
স্বপ্নটা যখন নিজে কিছু করার এবং একই সঙ্গে দেশেই বিশ্বমানের প্রসাধনী তৈরির, তখন শুরু করতে সবাই দুইবার ভাববেন বৈকি। তবে এদিক থেকে ব্যতিক্রম ‘চারদিকে’ মার্কেটপ্লেসের প্রতিষ্ঠাতা সরওয়ার কামাল। ভাষা শেখার আগ্রহ থেকে কোরিয়ায় গিয়েছিলেন পড়াশোনা করতে। সেখান থেকে কোরিয়ায় গুগলে চাকরিসহ বেশ কয়েকটি ব্যবসায় অর্থলগ্নি করেছিলেন। কিন্তু উদ্যোক্তা হওয়ার নেশা যাঁর মধ্যে, তিনি কি কোনো নিয়মে নিজেকে বাঁধবেন? সবকিছু ছেড়ে দেশে ফিরে এসে পাকাপোক্তভাবে উদ্যোক্তা হওয়ার খাতায় নাম লেখান। বলাবাহুল্য, সেদিনের সে সিদ্ধান্ত বৃথা যায়নি। আজ চারদিকে দেশি–বিদেশি ৪০০ ব্র্যান্ডের ভরসার জায়গা, যেখানে তাদের নিজেদেরও কয়েকটি প্রসাধনী পণ্য রয়েছে। গ্রাহকেরা দ্বিধা ভুলে তাদের কাছ থেকে পণ্য কিনতে পারেন।

বাংলাদেশে ত্বকের যত্নের যে প্রথাগত নিয়ম, সেটা মেনে চলার শুরু খুব বেশি দিন হয়েছে হয়নি। কয়েক বছর আগেও পণ্যের বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে তেমন কেউ জানতেনও না। কিন্তু এখন যুগ পাল্টেছে। ছেলেমেয়ে–নির্বিশেষে সবাই বুঝেছেন ত্বকের যত্ন নেওয়ার গুরুত্ব। আর এ কারণে বিদেশি প্রসাধনী পণ্যে বাজার এখন সয়লাব। নিজেকে সুন্দর রাখার চর্চায় অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজার ভরিয়ে দিচ্ছেন নকল পণ্য দিয়ে। দেশের মানুষের যখন বিদেশপ্রীতি বেড়ে যাচ্ছে, দেশেও এর কোনো সমাধান মিলছে না, ঠিক তখনই চারদিকে মার্কেটপ্লেসের যাত্রা শুরু। তাদের আগেও বেশ কয়েকটি মার্কেটপ্লেস চালু থাকলেও অল্প সময়ে তারা আস্থা জুগিয়েছে মানুষের মনে।
এই উদ্যোগ শুরুর বিষয়ে সরওয়ার কামাল বলেন, ‘কোরিয়ায় মাস্টার্স শেষ করে প্রায় সাত বছর দুটি কোম্পানিতে চাকরি করে বাংলাদেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিই। এর মধ্যে কোরিয়ায় একটা ব্যবসা শুরু করে ব্যর্থ হই। এক বছর করার পর অনেক আর্থিক ক্ষতি নিয়ে ব্যবসাটা বন্ধ করে দিই। আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অনেক কিছু শিখেছিলাম। বাংলাদেশে ফিরে ২০১৯ সালে গার্মেন্টস এক্সপোর্ট শুরু করি। পাশাপাশি প্রসাধনীকে একটা নিরীক্ষা হিসেবে নিয়েছিলাম। এর বড় কারণ ছিল কোরিয়ান কোম্পানিগুলো প্রসাধনীতে অনেক ভালো, বিশেষ করে গবেষণা আর পণ্য উন্নয়নে। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রসাধনসামগ্রীর গ্রাহকেরা বিশ্বাস করতে চান না। এ জন্য কোরিয়া থেকে প্রসাধনী এনে আমরা মাত্র দুজন কর্মী নিয়ে ২০১৯ সালে ছোট পরিসরে রিটেইল ও হোলসেল শুরু করি।’

