
বুনো আজ জনপ্রিয় একটি স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড হলেও শুরুতে পথচলাটা এত সহজ ছিল না। বুনোর আগে বেশ কয়েকটি অভিজ্ঞতার ঝুলি অর্জন করতে হয়েছে প্রতিষ্ঠাতা সাফা জাহাঙ্গীরকে। শুরুর দিকে ব্যবসায়িক জীবনের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সাফা বলেন, ‘২০১৬ সালে আমি তখন থার্ড ইয়ারে পড়ছি। চাকরি পাব কি পাব না, এই ভয়েই অনেকটা খেলার ছলেই সারিন’স স্টোর নামে একটা ব্যবসা শুরু করি। চায়নিজ আর স্থানীয় অ্যাকসেসরিজ ছাড়াও হারবাল বিউটি আইটেমস সেল করা হতো সেখানে। মাত্র চার হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করে ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৪০ লাখ টাকার ব্যাবসা হয়। কিন্তু কিছু অনৈতিক কর্মকাণ্ড, কিছু অস্বচ্ছতার জন্য সেই ব্যবসাটা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। ২০২৩ সালে চাকরি ছেড়ে ভাবলাম পুরোপুরি ব্যবসায় মনোযোগ দেব, তখনই আসলে পুরোনো ব্যবসাটা বন্ধ করে দিতে হয়। ভেঙে পড়ি এই ভেবে যে ২৩ বছর বয়সে যে উদ্যমে কাজ করতে পেরেছি, ত্রিশে এসে কীভাবে নতুন করে শুরু করব? কিন্তু যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকেই যায়, তখন সামনে এগোনো ছাড়া করার কী-ই বা থাকে?

‘২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে শুরু বুনোর পথচলা। আগের চেয়ে অনেক গুছিয়ে। শুরুতেই ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্স, টিন, বিনসহ সব লিগ্যাল কাগজপত্র করে নিই। চাকরির জমানো টাকা, ডিপিএস আর ফিক্সড ডিপোজিট মিলিয়ে পাঁচ লাখ টাকা হাতে নিয়ে নামি। পাঁচ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা এবং সাত বছরের ব্যবসার অভিজ্ঞতা সব ঢেলে দিই বুনোতে। এভাবেই শুরু হয় নতুন পথচলা।’
পড়াশোনা শেষ করে কোনো চাকরি করেছেন নাকি সব সময় ব্যবসা করার আগ্রহটাই ছিল?
২০১৭ সালে আমি ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি থেকে বিফার্ম শেষ করি। যদিও আমি বাংলাদেশ ফার্মেসি কাউন্সিল থেকে রেজিস্টার্ড একজন গ্রেড এ ফার্মাসিস্ট, ওষুধের চেয়ে কসমেটিকসেই আগ্রহ ছিল বেশি। ২০১৯-২০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের লিডিং বিউটি ই–কমার্স সাজগোজডটকমে সিনিয়র কনটেন্ট এক্সিকিউটিভ হিসেবে চাকরি করি। এরপরও ফ্রিল্যান্সার প্রেজেন্টার হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ২০২১-২২ সালে আমি আরেকটি স্যালন–বেজড স্টার্টআপ রমণীতে চাকরি করি মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে। ২০২২-২৩ সাল পর্যন্ত ফ্লোরমার বাংলাদেশে চাকরি করেছি কনটেন্ট লিড হিসেবে। এর পাশাপাশি ব্যবসা কিন্তু চলছিল। আমি সব সময় চেয়েছি যে ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছি, ব্যবসা করছি, সেটাকে খুব ভালো করে হাতে–কলমে শিখে নিতে। বিউটি সেক্টরে চাকরি করে নিজের অভিজ্ঞতাকে ঝালাই করে নিয়েছি পাঁচ বছর।

