বাবাকে হারানোর বেদনা, চোটের সঙ্গে লড়াই: তৃতীয়বার ব্যালন ডি’অরজয়ী কে এই অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস
শেয়ার করুন
ফলো করুন

গত মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, মাঝমাঠে নেতৃত্ব ও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তৃতীয়বারের মতো মেয়েদের ব্যালন ডি’অর জিতেছেন অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াস। শৈশব থেকেই বার্সেলোনার সমর্থক এই স্প্যানিশ ফুটবলারের ক্যারিয়ারে রয়েছে সাফল্য, বাবাকে হারানোর বেদনা আর গুরুতর চোট কাটিয়ে ফেরার গল্প। ২০২১ ও ২০২২ সালে টানা দুবার এই পুরস্কার জয়ের পর চোটের কারণে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছিল তাঁকে। ৩২ বছর বয়সে নতুন ক্লাবে পাড়ি জমিয়েও বিশ্ব ফুটবলে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন পুতেয়াস। তবে সাফল্যের আড়ালেও আছে পাওয়া–না পাওয়ার হিসাব।

ছোটবেলা থেকেই বার্সেলোনার সমর্থক

১৯৯৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি স্পেনের কাতালোনিয়ার মলেত দেল ভায়েস শহরে জন্ম অ্যালেক্সিয়া পুতেয়াসের। মাত্র তিন বছর বয়স থেকেই ফুটবলের প্রতি প্রবল আগ্রহ তাঁর। ছোটবেলায় বার্সেলোনার সমর্থক ছিলেন তিনি। রিভালদো, রোনালদিনিও, স্যামুয়েল ইতোর মতো তারকাদের খেলা তাঁকে অনুপ্রাণিত করত। স্বপ্ন দেখতেন বড় হয়ে বার্সেলোনার হয়ে খেলার।
সেই স্বপ্ন পূরণের পথ অবশ্য সহজ ছিল না। পেশাদার ফুটবলে নিজের জায়গা তৈরি করতে বিভিন্ন ক্লাবে খেলতে হয়েছে তাঁকে। ২০১২ সালে ১৮ বছর বয়সে লেভান্তে থেকে বার্সেলোনার নারী দলে যোগ দেন পুতেয়াস। এরপর ধীরে ধীরে দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন। মাঝমাঠে দখলে রাখা, সতীর্থদের গোলের সুযোগ করে দেওয়া এবং নিজে গোল করার দক্ষতায় আলাদা পরিচিতি পান তিনি।

বিজ্ঞাপন

বাবাকে হারানোর বেদনা

পুতেয়াসের জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়গুলোর একটি শুরু হয় ২০১২ সালে। সে বছর তাঁর বাবা জাউমে মারা যান। বাবার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল গভীর। এই শোকের মধ্যেই স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। বাবাকে হারানোর মাত্র দুই সপ্তাহ পর টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে দলকে নেতৃত্ব দেন। ফাইনালে উঠলেও শেষ পর্যন্ত সুইডেনের কাছে হেরে যায় স্পেন।

বাবার মৃত্যু পুতেয়াসের জীবনে গভীর ছাপ ফেলে। ২০২১ সালে প্রথমবার ব্যালন ডি’অর জয়ের পর পুরস্কার গ্রহণের বক্তব্যেও বাবাকে স্মরণ করেন তিনি। বলেছিলেন, আশা করেন, তাঁর বাবা তাঁকে নিয়ে গর্বিত। সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও বাবার অনুপস্থিতি যে তাঁকে নাড়া দেয়, সেই বক্তব্যে তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

গুরুতর চোটে থমকে যাওয়া ক্যারিয়ার

২০২১ সালে প্রথমবার মেয়েদের ব্যালন ডি’অর জেতেন পুতেয়াস। পরের বছরও একই পুরস্কার জিতে টানা দুইবার বিশ্বের সেরা নারী ফুটবলারের স্বীকৃতি পান তিনি। কিন্তু ২০২২ সালের জুলাইয়ে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ শুরুর ঠিক আগে অনুশীলনে বাঁ হাঁটুর অ্যান্টেরিয়র ক্রুসিয়েট লিগামেন্টে গুরুতর চোট পান। দীর্ঘ পুনর্বাসনের কারণে প্রায় ১০ মাস মাঠের বাইরে থাকতে হয় তাঁকে।

