গয়নার দুনিয়ায় নতুন ট্রেন্ড ‘ফেসলেট’ কতটা প্রভাব ফেলতে পারল
শেয়ার করুন
ফলো করুন

টানানথ, নাকফুল, সেপ্টাম রিং, নাকছাবি কিংবা টিকলি। এরপর এক্সট্রিম ট্রেন্ডে এল ঠোঁট বা জিবে পিয়ার্সিং করে লাগানো স্টাড। মুখমণ্ডলের আশপাশের সৌন্দর্য ফুটিয়ে তুলতে এত দিন গয়নার জগতে পরিচিত ছিল মূলত এসব অনুষঙ্গই। ফ্যাশন ট্রেন্ড বদলানোর সঙ্গে বদলাচ্ছে অনুষঙ্গের ধরনও। সেই পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় এখন আলোচনায় এসেছে ‘ফেসলেট’। কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারল এই নতুন ট্রেন্ডি গয়না?

আন্তর্জাতিক ফ্যাশন অঙ্গন পেরিয়ে আমাদের দেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পার্টি লুক থেকে শুরু করে আধুনিক ব্রাইডাল সাজেও জায়গা করে নিচ্ছে এই নতুন অনুষঙ্গ। প্রচলিত ভারী গয়নার বাইরে মুখের গড়নকে আরও স্পষ্ট ও আকর্ষণীয় করে তুলতেই ফেসলেটের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে অনেকের।

বিজ্ঞাপন

ফেসের জন্যই এই অলংকার

নামেই রয়েছে এর পরিচয়। হাতে যেমন ব্রেসলেট পরা হয়, তেমনি মুখমণ্ডলের জন্য তৈরি গয়নাকেই বলা হচ্ছে ফেসলেট। সূক্ষ্ম চেইন, মুক্তা, ক্রিস্টাল, রঙিন পাথর কিংবা ধাতব উপাদানের সমন্বয়ে তৈরি এই গয়না চিকবোন, চোখের পাশ, কপালের ধারে কিংবা চোয়ালের রেখা বরাবর বসানো হয়।

কোনো কোনো নকশা কানের দুলের সঙ্গে যুক্ত থাকে, আবার কোনোটি টিকলি বা মাথাপট্টির সঙ্গে মিলিয়ে মুখের চারপাশে তৈরি করে নান্দনিক এক ফ্রেম। প্রসাধনীর মাধ্যমে মুখের নির্দিষ্ট অংশকে হাইলাইট করার বদলে গয়নার সাহায্যে সেই সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলাই ফেসলেটের বিশেষত্ব।

বিজ্ঞাপন

নতুন নামে পুরোনো অনুপ্রেরণা

ফেসলেটকে একেবারে নতুন আবিষ্কার বলা যায় না। এর নকশা ও ভাবনার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় বহু পুরোনো অনুষঙ্গের ঐতিহ্যে। দক্ষিণ এশিয়ার টিকলি, মাথাপট্টি কিংবা টানানথের চেইন দীর্ঘদিন ধরেই মুখকে কেন্দ্র করে সাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন সংস্কৃতিতেও মুখের বিভিন্ন অংশ অলংকৃত করার ঐতিহ্য রয়েছে।

আধুনিক নকশা, মিনিমাল সৌন্দর্য ও সমকালীন উপকরণের ব্যবহারে সেই ঐতিহ্যই যেন নতুন রূপ পেয়েছে ফেসলেটে। ফলে এটি একই সঙ্গে ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত এবং আধুনিক ফ্যাশনেরও অংশ।

নকশায় যত বৈচিত্র্য

ফেসলেটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো এর নকশার বৈচিত্র্য। একদিকে যেমন রয়েছে ছোট পাথর বা মুক্তার সূক্ষ্ম নকশা, অন্যদিকে একাধিক চেইনের সমন্বয়ে তৈরি জ্যামিতিক ও ভাস্কর্যধর্মী স্টেটমেন্ট ডিজাইনও দেখা যাচ্ছে।

তামা, সোনা, রুপার প্রলেপ দেওয়া ধাতু, ক্রিস্টাল, মুক্তা কিংবা রঙিন পাথর—বিভিন্ন উপকরণে তৈরি হচ্ছে এসব গয়না। কারও পছন্দ হতে পারে মুখের এক পাশে নেমে আসা সরু চেইন, আবার কেউ বেছে নিতে পারেন চোখের পাশ থেকে কানের দিকে ছড়িয়ে থাকা তুলনামূলক জটিল নকশা। অর্থাৎ ব্যক্তিগত রুচি ও সাজের ধরন অনুযায়ী ফেসলেট বেছে নেওয়ার সুযোগ বেশ বৈচিত্র্যময়।

কেন বাড়ছে জনপ্রিয়তা?