চারদিকের ব্যবসার মূলত দুটি ভাগ। চারদিকে মূলত একটি ই–কমার্স প্রতিষ্ঠান। এখানে দেশি–বিদেশি প্রায় ৪০০ ব্র্যান্ডের পণ্য বিক্রি হয়। পণ্য হিসাব করলে বলা যায়, পাঁচ হাজারের বেশি। অন্যটি হলো দ্য বিউটি সায়েন্স। এখানে বিশেষত তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডগুলো নিয়ে কাজ করা হয়। বর্তমানে স্কিনো, ইনসেই ও আউট অব বিউটি নামে তিনটি ব্র্যান্ড আছে। এগুলো মূলত স্কিনকেয়ার ব্র্যান্ড। আরও কয়েকটা ব্র্যান্ড নিয়ে তাদের আরঅ্যান্ডডি চলছে। এই মুহূর্তে তাদের কাছে ফেসওয়াশ, সিরাম, টোনার, শ্যাম্পু, লোশন, শাওয়ার জেলসহ অনেকগুলো পণ্য আছে।
চারদিকে দেশেই যেসব পণ্য উৎপাদন করছে, সেগুলো বর্তমানে ৬৪ জেলাতেই পাওয়া যাচ্ছে। অনলাইন ও অফলাইন দুই উপায়েই সেগুলো নেওয়া যায়। গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর জন্য এক শরও বেশি কর্মী সেলস টিমে কাজ করছেন।
পণ্য শুধু বানিয়েই গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে, এই নীতিতে বিশ্বাস করেন না সরওয়ার কামাল। তিনি চান, তাঁদের তৈরি পণ্য গ্রাহকেরা বারবার কিনবেন। বিদেশি পণ্যে আস্থা না রেখে দেশে তৈরি পণ্যে আস্থা রাখবেন। এ কারণে নানাভাবে নিজেদের তৈরি পণ্যকে পরীক্ষা করা হয়। এ বিষয়ে তিনি জানান, ‘আমরা একটি পণ্যকে বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করি। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিএসটিআই ও অন্য একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরআইসিএমেও পণ্য টেস্ট করি। এর বাইরে নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর জন্য বিশ্বের স্বনামধন্য ল্যাবগুলোয়ও আমরা টেস্টের জন্য পাঠাই। যেমন আমরা ফ্রান্সের বিখ্যাত টেস্টিং কোম্পানি স্পিন কন্ট্রোলকে (Spin Control) দিয়ে কিছু পণ্য পরীক্ষা করিয়েছি। তাইওয়ানে একটি কোম্পানি থেকে সানস্ক্রিনের এসপিএফ পরীক্ষা করিয়েছি। এই বছরে নতুন করে আমরা কোরিয়ার কোরিয়া ডার্মাটোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (Korea Dermatology Research Institute) সঙ্গে কাজ শুরু করেছি। সেখানে এরই মধ্যে শাওয়ার জেল, সিরাম ও ক্লিনজার ডার্মাটোলজি টেস্ট করিয়েছি। আরও অনেকগুলো প্রোডাক্ট সেখানে টেস্টের জন্য দেওয়া আছে। যেহেতু স্কিনকেয়ার প্রোডাক্ট অনেক সেনসিটিভ, তাই গুণগত মানের ব্যাপারে আগে আমরা শতভাগ নিশ্চিত হতে চাই।’

কোরিয়ান প্রোডাক্ট এখন ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার প্রায় সব দেশেই খুব জনপ্রিয়। তাদের ফর্মুলেশনে প্রচুর প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে এবং অনেক লাইটওয়েট ফর্মুলেশনে প্রোডাক্ট তৈরি করে; যার কারণে গ্রাহকদের মধ্যে এগুলোর চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। তবে চারদিকে কাজ শুরু করার পর শতভাগ নিশ্চিত হতে চায় মান নিয়েই। এ কারণে সরওয়ার আগে কী চান, তা নিয়ে কথা বলেন কোরিয়ান ল্যাবের সঙ্গে। এখানে দুইভাবে কাজ হয়। আরঅ্যান্ডডি টিমের কাছ থেকে প্রপোজাল আকারে একটা ফর্মুলেশন করে তাদের দেওয়া হয়। অনেক সময় কেমন পণ্য চান, সেটা তাদের জানালে তারা একটা ফর্মুলেশন দেয় এবং সেই অনুযায়ী তারা কাজ করে। এটা একটা দীর্ঘ প্রক্রিয়া। অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে একটা প্রোডাক্ট মার্কেটে আসে। এত কিছুর পর পণ্য গ্রাহকেরা পছন্দ করলেই মেলে প্রকৃত সার্থকতা। অবশ্য তারা ফর্মুলেশন হুবহু কোরিয়াকে অনুসরণ করছে, তা নয়। গ্রাহকদের চাহিদার কথাও মাথায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছে তারা।
বাংলাদেশে ই–কমার্স প্ল্যাটফর্মের ইকোসিস্টেম এখনো প্রস্তুত নয়। অনেক সীমাবদ্ধতা আছে। এটা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছেন সরওয়ার। এ জন্য তাঁরা ধীরগতির, কিন্তু সাসটেইনেবল স্ট্র্যাটেজি নিয়ে কাজ করছেন। অথেনটিক প্রোডাক্ট গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। গ্রাহক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে জন্য কোনো দ্বিধা থাকলে রিফান্ডের ব্যবস্থাও করেছেন তাঁরা। অনলাইনে কেনার প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে দেওয়া হয় ফ্রি ডেলিভারির অফার।
এসব কারণে দিন দিন চারদিকের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। সরওয়ার বিশ্বাস করেন, গ্রাহকদের সঙ্গে সেতুবন্ধ হওয়া দরকার। যেন নির্বিঘ্নে ও কোনো সংকোচ ছাড়া তাঁরা পণ্য কিনতে পারেন। এ লক্ষ্যে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁর মতে, গ্রাহকদের চাহিদার সিকি ভাগও তাঁরা আসলে পূরণ করতে পারেননি। এখনো অনেকটুকু পথ বাকি।
ত্বকের যত্নে বেসিক প্রোডাক্ট সেগুলো একটা নির্দিষ্ট বয়স থেকেই শুরু করা যায় বলে জানালেন সরওয়ার। কিন্তু যেসব স্কিনকেয়ার প্রোডাক্টে রেটিনল কিংবা সেনসিটিভ ইনগ্রেডিয়েন্টস থাকে, সেগুলো কেস টু কেস পরামর্শ নিয়ে ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয়। যদি স্কিনে বেশি সমস্যা থাকে, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে বলা হয়।

আমাদের দেশের তরুণেরা সাধারণত দেশের বাইরে গেলে আর ফিরে আসেন না। অন্যদিকে সরওয়ার চাকরি করেছেন গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানে; তারপরও দেশে ফিরে এমন চ্যালেঞ্জিং কাজ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু কেন? তিনি বলেন, ‘এখানে অনেকগুলো ফ্যাক্টর কাজ করেছে। প্রথমত, সবাই আসলে দেশে ফিরে আসে না বা আসতে চায় না, এটা ভুল ধারণা। বরং দেশে ফিরে কোনো কাজে আসতে পারে না বা সুযোগ পায় না বলে ফিরে আসতে পারে না। আমি বরাবরই আড্ডা দিতে ভালোবাসি। বিদেশে না পারতে থাকা। আমি কয়েক দফা দেশে ফেরার চিন্তা করলেও আমার