
বাটানা হেয়ার অয়েল ব্যবহারে চুল পড়া কমানো থেকে শুরু করে নতুন চুল গজানো, এমনকি পাকা চুল কালো করার দাবিও ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কিন্তু এসব দাবি কতটা সত্যি?

বাটানা অয়েল তৈরি হয় আমেরিকান অয়েল পাম বা Elaeis oleifera গাছের ফল থেকে। মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে হন্ডুরাসে এই পাম পাওয়া যায়। দেশটির আদিবাসী মিসকিতো সম্প্রদায়ের মধ্যে চুল ও ত্বকের যত্নে এই তেলের ঐতিহ্যগত ব্যবহার রয়েছে।
খাঁটি বাটানা অয়েল সাধারণত বেশ ঘন হয়। এর রং গাঢ় বাদামি এবং মাটির মতো একটা স্বাভাবিক ঘ্রাণ পাওয়া যায়। তবে এটি আফ্রিকান পাম অয়েলের মতো নয়, দুটিই পামজাতীয় উদ্ভিদ থেকে এলেও উৎস আলাদা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাটানা অয়েলকে এমন একটি উপাদান হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা নাকি শুষ্ক ও ক্ষতিগ্রস্ত চুলকে দ্রুত ভালো করে, চুল পড়া কমায় এবং নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যাদের চুল খুব শুষ্ক, কোঁকড়ানো, কার্লি কিংবা কেমিক্যাল ট্রিটমেন্ট করা, তাদের কাছে এই তেলের ঘন ও সমৃদ্ধ টেক্সচার বেশ আকর্ষণীয়। তবে এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, চুলকে দেখতে স্বাস্থ্যকর মনে হওয়া আর মাথার ত্বক থেকে নতুন চুল গজানো এক বিষয় নয়।

তেলের মূল কাজ হলো চুলের ওপর একটি মসৃণ স্তর তৈরি করা। ফলে চুলকে বাইরে থেকে সুরক্ষা দিতে পরে, যেমন যে কোন ধরনের ঘর্ষণ থেকে। এবং রুক্ষ ও শুষ্ক চুল কিছুটা নরম ও মসৃণ অনুভূত হয়।
তাই বাটানা অয়েল ব্যবহারে–
চুল নরম হতে পারে,
চুলে চকচকে ভাব আসতে পারে,
জট ছাড়ানো সহজ হতে পারে,
চিরুনি করার সময় ঘর্ষণ কমতে পারে,
শুষ্কতার কারণে চুল ভেঙে যাওয়া কিছুটা কমতে পারে,
এবং ফ্রিজি বা উসকোখুসকো চুল সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে।
অর্থাৎ, এর সবচেয়ে বাস্তবসম্মত ভূমিকা হলো কন্ডিশনিং। চুল কম ভাঙলে স্বাভাবিকভাবেই চুলের দৈর্ঘ্য ধরে রাখা সহজ হয়। কিন্তু সেটিকে নতুন চুল গজানোর প্রমাণ হিসেবে ধরা যাবে না।