বুনো কাজ করছে হারবাল স্কিনকেয়ার ও হেয়ারকেয়ার প্রোডাক্ট নিয়ে। আমাদের প্রতিটি প্রোডাক্টের উপাদান ১০০ ভাগ খাঁটি, প্রাকৃতিক এবং বাংলাদেশ থেকে আহরিত। হেয়ার অয়েল, সিরাম, ফেসপ্যাক, বডি স্ক্রাব, লিপবাম, লিপ স্ক্রাব, পাউডার ফেসওয়াশের মতো মোট ২০টি হারবাল প্রোডাক্ট আমাদের লাইনে আছে। এ ছাড়া আছে কাঠের চিরুনি, বাঁশের ম্যাসাজারের মতো বিভিন্ন স্কিনকেয়ার অ্যাকসেসরিজ।
সবচেয়ে পপুলার প্রোডাক্ট হলো ট্যান গো ক্লে (রোদে পোড়া ভাব দূর করে), কোকো ডাস্ট (ত্বক মসৃণ ও উজ্জ্বল করে), পার্ল ডাস্ট (ব্রণ ও দাগ দূর করে), কোকোমেরি অয়েল এবং গ্রোথ অ্যাকটিভেটর (চুল পড়া রোধ করে)।
সাফা জাহাঙ্গীরের লেখাপড়া ফার্মেসিতে, কসমেটোলজি ও ফার্মাকোগনসি ক্লাসেই তাঁর মনে হতো, তাঁরা যেসব স্কিনকেয়ার বা বিউটি আইটেমস প্রতিদিন ব্যবহার করছেন তার মধ্যে কত অপ্রয়োজনীয় উপাদান থাকে। সিমপ্লিফায়েড কোনো স্কিনকেয়ার লাইন যদি বের করা যেত। আবার এ দেশে ফরসা হওয়ার একটা অসুস্থ প্রতিযোগিতা আছে। এটাকে কোনোভাবে যদি প্রতিহত করা যেত, মানুষকে যদি একটু জানানো যেত তাহলে তারা সাবধান হতে পারত। এই ক্ষতিকর উপাদানগুলো থেকে শেষ বয়সে ক্যানসার পর্যন্ত হতে পারে। সেটা থেকেই ইনগ্রেডিয়েন্টস নিয়ে রিসার্চ, রিসার্চ থেকে প্যাশন। প্যাশন থেকেই ব্যবসা আর প্রফেশন। সাফা নিজের ব্র্যান্ড দিয়ে মূলত এ সচেতনতাটাই গড়তে চাচ্ছেন।
সাধারণত দেশীয় পণ্যে মানুষের আগ্রহ কম থাকে, সেদিক থেকে যেমন সাড়া পাচ্ছেন
ইদানীং এই চর্চাটা থেকে মানুষ বের হতে শুরু করেছে বলেই সাফার ধারণা। এর কারণ হিসেবে তাঁর অভিমত, বিদেশি প্রোডাক্টের চড়া দাম এবং সব সময় সেটা আশানুরূপ অনুযায়ী কাজ না করা। সে তুলনায় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো মানের বীজ থেকে তেল তৈরি করছে। গ্রামের প্রকৃত সাপ্লায়ার বা কৃষকদের কাছ থেকে উপাদান আনা হচ্ছে। এতে স্থানীয় ব্যবসাকে যেমন সহায়তা করা হচ্ছে, তেমনি দামও থাকছে সাধ্যের মধ্যে।
বুনো যাত্রা শুরু করেছে সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটকে যেমন কনটেন্ট মার্কেটিং চলছে, তেমনি অফলাইনেও তিনটি ডিসপ্লে সেন্টার আছে, যেন কাস্টমাররা দেখে–শুনে–বুঝে কিনতে পারেন প্রোডাক্ট।
