
আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি আলিকো ড্যাঙ্গোটে আবারও আলোচনায়। নাইজেরিয়ার এই শিল্পপতির মোট সম্পদের পরিমাণ এখন প্রায় ৩৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা তাকে বিশ্বের ৬৫তম ধনী ব্যক্তির অবস্থানে নিয়ে গেছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে তার সম্পদ বেড়েছে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি। ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত তার সম্পদ বেড়েছে প্রায় ৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। তাঁর সাফল্য ও জীবনের গল্প শুনলে প্রশ্ন জাগে, আসলেই কি আফ্রিকা মানে শুধুই দারিদ্র্য?

ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ার্স ইনডেক্সের তথ্য অনুযায়ী, গত সপ্তাহেও ড্যাঙ্গোটের সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার এই বড় উত্থান বিশ্বব্যাপী ব্যবসায়িক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ড্যাঙ্গোটের এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার বিশাল শিল্প সাম্রাজ্যের ধারাবাহিক সম্প্রসারণ। ড্যাঙ্গোটে গ্রুপ বর্তমানে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সিমেন্ট, সার, খাদ্যপণ্য, তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল খাতে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
ড্যাঙ্গোটে সিমেন্ট বর্তমানে আফ্রিকার সবচেয়ে বড় সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। কোম্পানিটি ১০টিরও বেশি আফ্রিকান দেশে কার্যক্রম চালাচ্ছে এবং বছরে প্রায় ৫৫ মিলিয়ন টন সিমেন্ট উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জে আংশিক শেয়ার তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে কোম্পানিটির গুরুত্ব আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, ড্যাঙ্গোটে ফার্টিলাইজারও দ্রুত সম্প্রসারণ করছে। ইরান সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে সারের সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় ড্যাঙ্গোটের সারের চাহিদা বেড়েছে। সম্প্রসারণের জন্য কোম্পানিটি নতুন ডলার বন্ড ছাড়ার পরিকল্পনা করছে।

তবে ড্যাঙ্গোটের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত প্রকল্প হচ্ছে তেল শোধনাগার। নাইজেরিয়ার লাগোসে তাঁর নির্মিত বিশাল রিফাইনারি বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম বড় একক তেল শোধনাগার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রকল্পে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নাইজেরিয়া এখন জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশ থেকে রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হওয়ার পথে এগোচ্ছে।
এছাড়া তিনি কেনিয়াতেও নতুন একটি তেল শোধনাগার নির্মাণের পরিকল্পনা করছেন। এই প্রকল্পে প্রায় ১৫ থেকে ১৭ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হতে পারে। এটি বাস্তবায়িত হলে পূর্ব আফ্রিকার অন্যতম বড় শিল্প প্রকল্পে পরিণত হবে।
আলিকো ড্যাঙ্গোটে ১৯৭৭ সালে ছোট পরিসরে ব্যবসা শুরু করেন। প্রথমে তিনি চিনি, চাল ও সিমেন্ট আমদানি করে বিক্রি করতেন। পরে তিনি স্থানীয়ভাবে উৎপাদনে জোর দেন। এভাবেই ধীরে ধীরে তিনি আফ্রিকার সবচেয়ে বড় শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্যাঙ্গোটের সফলতার মূল রহস্য হলো লাভের অর্থ আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করা এবং মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারকে লক্ষ্য করা। যদিও কেউ কেউ মনে করেন, সরকারি নীতিগত সুবিধাও তার ব্যবসা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। তবুও এতে সন্দেহ নেই যে, আলিকো ড্যাঙ্গোটে এখন আফ্রিকার শিল্প ও অর্থনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী নামগুলোর একটি।
আলিকো ড্যাঙ্গোটের জীবন নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
পূর্ণ নাম: আলিকো ড্যাঙ্গোটে
জন্ম: ১০ এপ্রিল ১৯৫৭
জন্মস্থান: কানো, নাইজেরিয়া
জাতীয়তা: নাইজেরিয়ান
পেশা: উদ্যোক্তা, শিল্পপতি ও বিনিয়োগকারী
পরিচিতি: আফ্রিকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি এবং বিশ্বের অন্যতম ধনী কৃষ্ণাঙ্গ ব্যবসায়ী