এখানেই সবচেয়ে বেশি সতর্ক হওয়া দরকার। অনেকেই দাবি করছেন বাটানা অয়েল চুলের ফলিকল সক্রিয় করে নতুন চুল গজাতে সাহায্য করে। কিন্তু এর কোন শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বংশগত টাক, অ্যালোপেশিয়া অ্যারিয়াটা, থাইরয়েডের সমস্যা, পুষ্টির ঘাটতি বা হরমোনের পরিবর্তনের কারণে চুল পড়ার চিকিৎসা হিসেবেও এই তেল ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয় না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এর জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে মূলত ঐতিহ্যগত ব্যবহার ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। বাটানা অয়েলের উপকারিতা ও এর চুল গজানোর ক্ষমতা নিয়ে কোন প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা হয়নি। তাই মাথার তালুতে চুল পাতলা হয়ে যাওয়া, সিঁথি চওড়া হয়ে যাওয়া, হেয়ারলাইন পিছিয়ে যাওয়া বা দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত চুল পড়ার সমস্যা থাকলে শুধু তেলের ওপর নির্ভর না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাটানা অয়েল নিয়ে আরেকটি জনপ্রিয় দাবি হলো, এটি নাকি পাকা চুলকে আবার প্রাকৃতিক রঙে ফিরিয়ে আনতে পারে। কিন্তু এই দাবিরও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
চুলের রং তৈরি হয় ফলিকলের পিগমেন্ট বা মেলানিনের মাধ্যমে। বয়স, জেনেটিক কারণসহ বিভিন্ন কারণে যখন এই পিগমেন্ট তৈরি কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়, তখন চুল সাদা বা ধূসর হতে শুরু করে। শুধু চুলে তেল লাগিয়ে এই প্রক্রিয়া আবার সক্রিয় করা যায় এমন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
তবে তেল চুলকে চকচকে করে তুলতে পারে। ফলে নিস্তেজ চুল সাময়িকভাবে কিছুটা গাঢ় ও স্বাস্থ্যকর দেখাতে পারে। কিন্তু সেটিকে পাকা চুল কালো হয়ে যাওয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।
বাটানা অয়েল বেশ ঘন হওয়ায় প্রথমবার খুব অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করাই ভালো। কয়েক ফোঁটা তেল হাতের তালুতে নিয়ে হালকা গরম করে চুলের মাঝামাঝি অংশ থেকে ডগা পর্যন্ত লাগানো যেতে পারে। এরপর ২০ থেকে ৩০ মিনিট রেখে শ্যাম্পু করে ধুয়ে ফেলুন।
খুব শুষ্ক বা টেক্সচারড চুল হলে ডগায় অল্প পরিমাণ ফিনিশিং অয়েল হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে বেশি ব্যবহার করলে চুল চিটচিটে ও ভারী হয়ে যেতে পারে।
মাথার ত্বকে ব্যবহার করলে পরিমাণ কম রাখা জরুরি। অতিরিক্ত তেল ভালোভাবে পরিষ্কার না হলে বিল্ডআপ তৈরি হতে পারে, বিশেষ করে যাদের স্ক্যাল্প তৈলাক্ত।

‘ন্যাচারাল’ মানেই যে সবার জন্য নিরাপদ, তা নয়। বাটানা অয়েল বা এতে থাকা সুগন্ধি ও অন্যান্য উপাদান কারও কারও ত্বকে জ্বালা, চুলকানি, লালচে ভাব বা অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। তাই প্রথমবার পুরো মাথায় ব্যবহার না করে ছোট একটি অংশে প্যাচ টেস্ট করে নেওয়া ভালো। জ্বালাপোড়া, চুলকানি, ফোলা বা র্যাশ দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করুন।
যাদের খুশকি, সেবোরিক ডার্মাটাইটিস বা স্ক্যাল্পে প্রদাহ রয়েছে, তাদেরও ব্যবহারের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আর একটি বিষয় খুব গুরুত্বপূর্ণ ‘বাটানা অয়েল’ লেখা থাকলেই যে সেটি খাঁটি বাটানা অয়েল, তা নয়। বাজারের অনেক পণ্যে সুগন্ধি, এসেনশিয়াল অয়েল, প্রিজারভেটিভ বা অন্য ক্যারিয়ার অয়েলের মিশ্রণ থাকতে পারে। তাই কেনার আগে ইনগ্রেডিয়েন্ট লেবেল দেখে নেওয়া জরুরি।
বাটানা অয়েলকে চুলের জন্য একটি সমৃদ্ধ কন্ডিশনিং অয়েল হিসেবে দেখা যেতে পারে। বিশেষ করে শুষ্ক, রুক্ষ, কার্লি বা কেমিক্যাল ট্রিটেড চুলে এটি নরমভাব, উজ্জ্বলতা ও ম্যানেজেবিলিটি বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ‘চুল গজাবে’, ‘টাক ভরাট করবে’ বা ‘পাকা চুল কালো করবে’ এমন দাবিকে এখনই সত্যি ধরে নেওয়ার মতো যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
ছবি: এআই