এ ছাড়া সাফা কোলাবোরেশন করেছেন বিভিন্ন অনলাইন কমিউনিটি ও ওয়ান্ডার উইমেনের মতো নারী কমিউনিটি এবং মাইক্রো ইনফ্লুয়েন্সারদের সঙ্গে।

গত আড়াই বছরে বুনো তিন হাজারের বেশি গ্রাহককে পণ্য দিতে পেরেছে। ৮০ শতাংশ গ্রাহক আসে সোশ্যাল মিডিয়া ও ওয়েবসাইট থেকে। বুনো অংশ নিয়েছে ঢাকা ফ্লো, ব্র্যাক তারার মেলা, সিটি আলো মেলা, যাত্রা মেলার মতো ১০টি ইভেন্টে। প্রতিটি ইভেন্টে গ্রাহকদের সাড়া পেয়ে ভীষণ অবাক হয়েছেন সাফা। গ্রাহকেরা যখন দূর থেকে দৌড়ে এসে বলেন, ‘আপনাদের প্রোডাক্ট কিন্তু দারুণ’ কিংবা ‘আপনারা আরও বেশি বেশি ইভেন্ট করবেন’—তখন যে ভালো লাগা কাজ করে, তা বলে বোঝানো যাবে না, জানালেন সাফা জাহাঙ্গীর।
সাফা বলেন, ‘আমাদের দেশে ফেসওয়াশ সাধারণত টিউবে ব্যবহার করেই আমরা অভ্যস্ত। বুনোতে পাওয়া যাচ্ছে ফেসওয়াশ পাউডার। আমাদের ১১টি ফেসপ্যাক আছে। এগুলো মূলত ড্রাইড পাউডার। মুলতানি মাটি, চন্দন, শঙ্খ, হলুদ, গোলাপের পাপড়ি—এসব উপাদানকে বেছে, রোদে শুকিয়ে, গুঁড়া করে, ছেঁকে বিভিন্ন অনুপাতে মিশিয়ে একেকটা ফর্মুলেশন হয়।’ সাফা নিজেই ফর্মুলেশন করেন। একটা ফর্মুলেশন করার পর ছয় মাস সেটার প্যাচ টেস্ট/সেলফ লাইফ টেস্ট চলে। তারপরই সেটা বাজারে আনা হয়।

বুনোর ৭০ শতাংশ গ্রাহক শিক্ষার্থী। তাঁদের রূপচর্চার শখ সবচেয়ে বেশি; কিন্তু পকেট তো সায় দেয় না! এ ছাড়া অনেকে আছেন প্রথমবারের মতো একটা ব্র্যান্ড থেকে কিছু কিনবেন, কিন্তু ঠিক বিশ্বাস করে উঠতে পারছেন না। তা ছাড়া হারবাল পণ্য স্যুট করার একটা ব্যাপার কিন্তু থাকেই। তাই বাজেটের মধ্যে প্যাচ টেস্ট করার জন্যই আসলে এই ৫০ টাকার স্যাশেগুলো বের করা। এগুলো সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে বর্তমানে।
এই মুহূর্তে ধানমন্ডির হাটকাহন, মিরপুরে সুতলি এবং হাজারীবাগে শিল্পকারখানা নামের তিনটি শোরুমে তাঁদের ডিসপ্লে কর্নার আছে। বুনোকে সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে দিতে চান সাফা। যদিও ক্যাশ অন ডেলিভারি সারা বাংলাদেশেই রয়েছে, তবু তিনি চান ঢাকায় আরও কয়েকটি ইম্পর্ট্যান্ট জায়গায় পপ ডিসপ্লে করতে। এরপর ঢাকার বাইরেও যেন তাঁদের গ্রাহকেরা হাতের কাছেই বুনোকে পান, সেই ব্যবস্থা করা। আর গ্লোবাল ব্র্যান্ডে পরিণত হওয়ার স্বপ্ন তো সবারই থাকে। কিন্তু সেটা ছুঁতে এখনো অনেক পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।
সাফা বলেন, ‘বুনোর এই মুহূর্তে কোনো সার্টিফিকেট নেই। কিন্তু খুব শিগগির আমাদের ইচ্ছা আছে বিএসটিআই সার্টিফিকেশন অথবা বিসিএসআইআরের ল্যাব টেস্টের মাধ্যমে কাস্টমারদের আস্থা অর্জনে আরও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।’