সাধারণ অথচ অত্যন্ত বিব্রতকর সমস্যাটি নিয়ে কেউ কথা বলতে চান না, পুরুষের তুলনায় নারীদের হয় ২-৪ গুণ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

হাল ফ্যাশন ডেস্ক

এটি একটি অত্যন্ত সাধারণ এবং বিব্রতকর সমস্যা, যা ছোট শিশু থেকে শুরু করে প্রাপ্তবয়স্ক—যেকোনো বয়সের মানুষের হতে পারে। উকুন মূলত মানুষের মাথার ত্বকে বাস করা ক্ষুদ্র পরজীবী, যা রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে এবং খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এটি কোনো মারাত্মক রোগ না হলেও, চরম অস্বস্তি ও সামাজিক লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।নিচে উকুনের সমস্যা, এর কারণ এবং জটিলতা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

এটি কোনো মারাত্মক রোগ না হলেও, চরম অস্বস্তি ও সামাজিক লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়
এটি কোনো মারাত্মক রোগ না হলেও, চরম অস্বস্তি ও সামাজিক লজ্জার কারণ হয়ে দাঁড়ায়
উকুন মূলত মানুষের মাথার ত্বকে বাস করা ক্ষুদ্র পরজীবী, যা রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে
উকুন মূলত মানুষের মাথার ত্বকে বাস করা ক্ষুদ্র পরজীবী, যা রক্ত খেয়ে বেঁচে থাকে

উকুনের সমস্যা কেন হয়?

উকুন অপরিষ্কার চুলের কারণে হয়—এই ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। উকুন পরিষ্কার চুলে বা অপরিষ্কার চুলে যেকোনো জায়গায় হতে পারে। উকুনের সংক্রমণের প্রধান কারণগুলো হলো:

সরাসরি যোগাযোগ: উকুন আছে এমন কারো মাথার সাথে নিজের মাথা লাগলে (হেড-টু-হেড কন্টাক্ট) উকুন দ্রুত ছড়ায়।

ব্যক্তিগত জিনিস শেয়ার: উকুন আক্রান্ত ব্যক্তির চিরুনি, ব্রাশ, বালিশ, টুপি, ওড়না, গামছা, তোয়ালে বা চুলের ফিতা ব্যবহার করলে।

ভেজা চুল: দীর্ঘ সময় ভেজা চুল বেঁধে রাখলে উকুন দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে।

বিজ্ঞাপন

কেন বারবার উকুন হয়?

অনেকের ক্ষেত্রেই উকুন একবার দূর করার পর আবার ফিরে আসে। এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো:

১. ডিম (Nit) থেকে যাওয়া: উকুননাশক শ্যাম্পু ব্যবহার করলেও অনেক সময় উকুনের ডিম বা নিট চুলের গোড়ায় থেকে যায়। ৭-১০ দিনের মধ্যে সেই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় এবং নতুন করে সমস্যার সৃষ্টি করে।

উকুননাশক শ্যাম্পু ব্যবহার করলেও অনেক সময় উকুনের ডিম বা নিট চুলের গোড়ায় থেকে যায়।
উকুননাশক শ্যাম্পু ব্যবহার করলেও অনেক সময় উকুনের ডিম বা নিট চুলের গোড়ায় থেকে যায়।

২. আবারো সংস্পর্শে আসা: স্কুল-কলেজ বা খেলার মাঠে উকুনযুক্ত অন্য কারো মাধ্যমে পুনরায় সংক্রমণ হতে পারে।

৩. পরিবারের অন্য সদস্য: পরিবারের কারো মাথায় উকুন থাকলে এবং চিকিৎসা না করালে তা বারবার ছড়াতে থাকে।

৪. ভুল চিকিৎসা: উকুননাশক ওষুধ বা শ্যাম্পুর প্রতি উকুন প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুললে সাধারণ চিকিৎসায় কাজ হয় না।

বিজ্ঞাপন

নারীদের বেশি হয় কেন?

পুরুষের তুলনায় নারীদের চুলে উকুনের সংক্রমণ ২ থেকে ৪ গুণ বেশি হতে দেখা যায়। এর কারণগুলো হলো:

লম্বা চুল: সাধারণত নারীদের চুল লম্বা ও ঘন হয়, যা উকুনের বাসস্থান ও বংশবৃদ্ধির জন্য আদর্শ পরিবেশ।

ঘনিষ্ঠতা: ছোট বাচ্চাদের খেলার সময় বা বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে মাথা কাছাকাছি আসার মাধ্যমে উকুন ছড়ায়।

চিরুনি শেয়ার: ওড়না, চিরুনি বা বালিশ শেয়ার করার প্রবণতা বেশি থাকে।

ওড়না, চিরুনি বা বালিশ শেয়ার করার প্রবণতা বেশি থাকে বলে নারীদের উকুন বেশি হয়
ওড়না, চিরুনি বা বালিশ শেয়ার করার প্রবণতা বেশি থাকে বলে নারীদের উকুন বেশি হয়

উকুনের জটিলতা কী কী হতে পারে?

