৭ কেজি পেশি বাড়িয়েও কমেনি গতি, লামিন ইয়ামালের ফিটনেস রহস্যে নজর সবার
শেয়ার করুন
ফলো করুন

তবে গত এক বছরে ইয়ামালের খেলায় যে পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছে, তা শুধু তার ফুটবল দক্ষতায় নয়, শারীরিক সক্ষমতাতেও। আগের তুলনায় তিনি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং প্রতিপক্ষের শারীরিক চাপ সামলাতে সক্ষম। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, শরীরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেশিশক্তি যোগ করেও তিনি নিজের স্বাভাবিক গতি ও ক্ষিপ্রতা অক্ষুণ্ন রাখতে পেরেছেন। আধুনিক ফুটবলে এটি সহজ কোনো বিষয় নয়।

এই পরিবর্তনের পেছনে আছে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা, নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, লক্ষ্যভিত্তিক অনুশীলন এবং কঠোর শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবনযাপন।

শক্তির ভিত্তি তৈরি হয় রান্নাঘরে

পেশাদার ক্রীড়াবিদদের ক্ষেত্রে প্রায়ই বলা হয়, ম্যাচের অর্ধেক জেতা হয় রান্নাঘরে। ইয়ামালের ক্ষেত্রেও বিষয়টি সত্য।

তার প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে শরীর প্রয়োজনীয় শক্তি পাওয়ার পাশাপাশি দ্রুত পেশি পুনর্গঠন করতে পারে। তিনি অ্যালকোহল থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকেন এবং নিয়মিত খাদ্যতালিকায় রাখেন চর্বিহীন প্রোটিন, শর্করা, ফলমূল ও বিভিন্ন ধরনের সবজি।

সকালের নাস্তায় সাধারণত থাকে ডিমের অমলেট, অ্যাভোকাডো এবং অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদান। এই সংমিশ্রণ থেকে শরীর পায় উচ্চমানের প্রোটিন, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং গুরুত্বপূর্ণ ভিটামিন।

দুপুর ও রাতের খাবারে থাকে গ্রিলড চিকেন, মাছ, স্যামন কিংবা টুনার মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার। এর সঙ্গে থাকে ভাত, শস্যজাতীয় খাবার এবং পর্যাপ্ত সবজি। ফলে শরীর দীর্ঘ সময় শক্তি ধরে রাখতে পারে এবং অনুশীলনের পর দ্রুত পুনরুদ্ধারও সম্ভব হয়।

ম্যাচের আগে বিশেষ খাবার

প্রতিটি ফুটবলারেরই কিছু ব্যক্তিগত অভ্যাস থাকে। ইয়ামালের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নয়।

তার মা আফ্রিকার গিনি থেকে আসায় ছোটবেলা থেকেই তিনি পশ্চিম আফ্রিকান খাবারের সঙ্গে পরিচিত। ম্যাচের আগে তিনি প্রায়ই পছন্দ করেন ‘পুলে ইয়াসা’ নামের একটি জনপ্রিয় খাবার। মুরগির মাংস, ভাত এবং চিনাবাদামের সস দিয়ে তৈরি এই খাবারটি দীর্ঘ সময় শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে।

ভাত থেকে পাওয়া যায় প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেট, আর চিনাবাদামের সস সরবরাহ করে স্বাস্থ্যকর চর্বি, উদ্ভিজ্জ প্রোটিন এবং ম্যাগনেসিয়াম। দীর্ঘ ম্যাচে কর্মক্ষমতা ধরে রাখার জন্য এই উপাদানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

অনুশীলনের পর রিকভারি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

ফুটবলে উন্নতির জন্য শুধু কঠোর অনুশীলনই যথেষ্ট নয়। অনুশীলনের পর শরীরকে দ্রুত পুনরুদ্ধার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ইয়ামাল সাধারণত ফলের স্মুদি, গ্রিক ইয়োগার্ট এবং তাজা ফল খেতে পছন্দ করেন। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি এবং ইলেকট্রোলাইট গ্রহণ করেন। কারণ উচ্চমাত্রার অনুশীলনের সময় শরীর থেকে যে পরিমাণ তরল বেরিয়ে যায়, তা দ্রুত পূরণ করা না গেলে কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে।

বর্তমান ক্রীড়াবিজ্ঞানে হাইড্রেশনকে পারফরম্যান্সের অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে ধরা হয়। ইয়ামালও সেই নিয়ম কঠোরভাবে অনুসরণ করেন।

বিজ্ঞাপন

রমজানে বদলে যায় পুরো রুটিন

একজন মুসলিম ফুটবলার হিসেবে রমজান মাসে ইয়ামালের জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আসে।

সাহরির সময় তিনি পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করেন এবং রাতের সময় বেশি করে পানি পান করেন। এতে দিনের অনুশীলন কিংবা ম্যাচের সময় শরীরের শক্তি ধরে রাখা সহজ হয়।

ফুটবলের ব্যস্ত সূচির মাঝেও ধর্মীয় অনুশাসন এবং পেশাদার দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার বিষয়টি তরুণ এই ফুটবলারের ব্যক্তিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

