
বিশ্ব ধরিত্রী দিবস আজ। অন্তত এই দিনে স্বীকার করতেই হবে, মানুষই একমাত্র প্রাণী, যে নিজের বাসস্থান, এই পৃথিবীকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলেছে অপরিসীম দূষণ ঘটিয়ে। অন্যান্য ক্ষেত্রের মতো বিউটি ইন্ডাস্ট্রি বা সৌন্দর্য খাতেরও রয়েছে সমান দায়।
এবারের ধরিত্রী দিবসের প্রতিপাদ্য, ‘পৃথিবীর প্রতিপক্ষ প্লাস্টিক’।
ইউরোমনিটর ইন্টারন্যাশনালের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই ২০১৮ সালে সৌন্দর্যসামগ্রী এবং স্কিনকেয়ার পণ্য তৈরি করতে প্রায় ৭ দশমিক ৯ বিলিয়ন ইউনিট প্লাস্টিক ব্যবহার করা হয়েছিল। আরেক সমীক্ষায় এসেছে, প্রতিবছর প্রায় ১২০ বিলিয়ন ইউনিট প্লাস্টিক ব্যবহার হয় শুধু বিউটি ইন্ডাস্ট্রিতে। শুধু প্লাস্টিক নয়, সৌন্দর্য পণ্যে ব্যবহৃত নানা রকমের রাসায়নিক উপাদানও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। দেরিতে হলেও এখন সবাই পরিবেশ রক্ষার ব্যাপারে সচেতন হচ্ছেন।

আশার বিষয়, সৌন্দর্যশিল্প ধীরে ধীরে পরিবেশবান্ধব হয়ে উঠছে। বিশ্বের নামকরা বিউটি ব্র্যান্ডগুলো নিজেদের মতো করে টেকসই উৎপাদনের দিকে আগ্রহী হচ্ছে। অন্যদিকে নতুন ব্র্যান্ডগুলোর বেশির ভাগই একদম শুরু থেকেই পরিবেশবান্ধব ব্যবসায়িক মডেল তৈরি করছে। সৌন্দর্যশিল্পের কান্ডারিদের পাশাপাশি সেবা-গ্রহীতা ও ক্রেতা হিসেবে আমাদেরও এগিয়ে আসতে হবে। নিজেদের জীবনযাপনে, সৌন্দর্যচর্চার ক্ষেত্রে পছন্দ-অপছন্দের ক্ষেত্রে সামান্য কিছু অদলবদল এনেই আমরা আমাদের প্রতিদিনের বিউটি রুটিনকে টেকসই করে তুলতে পারি।

সারা বিশ্বেই মেকআপ তোলার জন্য ক্লিনজিং ওয়াইপসের প্রচুর ব্যবহার হয়ে থাকে। কিন্তু ডিসপোজেবল ফেস ওয়াইপস কিন্তু প্লাস্টিক স্ট্র বা ব্যাগের মতোই পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। ফেস ওয়াইপসগুলো যে উপাদানে ভেজানো থাকে, সেটিও খুব ভালো কিছু নয় পরিবেশের জন্য। এ ছাড়া এফডিএর (ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) মতে, ওয়াইপসগুলো পলিয়েস্টার, পলিপ্রোপাইলিন, তুলা, কাষ্ঠমণ্ড অথবা রেয়ন ফাইবারের মতো উপাদান দিয়ে তৈরি। এগুলোর মধ্যে অনেক উপাদান আছে, যা জীবাণু-বিয়োজ্য নয়। বেশির ভাগ ওয়াইপস ল্যান্ডফিলে; অর্থাৎ মাটিতে ফেলে দেওয়া বর্জ্য হিসেবে বছরের পর বছর পড়ে থাকে।
অনেকে কটন প্যাডকে ফেস ওয়াইপসের চেয়ে ভালো বিকল্প মনে করতে পারেন। কিন্তু তুলা উৎপাদনের সময় প্রচুর পানির প্রয়োজন হয় এবং কীটনাশক ব্যবহৃত হয়, যা বন্য প্রাণী ও গাছপালার ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
বাজারে এমন কিছু রিইউজেবল কটন বা মসলিন ক্লথ এবং মেকআপ রিমুভার স্পঞ্জ আছে, যা খুব কোমলভাবে ত্বকের সব মেকআপ পরিষ্কার করতে পারে। এগুলো যেমন টেকসই, তেমনি সাশ্রয়ী। ব্র্যান্ডভেদে এক প্যাকেট (২৫ থেকে ৩০ পিস) মেকআপ ওয়াইপসের দাম ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা। কিন্তু একটি মেকআপ রিমুভার স্পঞ্জের দাম ৮০ থেকে ১৫০ টাকা। ধুয়ে পরিষ্কার করে ব্যবহার করা যায় বছরের পর বছর। নিজেরাও সুতি কাপড় দিয়ে ফেসক্লথের মতো মেকআপ রিমুভার বানিয়ে নেওয়া যায় সহজেই।