শুরুর জীবন
আলিকো ড্যাঙ্গোটে একটি ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলা থেকেই ব্যবসার প্রতি তার আগ্রহ ছিল। তিনি স্কুলে পড়ার সময়ও মিষ্টি কিনে সহপাঠীদের কাছে বিক্রি করতেন। পরে নাইজেরিয়ার আল-আজহার ইউনিভার্সিটি থেকে ব্যবসা বিষয়ে পড়াশোনা করেন।
নাইজেরিয়ার কানো শহরে একটি ধনী হাউসা মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন আলিকো ড্যাঙ্গোটে। তার পিতার নাম মোহাম্মদ ড্যাঙ্গোটে এবং মাতার নাম মারিয়া সানুসি দান্তাটা।
তাঁর পরিবার ব্যবসায়িকভাবে খুবই প্রভাবশালী ছিল। তার প্রপিতামহ ছিলেন আলহাসান দান্তাটা, যিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান ও ধনী ব্যবসায়ী। শৈশবে তিনি তার দাদার (আলহাজি সানুসি দান্তাটা) কাছে বড় হন, এবং সেখান থেকেই তার মধ্যে ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। তার ভাই সানি ড্যাঙ্গোটে ২০২১ সালের নভেম্বরে মারা যান।
ব্যক্তিগত জীবন ও বিবাহ
আলিকো ড্যাঙ্গোটে বর্তমানে বিবাহবিচ্ছিন্ন এবং জানা যায় তিনি একা আছেন। তিনি জীবনে একাধিকবার বিবাহ করেছেন।
তার প্রথম বিয়ে হয় ১৯৭৭ সালে জয়নাবের সঙ্গে, যা তার পরিবারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী স্থানীয় রীতিতে সম্পন্ন হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদের বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে।
পরে তিনি মারিয়া মুহাম্মদ রুফাইকে বিয়ে করেন, তবে এই সম্পর্কও ২০১৭ সালে বিচ্ছেদের মাধ্যমে শেষ হয়।
ড্যাঙ্গোটে তার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবন খুবই গোপন রাখেন। তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতে পছন্দ করেন এবং বিলাসবহুল জীবন থেকে দূরে থাকেন বলে পরিচিত। তিনি নিজের গাড়ি নিজেই চালান এবং দীর্ঘ সময় ধরে, প্রায় ১২ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন।

সন্তান
আলিকো ড্যাঙ্গোটের চারজন সন্তান রয়েছে—তিনজন কন্যা এবং একজন দত্তকপুত্র।
হালিমা ড্যাঙ্গোটে: একজন ব্যবসায়ী এবং ড্যাঙ্গোটে গ্রুপ ও ড্যাঙ্গোটে ফাউন্ডেশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আছেন। তিনি সুলাইমান সানি বেলোর সঙ্গে বিবাহিত।
মারিয়া ড্যাঙ্গোটে: কোম্পানির কার্যক্রমে যুক্ত একজন নির্বাহী।
ফাতিমা ড্যাঙ্গোটে: তিনি জামীল মুহাম্মদ আবুবকর নামের একজন পাইলটকে বিয়ে করেছেন।
আব্দুররহমান ফাসাসি: দত্তক নেওয়া সন্তান।
শিক্ষা
তিনি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন কানোর শেখ আলী কুমাসি মাদ্রাসা এবং ক্যাপিটাল হাই স্কুল থেকে।
পরবর্তীতে তিনি মিশরের কায়রো শহরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যবসায় অধ্যয়ন ও প্রশাসনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
ব্যবসার শুরু
১৯৭৭ সালে তিনি তার চাচার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করেন। শুরুতে তিনি চিনি, চাল, সিমেন্ট ও অন্যান্য পণ্য আমদানি করে বিক্রি করতেন। খুব দ্রুতই তার ব্যবসা বড় হতে থাকে।
ড্যাঙ্গোটে গ্রুপ
পরে তিনি “ড্যাঙ্গোটে গ্রুপ” প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে এটি আফ্রিকার সবচেয়ে বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর একটি। এই গ্রুপের ব্যবসা রয়েছে—
সিমেন্ট
চিনি
লবণ
ময়দা
সার
তেল ও গ্যাস
পেট্রোকেমিক্যাল খাতে
সিমেন্ট ব্যবসায় সাফল্য

সফলতার রহস্য
বিশেষজ্ঞদের মতে, তার সফলতার প্রধান কারণ—
স্থানীয়ভাবে পণ্য উৎপাদনে জোর দেওয়া
লাভের অর্থ আবার ব্যবসায় বিনিয়োগ করা
মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার ধরতে পারা
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

সমাজসেবা
আলিকো ড্যাঙ্গোটে ব্যবসার পাশাপাশি সমাজসেবামূলক কাজও করেন। তাঁর ড্যাঙ্গোটে ফাউন্ডেশন শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও দারিদ্র্য দূরীকরণে কাজ করছে।
একটি মজার তথ্য
ড্যাঙ্গোটে একবার বলেছিলেন, “আমি সবসময় বড় স্বপ্ন দেখি। ছোট চিন্তা আমাকে আকর্ষণ করে না।” এই মানসিকতাই তাকে আফ্রিকার সবচেয়ে সফল ব্যবসায়ীদের একজন করে তুলেছে।
সূত্র: গ্লোবাল আফ্রিকা বিজনেস ইনিশিয়েটিভস, উইকিপিডিয়া, ফোর্বস, মিডিয়াম
ছবি: ইন্সটাগ্রাম