ফেসলেটের জনপ্রিয়তার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ছবিকেন্দ্রিক ফ্যাশনেরও বড় ভূমিকা রয়েছে। ইনস্টাগ্রাম রিলস, টিকটক, ভিডিও কল কিংবা পোর্ট্রেট ফটোগ্রাফি—সবখানেই মুখ থাকে ফ্রেমের কেন্দ্রে। পোশাকের অনেকটা অংশ ক্যামেরায় ধরা না পড়লেও মুখের উপস্থিতি থাকে স্পষ্ট। ফলে মুখকে ঘিরে তৈরি গয়না সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে।

এ ছাড়া ফেসলেটের আরেকটি বড় আকর্ষণ হলো এর সংযত অথচ শক্তিশালী স্টেটমেন্ট। অনেক গয়না না পরেও শুধু একটি ফেসলেট পুরো সাজে এনে দিতে পারে আলাদা মাত্রা। তাই যাঁরা প্রচলিত অলংকারের বাইরে গিয়ে নিজস্ব স্টাইল প্রকাশ করতে চান, তাঁদের কাছেও এটি হয়ে উঠছে আকর্ষণীয়।

কীভাবে স্টাইল করবেন ফেসলেট

ফেসলেটের নকশা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মুখের গড়ন ও সামগ্রিক সাজের দিকে নজর দেওয়া জরুরি। গোলাকার মুখে নিচের দিকে নেমে আসা সূক্ষ্ম চেইনের নকশা মুখকে তুলনামূলক লম্বাটে দেখাতে পারে।

চৌকো মুখে পাতলা চেইন, মুক্তা বা ড্রেপিং নকশা মানাবে। প্রথমবার ফেসলেট পরলে ভারী স্টেটমেন্ট ডিজাইনের বদলে ছোট ও মিনিমাল নকশা দিয়ে শুরু করা ভালো। হালকা মেকআপ, ছোট কানের দুল কিংবা সংযত অন্য গয়নার সঙ্গে একটি ফেসলেটই হয়ে উঠতে পারে পুরো লুকের প্রধান আকর্ষণ। আর সাজ যদি হয় জমকালো, তখন ক্রিস্টাল বা ধাতব স্টেটমেন্ট ফেসলেট যোগ করতে পারে বাড়তি ঝলক।

শুধু কনের সাজেই নয়

ফেসলেটের আবেদন শুধু ব্রাইডাল সাজে সীমাবদ্ধ নয়। গায়েহলুদ, ককটেল পার্টি, সংগীতানুষ্ঠান, উৎসব কিংবা সন্ধ্যার নিমন্ত্রণ—বিভিন্ন আয়োজনে অনায়াসে মানিয়ে যায় এই ব্যতিক্রমী অলংকার। দিনের অনুষ্ঠানে মুক্তা বা সূক্ষ্ম নকশার ফেসলেট আনতে পারে পরিমিত সৌন্দর্য, আর সন্ধ্যার আয়োজনে ক্রিস্টাল কিংবা ধাতব স্টেটমেন্ট ডিজাইন যোগ করতে পারে বাড়তি ঝলক।

আজকাল আধুনিক কনের সাজে ফেসলেটের উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কাড়ছে। প্রচলিত ভারী গয়নার বদলে অনেক জেন-জি কনেই বেছে নিচ্ছেন মুখকে কেন্দ্র করে তৈরি এই অনুষঙ্গ। তাই অনেক ডিজাইনারের কাছে ফেসলেট এখন শুধু গয়না নয়; বরং মুখকে ক্যানভাস করে তোলা একধরনের পরিধানযোগ্য শিল্পকর্ম।

‘কোয়ায়েট লাক্সারি’র পাশাপাশি ফ্যাশনে এখন বোল্ড ও এক্সপেরিমেন্টাল ডিজাইনের জয়জয়কার চলছে ম্যাক্সিমালিজম মেনে। ফেসলেট সেই পরিবর্তনেরই প্রতিচ্ছবি। হয়তো সবার জন্য নয়, তবে যাঁরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজের স্বতন্ত্র রুচি ও ব্যক্তিত্ব তুলে ধরতে চান, তাঁদের জন্য এটি হতে পারে সময়ের অন্যতম আকর্ষণীয় ফ্যাশন অনুষঙ্গ।

মুখের সৌন্দর্যকে নতুনভাবে ফ্রেমবন্দী করতে, চেনা গয়নার বাইরে সাজে আনতে চান একটু ভিন্নতা কিংবা যোগ করতে চান সামান্য নাটকীয়তা; তাহলে ফেসলেটই হতে পারে আপনার পরবর্তী স্টাইল স্টেটমেন্ট।

ছবি: ইন্সটাগ্রাম

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ১৬: ০০
বিজ্ঞাপন