গরমে ভাইরাল ‘প্রাকৃতিক ডিওডোরেন্ট’: দাদী-নানীর আমলের এই উপাদানে কেন ঝুঁকছে নতুন প্রজন্ম
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বিউটি ও ওয়েলনেস জগতে নতুন ট্রেন্ডের অভাব নেই। তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে এমন একটি উপাদান, যা আসলে নতুন কিছু নয়। টিকটক, ইনস্টাগ্রাম ও বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে ব্যবহারকারীরা ডিওডোরেন্টের বিকল্প হিসেবে ফিটকিরির কার্যকারিতা নিয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করছেন। কেউ বলছেন, এটি সারাদিন শরীরের দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে; কেউ আবার দাবি করছেন, বাজারের অনেক ডিওডোরেন্টের তুলনায় এটি বেশি স্বস্তিদায়ক। সামাজিক মাধ্যমে এই আলোচনা নতুন প্রজন্মের অনেকের মধ্যেই পুরোনো এই ঘরোয়া উপাদান সম্পর্কে নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।

কেন আবার আলোচনায় ফিটকিরি?

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘ন্যাচারাল বিউটি’, ‘ক্লিন বিউটি’ এবং ‘মিনিমাল স্কিনকেয়ার’-এর মতো ধারণা জনপ্রিয় হয়েছে। অনেকেই দৈনন্দিন ব্যবহারের পণ্যে রাসায়নিক উপাদান কমানোর চেষ্টা করছেন। সেই ধারাবাহিকতায় ডিওডোরেন্টের বিকল্প খুঁজতে গিয়ে অনেকের নজর পড়েছে ফিটকিরির দিকে।

সামাজিক মাধ্যমে ফিটকিরি নিয়ে হওয়া আলোচনাগুলোর একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে এর সরলতা। কোনো সুগন্ধি নেই, জটিল উপাদানের তালিকা নেই, আবার দামও তুলনামূলকভাবে খুব কম। ফলে অনেকে এটিকে ‘ওল্ড-স্কুল বিউটি হ্যাক’ বা পুরোনো দিনের কার্যকর পরিচর্যা উপকরণ হিসেবে তুলে ধরছেন।

ফিটকিরি আসলে কী?

ফিটকিরি বা অ্যালাম (Alum) হলো একটি প্রাকৃতিক খনিজ লবণ। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শুধু ব্যক্তিগত পরিচর্যাতেই নয়, পানি পরিশোধন, কাপড় রং করা এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে এর ব্যবহার ছিল।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, প্রাচীন মিসর, গ্রিস ও রোমান সভ্যতায় অ্যালাম পরিচিত একটি উপাদান ছিল। দক্ষিণ এশিয়াতেও বহু প্রজন্ম ধরে এটি ঘরোয়া চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যবহারের অংশ হিসেবে স্থান পেয়েছে। একসময় প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ফিটকিরি রাখা হতো। শেভ করার পর ত্বকে লাগানো, ছোটখাটো কাটা-ছেঁড়া সামলানো, গার্গল করা কিংবা শরীরের দুর্গন্ধ কমানোর জন্য এটি ব্যবহৃত হতো।

দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে কীভাবে কাজ করে?

ঘাম নিজে সাধারণত দুর্গন্ধযুক্ত নয়। ত্বকে থাকা ব্যাকটেরিয়া ঘামের সঙ্গে বিক্রিয়া করে যে যৌগ তৈরি করে, সেখান থেকেই দুর্গন্ধের সৃষ্টি হয়।

ত্বক বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিটকিরির অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল বৈশিষ্ট্য রয়েছে। অর্থাৎ এটি দুর্গন্ধ সৃষ্টিকারী কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এ কারণেই অনেক মানুষ ফিটকিরি ব্যবহারের পর শরীরের দুর্গন্ধ কম অনুভব করেন।
তবে এটি অ্যান্টিপার্সপির্যান্টের মতো ঘাম বন্ধ করে না। বরং ঘাম হওয়ার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বজায় রেখেই দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।

বিজ্ঞাপন

গবেষণা কী বলছে?

পটাশিয়াম অ্যালামভিত্তিক ডিওডোরেন্ট নিয়ে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় এর জীবাণুরোধী বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এটি ত্বকের ওপর একটি সূক্ষ্ম স্তর তৈরি করতে পারে, যা কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেন, ফিটকিরির কার্যকারিতা ব্যক্তি ও পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফল নাও দিতে পারে।

ব্যবহারের আগে যা জানা জরুরি

চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, বেশিরভাগ মানুষের জন্য ফিটকিরি নিরাপদ হলেও সংবেদনশীল ত্বকে কিছু ক্ষেত্রে জ্বালা বা শুষ্কতা দেখা দিতে পারে। তাই প্রথমবার ব্যবহারের আগে ত্বকের ছোট একটি অংশে পরীক্ষা করে নেওয়া ভালো।
এ ছাড়া ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার বিকল্প হিসেবে ফিটকিরিকে দেখা উচিত নয়। নিয়মিত গোসল, পরিষ্কার পোশাক এবং সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়।

পুরোনো সমাধানের নতুন জনপ্রিয়তা

সামাজিক মাধ্যম প্রায়ই পুরোনো অনেক ধারণাকে নতুনভাবে সামনে নিয়ে আসে। ফিটকিরির ক্ষেত্রেও যেন সেটাই ঘটছে। বহু বছর ধরে ঘরোয়া ব্যবহারে পরিচিত এই উপাদান এখন নতুন প্রজন্মের কাছে ‘প্রাকৃতিক ডিওডোরেন্ট’ হিসেবে আলোচনায়।
সবাইয়ের জন্য এটি সমান কার্যকর হবে এমন নিশ্চয়তা নেই। তবু আধুনিক বিউটি পণ্যের ভিড়ে ফিটকিরির নতুন করে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা দেখিয়ে দেয়, কখনও কখনও বহু পুরোনো সমাধানও আবার নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠতে পারে।

সূত্র: ভোগ ইন্ডিয়া

ছবি: এআই

বিজ্ঞাপন
প্রকাশ: ৩১ মে ২০২৬, ১৩: ০০
বিজ্ঞাপন