স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জয়েন করার পর সিদ্ধান্ত নিই, যেকোনোভাবে দেশে ফিরতে হবে। প্রথমে এসে অনেক কিছুর সম্মুখীন হতে হবে, সেটা জানা ছিল। আসলেই অনেক সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি এবং এখনো অনেক সমস্যা দেখছি। তবে এই দেশে ব্যবসায় অনেক সম্ভাবনা আছে। এত বিশাল জনগোষ্ঠী কয়টা দেশে আছে? প্রতিটি ইন্ডাস্ট্রিতেই অনেক কাজ করার সুযোগ আছে।’
ব্যবসা বড় করার পর ব্যবসায়ীদের চিন্তা থাকে বাইরের দেশেও তাঁর তৈরি পণ্য পাওয়া যাবে কি না। সরওয়ারও এর বাইরে নন। এটা কয়েক বছর আগেও তাঁদের কাছে স্বপ্নের মতো ছিল। কসমেটিকস দেশে ইমপোর্ট করা হয়। কিন্তু তাঁদের স্বপ্ন ছিল কসমেটিকস এক্সপোর্ট করা। যেহেতু তাঁরা প্রায় চারটি দেশে তাঁদের কসমেটিকস এরই মধ্যে টেস্ট করিয়েছেন, তাই তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন, এগুলো এক্সপোর্ট করা সম্ভব। ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে, ফিলিপাইন, কম্বোডিয়া ও এশিয়ার অন্য দেশগুলোয় এক্সপোর্ট করার লক্ষ্যে এরই মধ্যে তাঁরা কাজ শুরু করেছেন।
চারদিকের পরিকল্পনা হলো এ বছরেই দক্ষিণ কোরিয়ায় শক্তিশালী টিম তৈরি করার। আরঅ্যান্ডডিকে একটি অন্য জায়গায় নিয়ে যেতে চায় তারা। ২০২৭ সাল নাগাদ অন্তত ১০টি দেশে তাদের টিম কাজ করার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পাবে খুব দ্রুত। দীর্ঘ মেয়াদে হয়তো তারা সারা পৃথিবীতে চষে বেড়াবে, এমন একটি কোম্পানি হয়ে উঠবে। অন্যদিকে কোম্পানি হিসেবে কর্মীদের জন্য বেস্ট ওয়ার্কপ্লেস করার একটা স্বপ্ন নিয়েও এগিয়ে যাচ্ছে তারা।

দেশে অনেকেই এখন বিউটি সেক্টর নিয়ে কাজ করছেন, তাঁদের মধ্যে কেউ চারদিকের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছেন কি না, এ বিষয়ে সরওয়ার কামালের অভিমত, ‘আমরা আসলে কাউকে প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছি না। যাঁরা আমাদের অগ্রজ, তাঁদের কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। আমরা আরঅ্যান্ডডি শুরু করার পর কেমিক্যাল নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। এরপর আসে প্যাকেজিং।’
সরওয়ার কামাল মনে করেন, ‘গ্লোবাল মার্কেটে প্রতিযোগিতা করার জন্য আমাদের ব্যাকএন্ড পুরোপুরি রেডি নেই। এখন পর্যন্ত যা আছে, তার সবই আমাদের পথিকৃৎ কোম্পানিগুলোর প্রচেষ্টায় হয়েছে। এখনো টেস্ট করার মতো কোনো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে নেই।’
‘এখন ইন্ডাস্ট্রি খুব দ্রুত বদলাচ্ছে। দুই বছর আগে আমরা যেসব কেমিক্যাল কিংবা প্যাকেজিং নিয়ে আলোচনা করেছি, এখন সেগুলো করা সম্ভব হচ্ছে। অন্য কোনোভাবে সমস্যা সৃষ্টি না হলে, আমাদের সামনে কোনো বাধা দেখছি না’, মন্তব্য সরওয়ার কামালের।
ছবি: চারদিকে