নিঃসন্দেহে প্যাকেজিংমুক্ত থাকা পরিবেশের জন্য সবচেয়ে ভালো। এখানে বিউটি ব্র্যান্ড লাশ হেয়ার ও বডি কেয়ারকে এই ‘ন্যাকেড প্যাকেজিং’-এর পথিকৃৎ বলা যায়। তবে ন্যাকেড প্যাকেজিং এখনো সবখানে পাওয়া যাচ্ছে না। আবার সব সৌন্দর্য পণ্যে এ ধরনের প্যাকেজিং সম্ভবও নয়।
তাই অনেকেই প্লাস্টিককে পাশ কাটিয়ে অ্যালুমিনিয়াম ও কাচকে বেছে নিচ্ছেন। এ দুটিকে সৌন্দর্য পণ্য প্যাকেজিংয়ের সেরা বিকল্প হিসেবে ধরা হচ্ছে। তবে এখনো এ ধরনের প্যাকেজিং বাণিজ্যিকভাবে বড় পরিসরে চালু হয়নি। আশার কথা হচ্ছে, এখন অনেক ব্র্যান্ড এগিয়ে আসছে, যারা প্যাকেজিংয়ের জন্য রিসাইকেল করার উপযোগী অ্যালুমিনিয়াম ও কাচ ব্যবহার করছে। যেমন নেইবারহুড বোটানিক্যালস (যুক্তরাজ্যের প্রথম কার্বন নেগেটিভ বিউটি ব্র্যান্ড), উই আর প্যারাডক্স, নিল’স ইয়ার্ড রেমেডিস, এভারিস্ট, ইনিকা, আপসার্কেল ইত্যাদি।
সাসটেইনেবল বিউটি মুভমেন্টে সাড়া দিয়ে অনেক ব্র্যান্ড চালু করেছে রিফিলেবল প্যাকেজিং সিস্টেম। এসব ব্র্যান্ডের মধ্যে আছে রিচুয়ালস, লকসিটান, খিয়ের ওয়েস, ফেন্টি, লে লাবো, ব্লিচ লন্ডন, ফিলস, ক্যানক্যান ইত্যাদি। পণ্য ফুরিয়ে গেলে এই ব্র্যান্ডের ফ্ল্যাগশিপ স্টোরে জমা দিলে তারা আবার নতুন করে রিফিল করে দেবে। আবার কিছু স্কিন ও হেয়ার কেয়ার ব্র্যান্ডের সেলফ সার্ভিস সিস্টেমও রয়েছে; অর্থাৎ রিফিল স্টেশনে গিয়ে নিজে রিফিল করা যাবে।
হেড অ্যান্ড শোল্ডারস, প্যান্টিন, হারবাল এসেন্স, অজি পিঅ্যান্ডজি বিউটির প্রথম ব্র্যান্ড হিসেবে ইউরোপে রিফিলেবল প্যাকেজিং চালু করে। এই রিফিল সিস্টেমের ভেতর রয়েছে ১০০ শতাংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য অ্যালুমিনিয়ামের বোতল ও রিসাইকেবল রিফিল পাউচ, যা ৬০ শতাংশের কম প্লাস্টিক ব্যবহার করে তৈরি। পরিবেশবান্ধব হওয়ার পাশাপাশি সাশ্রয়ী বলে এ প্যাকেজিংয়ের জনপ্রিয়তা বেড়ে চলেছে বিশ্বব্যাপী।

সাশ্রয়ী দেখে বহু বছর ধরে কসমেটিক ব্র্যান্ডগুলো সৌন্দর্য সরঞ্জাম তৈরিতে প্লাস্টিক ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু এখন কিছু ব্র্যান্ড পরিবেশবান্ধব উপাদান যেমন বাঁশ, কাঠ, অ্যালুমিনিয়াম দিয়ে সৌন্দর্য সরঞ্জাম তৈরি করছে। ইকোটুল এমন একটি বিউটি ব্র্যান্ড, যারা জীবাণু বিয়োজ্য মেকআপ ব্রাশ, মেকআপ ব্লেন্ডার ও স্কিনকেয়ার টুল তৈরি করে এ ধারায় শীর্ষ স্থান দখল করে নিয়েছে। এ ছাড়া দ্য বডি শপ, ওয়েস্টমেন অ্যাটেলিয়ের, এলেইট কসমেটিকস, ভ্যাপর এ ধরনের সৌন্দর্য সরঞ্জাম তৈরি করছে। শুধু মেকআপ টুলস নয়, টুথব্রাশ, চিরুনি, ডেন্টাল ফ্লস, কটন বাড এমন দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রীর সাসটেইনেবল সংস্করণ পাওয়া যাচ্ছে।

সৌন্দর্য পণ্যে ব্যবহৃত উপাদানের সাসটেইনেবিলিটি পরিবেশগত উদ্বেগের আরেকটি ক্ষেত্র। প্রসাধনীর উদ্দেশ্যে কিছু চাষ করার একটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কিন্তু পরিবেশে থেকে যায়। উদাহরণস্বরূপ পাম তেলের কথা বলা যেতে পারে। এটি সমগ্র ভোগ্যপণ্যের প্রায় অর্ধেকে ব্যবহার করা হয়। পাম উৎপাদনের জন্য ব্যাপকভাবে বন উজাড় হচ্ছে এবং অনেক প্রজাতির প্রাণীর বিলুপ্তি ঘটছে। একটি পণ্যের উপাদানগুলো টেকসইভাবে সংগ্রহ করা হয়েছে কি না, তা শনাক্ত করার সর্বোত্তম উপায় হলো, প্যাকেজিংয়ে ফেয়ার ট্রেড এবং রেইনফরেস্ট অ্যালায়েন্স, পেটা সার্টিফায়েড লোগোগুলো খুঁজে দেখা।
ছবি : পেকজেলসডটকম