
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচায় সিনেমার পাশাপাশি আরেকটি বিষয় নিয়ে বরাবরই আলোচনা হয়—কে কী পরলেন। আর এবারের উৎসবেও সেই আলোচনার কেন্দ্রে আমাল ক্লুনি। জর্জ ক্লুনির পাশে তাঁর উপস্থিতি অবশ্যই বিশেষ, কিন্তু আমালের পোশাকগুলো এবার যেন আলাদা গল্প বলছে।
একটির পর একটি লুক। আর প্রতিবারই ভিন্ন আমাল।
কখনো ঝলমলে সাটিন, কখনো শরীরছোঁয়া কালো গাউন, কখনো রঙিন মিনি ড্রেস। কোথাও পুরোনো হলিউডের গ্ল্যামার, কোথাও আবার একেবারে আধুনিক, খেলাচ্ছলে ফ্যাশন। সব মিলিয়ে এবারের ভেনিসে আমালের স্টাইল যেন বলছে—গ্ল্যামার মানেই এক ছাঁচে তৈরি সৌন্দর্য নয়।

ভেনিসে পৌঁছেই নজর কাড়েন আমাল। জর্জ ক্লুনির সঙ্গে গন্ডোলায় আসার সময় তিনি পরেছিলেন হায়দার অ্যাকারম্যানের নকশা করা টম ফোর্ডের জলপাই-সবুজ সাটিন শর্টস স্যুট।
চকচকে সাটিন কাপড়, স্ট্রাকচার্ড জ্যাকেট আর ছোট শর্টস—তিনের মিশেলে পোশাকটি ছিল একই সঙ্গে সাহসী ও পরিশীলিত। সঙ্গে বড় সানগ্লাস। ব্যস, ভেনিসের জলপথেই তৈরি হয়ে গেল প্রথম ফ্যাশন মুহূর্ত।
এখানে আমালের স্টাইলের একটি বিষয় পরিষ্কার—আনুষ্ঠানিক পোশাক মানেই গাউন নয়। ঠিকঠাক কাটের একটি শর্টস স্যুটও রেড কার্পেটের জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

পরের লুকেই আমাল যেন সম্পূর্ণ অন্য চরিত্রে।
জর্জ ক্লুনি যখন ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের আজীবন সম্মাননা ‘গোল্ডেন লায়ন’ গ্রহণ করছেন, তখন তাঁর পাশে আমাল—কালো টম ফোর্ড গাউনে। হায়দার অ্যাকারম্যানের নকশায় তৈরি গাউনটি ছিল শরীরের রেখা অনুসরণ করা, দীর্ঘ এবং নাটকীয়।
কালো সিল্ক ট্যাফেটা, সূক্ষ্ম প্লিট আর লেদারের ডিটেইলিং গাউনটিকে দিয়েছে আধুনিক কাঠামো। কিন্তু তার ভেতরে আবার রয়েছে পুরোনো হলিউডের সেই চেনা আভিজাত্য।
আর গয়না? কার্টিয়েরের এমেরাল্ড। কালো পোশাকের মাঝে সবুজ পাথর যেন পুরো সাজে আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে।
এরপর আমাল দেখালেন তাঁর অন্য রূপ।
অ্যাকোয়া রঙের ক্যারোলিনস কুতুর মিনি ড্রেস। পোশাকজুড়ে হার্টের নকশা, সিকুইন আর লুরেক্স ফ্রিঞ্জ। একেবারে পার্টি মুড।
সঙ্গে হীরার ঝাড়বাতির মতো কানের দুল আর রুপালি ক্লাচ। চোখের সাজে ব্রোঞ্জ আভা, চুলে নরম ঢেউ। এই লুকে আমালকে দেখে মনে হয়, আগের রাতের সেই গম্ভীর কালো গাউন যেন অন্য কারও গল্প।
এটাই তাঁর ফ্যাশনের মজা। তিনি একই ধরনের সৌন্দর্য বারবার দেখান না।