শক্তিশালী পা, আরও শক্তিশালী উপস্থিতি

একজন উইঙ্গারের জন্য গতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক শক্তি।
তাই ইয়ামালের প্রশিক্ষণের বড় অংশজুড়ে থাকে স্কোয়াট, ডেডলিফট এবং লাঞ্জের মতো ব্যায়াম। এসব অনুশীলন পায়ের শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি ভারসাম্য উন্নত করে এবং প্রতিপক্ষের ট্যাকলের সময় শরীরকে স্থির রাখতে সাহায্য করে।

ফলে তিনি বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেন এবং শারীরিক লড়াইয়েও আগের তুলনায় অনেক বেশি কার্যকর হয়ে উঠেছেন।

শুধু পা নয়, পুরো শরীরের উন্নয়ন

অনেকেই মনে করেন ফুটবলারদের জন্য শুধু লোয়ার বডি ট্রেনিংই যথেষ্ট। বাস্তবে আধুনিক ফুটবলে পুরো শরীরের শক্তি সমান গুরুত্বপূর্ণ।

ইয়ামালের নিয়মিত প্রশিক্ষণে বেঞ্চ প্রেস, পুল-আপ, পুশ-আপ এবং বিভিন্ন কোর এক্সারসাইজ অন্তর্ভুক্ত থাকে। সাইড প্ল্যাঙ্ক, মাউন্টেন ক্লাইম্বার এবং স্থিতিশীলতা বাড়ানোর নানা ব্যায়াম তার শরীরের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা উন্নত করে।

ফলে দ্রুত দিক পরিবর্তন, চাপের মধ্যে বল নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রতিপক্ষের ধাক্কা সামলেও ভারসাম্য ধরে রাখা তার জন্য সহজ হয়ে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

গতি ধরে রাখতে আলাদা অনুশীলন

পেশিশক্তি বাড়ানোর একটি ঝুঁকি হলো গতি কমে যাওয়া। কিন্তু ইয়ামালের ক্ষেত্রে ঠিক উল্টোটা দেখা গেছে।

এর কারণ তার প্রশিক্ষণে শক্তি বৃদ্ধির পাশাপাশি বিস্ফোরক গতির ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়া হয়। কেটলবেল সুইং, বক্স জাম্প এবং বিভিন্ন ধরনের প্লাইওমেট্রিক অনুশীলন তার গতি বাড়াতে সাহায্য করে।

এই ধরনের অনুশীলন মাঠে হঠাৎ দিক পরিবর্তন, ছোট জায়গায় দ্রুত গতি তোলা এবং প্রতিপক্ষকে কাটিয়ে ওঠার ক্ষমতা বাড়ায়।

বিশ্রামও তার প্রশিক্ষণের অংশ

আধুনিক ফুটবলে বিশ্রামকে আর অলস সময় হিসেবে দেখা হয় না। বরং এটিকে পারফরম্যান্স উন্নয়নের একটি বৈজ্ঞানিক ধাপ হিসেবে ধরা হয়।
ইয়ামালের সাপ্তাহিক সূচিতে একটি দিন তুলনামূলক হালকা কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ থাকে। সে সময় তিনি হালকা জগিং, সাঁতার কিংবা যোগব্যায়াম করেন।
এর ফলে শরীর পুনরুদ্ধারের সুযোগ পায়, পেশির চাপ কমে এবং চোটের ঝুঁকিও হ্রাস পায়।

নতুন প্রজন্মের ফিটনেস আইকন

২০২৫-২৬ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে গোল এবং অ্যাসিস্ট, দুই ক্ষেত্রেই অসাধারণ অবদান রেখে ইয়ামাল নিজেকে শুধু প্রতিভাবান কিশোর নয়, দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তারকা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাম্প্রতিক মৌসুমে তার পরিসংখ্যান এবং ধারাবাহিক পারফরম্যান্সই বলে দেয়, তিনি শুধু দক্ষতায় নয়, শারীরিক সক্ষমতার দিক থেকেও নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন।

বর্তমানে ২০২৬ বিশ্বকাপেও স্পেনের অন্যতম বড় ভরসা হিসেবে তাকে দেখা হচ্ছে। সাম্প্রতিক চোট কাটিয়ে তিনি আবারও পূর্ণ ফিটনেসে ফিরেছেন এবং জাতীয় দলের কোচিং স্টাফ তাকে ম্যাচ খেলার জন্য প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন।

লামিন ইয়ামালের গল্প আসলে কোনো শর্টকাটের গল্প নয়। এটি পরিকল্পনা, ধৈর্য, নিয়মিত অনুশীলন এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের গল্প। প্রতিভা তাকে আলোচনায় এনেছে, কিন্তু সেই প্রতিভাকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে তার জীবনযাপনের শৃঙ্খলা।

এ কারণেই লামিন ইয়ামাল শুধু ভবিষ্যতের তারকা নন; তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা বুঝে গেছে সাফল্য আসে না একদিনে, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট সঠিক সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই তৈরি হয় বড় অর্জনের পথ।

প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১১: ০১
বিজ্ঞাপন