
মোবারক ভাই থেকে ফয়সাল দ্য কন্ট্রাক্ট কিলার। এই ভিন্নতার মাঝেও অভিনেতা আরেফিন জিলানীর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত রেট্রো ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। এসব নিয়েই ঈদ পরবর্তী আড্ডা হলো তাঁর সঙ্গে।
মোবারক ভাই থেকে ফয়সাল দ্য কন্ট্রাক্ট কিলার। একেকটি চরিত্রে একেক রকম চেহারা। কিন্তু এই ভিন্নতার মাঝেও অভিনেতা আরেফিন জিলানীর মধ্যে লুকিয়ে আছে এক অদ্ভুত রেট্রো ফ্যাশন স্টেটমেন্ট। আর তার মাঝেই বর্তমান প্রজন্মের জেনজি এই অভিনেতা বারবার প্রমাণ করছেন অভিনয় শুধু সংলাপ নয়, বরং চরিত্রের লুকে ডুবে যাওয়ার এক গভীর শিল্প।

সবেমাত্র ঈদ গেল। সে নিয়েই আলাপ শুরু হলো এই অভিনেতার সঙ্গে। ছোটবেলার ঈদ নিয়ে বললেন, ঈদের সেসব স্মৃতি যেন এক নস্টালজিক সিনেমা। বাবা ঢাকার বাইরে চাকরি করতেন, তাই সারা বছর দেখা না পেলেও ঈদ এলেই যেন সব বদলে যেত। ঈদের সকাল, বাবার হাত ধরে নামাজে যাওয়া—এই ছোট্ট মুহূর্তটিই তাঁর কাছে ছিল সবচেয়ে বড় আনন্দ। তিনি বলেন, তখনকার ঈদ ছিল অনেক বেশি ব্যক্তিগত পরিসরকেন্দ্রিক। মোবাইল ফোনের বদলে ছিল ঈদ কার্ড। নিজের হাতে বানানো কার্ড, আলাদা আলাদা বার্তা হাতে লেখা সবকিছুতেই থাকত এক বিশেষ অনুভূতি। শুধু তাই নয়, ঈদের আগের দিনগুলোতেও ছিল অন্যরকম উচ্ছ্বাস। বন্ধুদের সঙ্গে মিলে পাড়ায় ছোট ছোট কার্ডের দোকান বসাতেন। এক টাকা, দুই টাকার কার্ড বিক্রি করতেন। সেই আনন্দ আজকের দিনে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘ঈদের আগে পুরো এলাকা সরগরম হয়ে যেত এই অনুভূতিটাই এখন সবচেয়ে বেশি মিস করি।’’ বললেন জিলানী। ঈদে মায়ের সব রান্না ভালো লাগে তবে মায়ের হাতের কাচ্চি যেকোন রেস্টুরেন্টকে হার মানাবে বলে তার বিশ্বাস। নিজের স্ত্রী সঙ্গীত শিল্পী ও চিকিৎসক ফাতেমাতুজ জোহরা ঐশীর হাতের ডেজার্ট ও তেহারির প্রশংসা করলেন তিনি।
অভিনয়ের সঙ্গে তার সম্পর্কটা তৈরি হয়েছে খুব স্বাভাবিকভাবেই। ছোটবেলা থেকেই কবিতা, গান, নাটক সংস্কৃতি চর্চার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিলেন।নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক করবার সময় কালচারাল ক্লাবের বিভিন্ন ওয়ার্কশপ আর থিয়েটারে অংশগ্রহন করেন।