৪ সেপ্টেম্বরের আরেক অনুষ্ঠানে আমাল হাজির হলেন স্টেলা ম্যাককার্টনির রাস্পবেরি রঙের ছাপা শিফন পোশাকে।
নরম কাপড়, শরীর ছুঁয়ে নেমে যাওয়া সিলুয়েট, স্বচ্ছন্দ গতি—লুকটি ছিল আগের দুটির চেয়ে অনেক বেশি হালকা। সঙ্গে ক্রিম রঙের মিউলস, বড় বাদামি সানগ্লাস, সোনালি ঝোলা কানের দুল আর ধাতব নকশার ক্রিম রঙের ব্যাগ।
কালো গাউনের গাম্ভীর্য নেই, অ্যাকোয়া মিনি ড্রেসের ঝলকও নেই। আছে এক ধরনের অনায়াস সৌন্দর্য।
আমাল ক্লুনির ফ্যাশন নিয়ে কথা বলতে গেলে শুধু ব্র্যান্ডের নাম বললে ভুল হবে। কারণ তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি পোশাকে নয়, পোশাক বেছে নেওয়ার আত্মবিশ্বাসে।
তিনি জানেন কখন নিজেকে গ্ল্যামারাস করে তুলতে হবে, কখন সংযত থাকতে হবে, আবার কখন একটু স্পোর্টি হতে হবে।

তাঁর পোশাকে নারীসুলভ সৌন্দর্য আছে, কিন্তু তা অতিরিক্ত কোমল নয়। গ্ল্যামার আছে, কিন্তু তা কখনো তাঁর ব্যক্তিত্বকে আড়াল করে না। সাহস আছে তাঁর স্টাইলে, কিন্তু সেটাকে কখনো আরোপিত মনে হয় না।
এই ভারসাম্যটাই আমালকে আলাদা করে।
ভেনিসের সঙ্গে আমালের স্টাইলের একটা অদ্ভুত মিলও আছে।
জল, পুরোনো প্রাসাদ, সরু গলি, শত বছরের স্থাপত্য—সবকিছুর মধ্যে রয়েছে ইতিহাস আর সৌন্দর্যের মিশেল। আমালের পোশাকেও যেন ভেনিসের মতো অতীত আর বর্তমান গলাগলি করে হাঁটে। একদিকে পুরোনো হলিউড, অন্যদিকে একেবারে সমকালীন ফ্যাশন।
ভেনিসে তাঁর ফ্যাশন ইতিহাসও বেশ দীর্ঘ। গত বছর জর্জ ক্লুনির ‘জে কেলি’ ছবির প্রিমিয়ারে তিনি পরেছিলেন ভিনটেজ জ্যঁ-লুই শেরেরের নাটকীয় ম্যাজেন্টা গাউন। ২০২৪ সালেও তাঁর ভার্সাচির করসেট ও রাফল গাউন আলোচনায় এসেছিল।
তাই এবারও তাঁর দিকে ক্যামেরা ঘোরাটা নতুন কিছু নয়।

একসময় আমাল ক্লুনির নাম উঠলেই আলোচনার কেন্দ্রে থাকতেন জর্জ ক্লুনি। এখন সেই সমীকরণ বদলে গেছে।
আমাল নিজের জায়গা নিজেই তৈরি করেছেন—পেশায় আইনজীবী, পরিচয়ে মানবাধিকারকর্মী, আর ফ্যাশনে স্বতন্ত্র স্টাইল আইকন।
ভেনিসে তাঁর প্রতিটি উপস্থিতি তাই এখন আর শুধু ‘জর্জ ক্লুনির সঙ্গে আমাল’ নয়। বরং আমাল ক্লুনির নিজস্ব ফ্যাশন মুহূর্ত।
অলিভ গ্রিন সাটিন স্যুট থেকে নাটকীয় কালো গাউন, সেখান থেকে অ্যাকোয়া ফ্রিঞ্জ মিনি, আবার রাস্পবেরি প্রিন্ট—এক উৎসব, অনেক বৈচিত্র্য।
একই মানুষ। প্রতিবার আলাদা গল্প।
আর সম্ভবত এটাই আমাল ক্লুনির স্টাইলের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক—তিনি ফ্যাশনের পেছনে ছুটছেন না। নিজের ব্যক্তিত্ব দিয়েই ফ্যাশনের গল্পটা লিখছেন।
ছবি: এএফপি/ইন্সটাগ্রাম