দীর্ঘদিন উকুনের সমস্যা অবহেলা করলে বা এর সঠিক চিকিৎসা না করলে বেশ কিছু জটিলতা দেখা দিতে পারে:

তীব্র চুলকানি ও ঘা: উকুনের লালার কারণে মাথার ত্বকে প্রচণ্ড চুলকানি হয়। ক্রমাগত চুলকানোর ফলে স্ক্যাল্পে ছোট ছোট ক্ষত বা ঘা হতে পারে।

ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন: ক্ষতস্থানে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে, যার ফলে পুঁজো বা ব্যাথা হতে পারে।চুল পড়া: অতিরিক্ত চুলকানি এবং উকুনের কামড়ের কারণে চুল দুর্বল হয়ে ভেঙে যেতে পারে বা অতিরিক্ত চুল পড়তে পারে।

রক্তশূন্যতা: খুব মারাত্মক সংক্রমণের ক্ষেত্রে, প্রচুর পরিমাণে রক্ত চুষে খাওয়ার ফলে শিশুদের ক্ষেত্রে আয়রনের অভাবজনিত রক্তাল্পতা দেখা দিতে পারে।

মানসিক চাপ ও অস্বস্তি: সবসময় মাথায় সুড়সুড়ি বা চুলকানির কারণে একাগ্রতা নষ্ট হয়, অস্বস্তি বাড়ে এবং সামাজিক ক্ষেত্রে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

সতর্কতা: উকুনের উপদ্রব দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নিন। পরিবারের সবার মাথা পরীক্ষা করুন, চিরুনি ও তোয়ালে আলাদা ব্যবহার করুন এবং বিছানার চাদর গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।উকুনের ডিমকে নিট বলা হয়; যা থেকে একটি নিম্ফ বা বাচ্চা জন্মে, পরে সেটা পূর্ণ বয়স্ক উকুনে পরিণত হয়।

কী কী ঘরোয়া উপায়ে উকুন নিধন করা যায়?

উকুনের সমস্যা দূর করতে রাসায়নিক শ্যাম্পুর পাশাপাশি বেশ কিছু কার্যকরী ঘরোয়া পদ্ধতি রয়েছে। এগুলো যেমন সাশ্রয়ী, তেমনি চুলের জন্যও তুলনামূলক নিরাপদ। নিচে উকুনের বংশ ধ্বংস করার সেরা কিছু ঘরোয়া উপায় দেওয়া হলো:

১. নিম পাতা ও নিম তেল

নিম একটি প্রাকৃতিক অ্যান্টি-সেপটিক। নিমের তীব্র গন্ধ এবং তিতকুটে স্বাদ উকুন ও নিট (ডিম) মারতে সাহায্য করে।ব্যবহার: এক মুঠো নিম পাতা ফুটিয়ে সেই পানি দিয়ে নিয়মিত চুল ধুতে পারেন। অথবা নিম তেল মাথার তালুতে ভালো করে মেখে ১ ঘণ্টা রেখে শ্যাম্পু করে ফেলুন।

২. টি-ট্রি অয়েল (Tea Tree Oil)

এই তেলে প্রাকৃতিক অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল গুণ থাকে যা উকুনের যম।ব্যবহার: আপনার ব্যবহৃত সাধারণ শ্যাম্পুর সাথে কয়েক ফোঁটা টি-ট্রি অয়েল মিশিয়ে চুল ধুয়ে নিন। অথবা নারকেল তেলের সাথে মিশিয়ে ব্যবহার করুন।

৩. ভিনেগার (বিশেষ করে অ্যাপেল সাইডার ভিনেগার)

ভিনেগারের এসিটিক অ্যাসিড উকুনের ডিমগুলোকে চুলের সাথে লেগে থাকতে দেয় না, যার ফলে ডিমগুলো আলগা হয়ে ঝরে পড়ে।ব্যবহার: সমান পরিমাণ ভিনেগার ও পানি মিশিয়ে চুলে এবং মাথার ত্বকে মাখুন। ৩০ মিনিট পর চিকন চিরুনি (উকুনের চিরুনি) দিয়ে ভালো করে আঁচড়ান।

৪. নারকেল তেল ও কর্পূর

নারকেল তেল উকুনকে শ্বাসরোধ করে মারতে সাহায্য করে আর কর্পূর উকুন তাড়াতে দারুণ কার্যকর।ব্যবহার: ২ টেবিল চামচ নারকেল তেলের সাথে আধা চা চামচ কর্পূর গুঁড়া মেশান। রাতে ঘুমানোর আগে এটি চুলে মেখে পরদিন সকালে শ্যাম্পু করুন।

৫. রসুন ও লেবুর রস

রসুনের কড়া গন্ধ উকুন সহ্য করতে পারে না।ব্যবহার: ৮-১০ কোয়া রসুন বেটে নিয়ে তাতে লেবুর রস মেশান। এই পেস্ট মাথার ত্বকে লাগিয়ে ৩০ মিনিট রাখুন। এরপর কুসুম গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

৬. অলিভ অয়েল

অলিভ অয়েল উকুনের শ্বাসকষ্ট ঘটায়, ফলে উকুন মারা যায়।ব্যবহার: পুরো চুলে পর্যাপ্ত অলিভ অয়েল মেখে সারারাত শাওয়ার ক্যাপ দিয়ে মাথা ঢেকে রাখুন। সকালে চিকন চিরুনি দিয়ে মরা উকুনগুলো বের করে শ্যাম্পু করে নিন।

জরুরি কিছু টিপস

যেকোনো ঘরোয়া পদ্ধতি ব্যবহারের পর অবশ্যই চিকন দাঁতের চিরুনি দিয়ে চুল আঁচড়ে মরা উকুন ও ডিম পরিষ্কার করুন।এই পদ্ধতিগুলো সপ্তাহে অন্তত ২-৩ বার ব্যবহার করা উচিত কারণ একবারে সব ডিম মরে না।চিকিৎসা চলাকালীন চিরুনি, বালিশের কভার এবং তোয়ালে গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

সূত্র: হেলথলাইন, আয়ূরবেদা ডট কম

ছবি: উইকিপিডিয়া, ইন্সটাগ্রাম ও এআই

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন