছে নেওয়ার পেছনে বিশেষ কারণ ছিল। ঠিক ১০ বছর আগে এই দিনেই মাদ্রিদের সেই গুচ্চি শোরুমে প্রথম দেখা হয়েছিল তাঁদের।
জর্জিনা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে বড় করে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুদের নিয়ে বিয়ে উদ্যাপনের ইচ্ছা তাঁদের আছে। কিন্তু কাজের ব্যস্ততা, ফুটবল আর সন্তান সামলানোর মধ্যে সম্পর্কের ১০ বছর পূর্তিটা তাঁরা এড়িয়ে যেতে চাননি।

ছোটবেলায় নিজের বিয়ে নিয়ে বিশাল প্রাসাদ, গাউন আর হীরার মুকুটের স্বপ্ন দেখতেন জর্জিনা। কিন্তু এখন প্রাসাদ, বাড়ি, দ্বীপ কিংবা দামি গাড়ি—সবই তাঁর নাগালের মধ্যে। তাই এবার চেয়েছেন এমন কিছু, যা তাঁদের জীবনে সত্যিই বিরল—সঙ্গী ও সন্তানদের নিয়ে একান্ত, ঘরোয়া একটি মুহূর্ত। তাই জমকালো কোনো ভেন্যু নয়, নিজেদের বাড়ির বসার ঘরকেই বেছে নেন তাঁরা। যে জায়গায় প্রতিদিন একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করেন, যেখানে কাটে তাঁদের পারিবারিক জীবনের বাস্তব মুহূর্তগুলো। জর্জিনার ইচ্ছা, ৩০ বছর পর তাঁদের সন্তানেরা যেন সেই টেবিলটির কথা মনে করে বলতে পারে—এখানেই তাঁদের বাবা-মা একে অপরকে ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অবশ্য রোনালদো রসিকতা করে বলেছেন, তত দিনে হয়তো ঘরের সাজসজ্জাই বদলে যাবে, এমনকি টেবিলটিও একই নাও থাকতে পারে।
স্মৃতিকাতরতার আরেকটি উদাহরণ তাঁদের বাড়িতে এখনো থাকা ১৫ বছরের পুরোনো একটি ট্রেডমিল। সেটিতে দৌড়ালে এখন রোনালদোর হাঁটুতে ব্যথা করে। তবু জর্জিনা সেটি সরাননি। কারণ মাদ্রিদে তাঁদের প্রথম পরিচয়ের সময় এই যন্ত্রেই অনুশীলন করতেন রোনালদো।

গুচ্চির সঙ্গে বিশেষ বন্ধন
যেহেতু তাঁদের গল্পের শুরু গুচ্চির শোরুমে, তাই বিয়েতেও গুচ্চির পোশাক বেছে নিয়েছেন দুজন। জর্জিনার জন্য নকশা করা হয়েছিল সাদা সিল্কের স্কার্ট-স্যুট ও ব্র্যান্ডের পরিচিত হর্সবিট নকশার স্যাটিন জুতা। রোনালদোর পোশাক ছিল হালকা বেইজ রঙের কাস্টম স্যুট। সন্তানদের জন্যও তৈরি করা হয়েছিল মানানসই পোশাক।
গুচ্চির আর্ট ডিরেক্টর দেমনা নিজেই এই দম্পতির পোশাক নকশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর ভাষায়, এটি যেন তাঁদের প্রেমকাহিনির একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ হওয়ার মুহূর্ত।
জর্জিনা বলেছেন, দেমনা শুরু থেকেই বুঝেছিলেন তাঁরা কী চান। জাঁকজমকপূর্ণ কোনো পোশাক নয়, বরং তাঁদের সাধারণ জীবনের সঙ্গে মানানসই কিছুই চেয়েছিলেন তাঁরা।

বিয়ের ছবি তোলার দায়িত্বে ছিলেন খ্যাতনামা আলোকচিত্রী ইয়ুর্গেন টেলার। স্বতন্ত্র ও শৈল্পিক ধাঁচের ছবির জন্য পরিচিত তিনি। প্রথাগত পারিবারিক অ্যালবামের বদলে শিল্পসম্মত ও দীর্ঘস্থায়ী কিছু রেখে যেতে চেয়েছিলেন রোনালদো–জর্জিনা। তাই এই পছন্দ।
অনুষ্ঠানের পর ফাতিমায়
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে পরিবার নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে ফাতিমার বিখ্যাত ধর্মীয় তীর্থস্থানে যান তাঁরা। সেখানে একজন যাজক তাঁদের জন্য ছোট একটি উপাসনালয় আলাদাভাবে বন্ধ রাখেন এবং আশীর্বাদ করেন। ভিড় ও জনসমাগম এড়াতেই নেওয়া হয়েছিল এই বিশেষ ব্যবস্থা। মধুচন্দ্রিমার জন্য অবশ্য সময় বের করতে পারেননি তাঁরা। পরদিনই সৌদি আরবের রিয়াদে নিজেদের বাড়িতে ফিরতে হয় রোনালদোকে। কারণ ১৫ আগস্ট থেকেই তাঁর ক্লাব মৌসুম শুরু হওয়ার কথা।

বিয়ের পর নতুন অধ্যায়
ভোগ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রোনালদো জানিয়েছেন, ফুটবল ক্যারিয়ারের এটিই সম্ভবত তাঁর শেষ মৌসুম হতে পারে। তবে খেলা ছাড়ার পর কী করবেন, সেটিও ভেবে রেখেছেন তিনি—পরিবারকে আরও বেশি সময় দেওয়া, ভ্রমণ এবং পছন্দের প্যাডেল খেলা চালিয়ে যাওয়া। আরও সন্তান নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও কথা বলেছেন তাঁরা। দুজনেই জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে তা একেবারে অসম্ভব বলছেন না। তবে আপাতত তাঁদের এমন কোনো পরিকল্পনা নেই।

বিয়ের পরদিন জর্জিনা জানান, দিনটি ঠিক তাঁর কল্পনার মতোই কেটেছে—ভালোবাসায় ভরা, পরিবারকেন্দ্রিক এক আয়োজন। চোখের জল আটকে রাখাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। ফাতিমার ছোট্ট চ্যাপেলে আশীর্বাদ নেওয়ার সময় অদ্ভুত এক প্রশান্তি অনুভব করেছিলেন বলেও জানান তিনি। স্বামী, সন্তান, ঘর, বিশ্বাস আর ভালোবাসা; এসবের বাইরে আর কিছুই প্রয়োজন নেই বলে মনে হয়েছিল তাঁর।
আর তাই সিআর সেভেনের জীবনের এই নতুন অধ্যায়ে সাত হয়তো শুধু একটি জার্সি নম্বর কিংবা সৌভাগ্যের সংখ্যা নয়; রোনালদো–জর্জিনার কাছে এটি হয়ে উঠেছে তাঁদের ভালোবাসা, পরিবার ও জীবনের নানা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তকে জুড়ে রাখা এক বিশেষ প্রতীক।
তথ্যসূত্র: ভোগ ম্যাগাজিনকে দেওয়া ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ও জর্জিনা রদ্রিগেজের একান্ত সাক্ষাৎকার।
ছবি: ইন্সটাগ্রাম ও ভিডিওর স্ক্রিনশট