গোলাম সোহরাব দোদুলের একটি প্রজেক্টে ৩–৪ মিনিটের উপস্থিতি দিয়েই শুরু হয় তার ক্যামেরার সামনে যাত্রা। বড় পর্দায় প্রথম কাজ করেন গোলাম সারোয়ার দোদুলের ‘সাপলুডু’ সিনেমায়,যা বেশ প্রশংসিত হয়।
সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া ‘ক্যাকটাস’ ওয়েবসিরিজে এক ভয়ংকর চরিত্রের লুকে দেখা যাচ্ছে জিলানীকে।এখানে তাঁর চরিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক কন্ট্রাক্ট কিলারের, যার ভেতরে আছে অদ্ভুত এক সাইকোলজিক্যাল লেয়ার। এই চরিত্রের জন্য তিনি ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সিনেমা দেখে, চরিত্র বিশ্লেষণ করে তৈরি করেছেন নিজের একটি আলাদা স্টেটমেন্ট। লুকের দিক থেকেও ছিল নিরীক্ষা। ডার্ক গথিক ও কে-পপ স্টাইলের মিশ্রণ, সঙ্গে ক্রসড্রেসিং এলিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে এখানে। জিলানীর ভাষায়, “আমি চেয়েছিলাম এমন এক ভিলেন তৈরি করতে, যাকে দেখে দর্শক অস্বস্তি বোধ করবে, ভয় পাবে কিন্তু চোখ সরাতে পারবে না।” আর তেমনই চেয়েছিলেন পরিচালক শিহাব শাহীন।

শুধু মানসিক প্রস্তুতি নয়, শারীরিকভাবেও নিজেকে তৈরি করেছেন জিলানী এই চরিত্রের জন্য। স্টান্টম্যান ছাড়াই বেশিরভাগ অ্যাকশন দৃশ্য নিজেই করেছেন দৌড়, লাফ, ক্লাইম্বিং সবকিছুতেই দিয়েছেন নিজের সর্বোচ্চটা।জানালেন শেষ এপিসোডের মারদাঙ্গা দৃশ্যের শুটের আগের দিন প্রচণ্ড জ্বর ছিলো তাই নিয়েই তিনি অভিনয় করছেন।জানালেন এই সব সাহসী দৃশ্যের প্রতিটি তিনি নিজেই করেছেন কোন স্টান্টম্যান ব্যবহার করা হয়নি দুই-তিন তলা থেকে লাফিয়ে পড়া থেকে শুরু করে দড়ি বেয়ে তিন-চার তলা ওঠার দৃশ্য তিনি নিজেই করেছেন।

এখানে ফিটনেস অনেক বড় বিষয় ছিল। সে কারণে জিমে করেছেন আলাদা কঠোর রুটিন। ছিলেন ক্যালোরি ডেফিসিয়েট ডায়েটে। যাতে তাঁকে পর্দায় বেমানান না লাগে।

অন্যদিকে ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ পরিচালক তানিম নূরের এক রোড কমেডি জনরার সিনেমা যা জনপ্রিয় সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি। এই সিনেমায় জিলানীর করা খুবই ভাইব্রেন্ট ফয়সাল চরিত্র একেবারেই আলাদা। আর তাঁর লুকেও তা স্পষ্ট প্রতীয়মান।
জিলানীর ব্যক্তিগত ফ্যাশনেও আছে স্বাতন্ত্র্য। তাঁর স্টাইল এমনিতে ক্যাজুয়াল। ঈদে পাঞ্জাবি তার পছন্দের তালিকায় থাকলেও, তিনি ভালোবাসেন ক্রপ শার্ট, ব্যাগি জিন্স, বক্সি ফিট, ড্রপ শোল্ডার টি-শার্টের মতো ট্রেন্ডি ক্যাজুয়াল লুক। সিনেমা হলে নিজের ছবি দেখতে গেলে তিনি সাধারণত আধা-ফরমাল বা স্টাইলিশ ক্যাজুয়াল লুকে যেতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

একসময় ১১৮ কেজি ওজন থেকে নিজেকে ফিট করে তোলার কঠিন জার্নি, আর্থিক সংকট, কাজের অভাব সবকিছুর মধ্য দিয়েই গিয়েছেন জিলানী। মাত্র ২৯ হাজার টাকা হাতে নিয়ে নতুন করে শুরু করেছিলেন পথচলা। আজ তিনি সেই জায়গা থেকে উঠে এসে নিজের অবস্থান তৈরি করছেন ধীরে ধীরে, কিন্তু দৃঢ়ভাবে।

আরেফিন জিলানীর গল্পটা আসলে শুধু একজন অভিনেতার গল্প নয় এটা বিশ্বাসের গল্প, অধ্যবসায়ের গল্প। হাল ফ্যাশনের পাঠকদের জন্য তার বার্তাও সহজ। “নিজের মতো থাকুন, নিজের স্টাইল খুঁজে নিন, আর নিজের স্বপ্নকে কখনো ছোট করে দেখবেন না।”
ছবি: আরেফিন জিলানী