এই চোটের কারণে ইউরো ২০২২-এ খেলা হয়নি তাঁর। দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে থাকায় নিজের সেরা ছন্দে ফেরার চ্যালেঞ্জও সামনে আসে। তবে ধৈর্য ধরে পুনর্বাসন চালিয়ে যান পুতেয়াস। ২০২৩ সালের এপ্রিলে মাঠে ফেরেন তিনি। ধীরে ধীরে ফিটনেস ও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়ে আবারও বার্সেলোনার হয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন।
২০২৩ সালে স্পেন নারী ফুটবল বিশ্বকাপ জেতে। চোট থেকে সদ্য ফেরায় সেই আসরে পুতেয়াসের খেলার সুযোগ সীমিত ছিল। তবু পরবর্তী সময়ে বার্সেলোনার হয়ে তাঁর পারফরম্যান্স প্রমাণ করে, দীর্ঘ বিরতি তাঁকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। ২০২৪ সালের নারী চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে গোল করে দলের শিরোপা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

১৪ বছরের বার্সেলোনা অধ্যায়ের সমাপ্তি

২০১২ সালে বার্সেলোনায় যোগ দেওয়ার পর ক্লাবটির সাফল্যের অন্যতম মুখ হয়ে ওঠেন পুতেয়াস। অধিনায়ক হিসেবে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, জিতেছেন ঘরোয়া লিগ, কাপ ও ইউরোপীয় শিরোপা। বার্সেলোনার নারী দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি। ২০২৬ সালে ক্লাব ছাড়ার সময় তাঁর গোলসংখ্যা ছিল ২৩২। ২০২৫-২৬ মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে আবারও দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করেন এই মিডফিল্ডার। নারী চ্যাম্পিয়নস লিগে সাতটি গোল করেন এবং সাতটি গোলে সহায়তা দেন। দলটি চারটি শিরোপা জেতে। ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় পুতেয়াসের অবদান তাঁকে মৌসুমের সেরা খেলোয়াড়ের স্বীকৃতি এনে দেয়।

এরপর ২০২৬ সালের জুলাইয়ে ইংল্যান্ডের ক্লাব লন্ডন সিটি লায়নেসেসে যোগ দেন তিনি। বার্সেলোনার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের ইতি টেনে নতুন লিগে নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। নতুন ক্লাবে যোগ দেওয়ার পরপরই তৃতীয়বার ব্যালন ডি’অর জয় তাঁর ক্যারিয়ারে যোগ করে আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়।

তৃতীয়বার ব্যালন ডি’অর জয়

২০২৬ সালের ২৬ অক্টোবর লন্ডনে অনুষ্ঠিত ব্যালন ডি’অর অনুষ্ঠানে মেয়েদের বিভাগে সেরা ফুটবলারের পুরস্কার জেতেন পুতেয়াস। ২০২১ ও ২০২২ সালের পর এবারও তাঁর হাতে উঠল এই সম্মান। এর মধ্য দিয়ে স্পেনের সতীর্থ আইতানা বোনমাতির সঙ্গে মেয়েদের ব্যালন ডি’অর জয়ের সর্বোচ্চ সংখ্যার রেকর্ডে ভাগ বসান তিনি। দুজনেরই এই পুরস্কার জয়ের সংখ্যা এখন তিন।
গত মৌসুমে বার্সেলোনার হয়ে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স, মাঝমাঠে নেতৃত্ব এবং গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে এসেছে এই পুরস্কার। ৩২ বছর বয়সে নতুন ক্লাবে যোগ দেওয়ার পরও বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন পুতেয়াস।

নারী ফুটবলে সমান সুযোগের পক্ষে

মাঠের সাফল্যের বাইরেও নারী ফুটবলে সমান সুযোগের পক্ষে কথা বলেন পুতেয়াস। তাঁর মতে, মেয়েরা ফুটবল খেলতে চাইলে তাদেরও ছেলেদের মতো সুযোগ পাওয়া উচিত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েরা যেন আরও ভালো পরিবেশে খেলতে পারে, সেই প্রত্যাশার কথা বিভিন্ন সময়ে জানিয়েছেন তিনি।

পুতেয়াসের নিজের পথচলাতেও ছিল নানা বাধা। ছোটবেলার স্বপ্ন পূরণ, বাবাকে হারানোর শোক, গুরুতর চোটের পর মাঠে ফেরা এবং নতুন ক্লাবে নতুন করে শুরু, প্রতিটি অধ্যায়েই তাঁকে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তবু ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বারবার ঘুরে দাঁড়িয়েছেন তিনি। তৃতীয়বার ব্যালন ডি’অর জয় তাই তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আবারও শীর্ষে ফেরার স্বীকৃতি।

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৬, ১১: ২২
বিজ্ঞাপন