
একসময় যে ত্বক নিয়ে খুব একটা ভাবতে হতো না, হঠাৎ সেটিই যেন অচেনা হয়ে যায়। ময়েশ্চারাইজার লাগিয়েও শুষ্কতা কমে না, প্রিয় স্কিনকেয়ার ব্যবহার করলেও জ্বালাপোড়া হয়, এমনকি বহু বছর পর আবার ব্রণ দেখা দেয়। অনেক নারীই এসব পরিবর্তনকে বয়স, মানসিক চাপ বা আবহাওয়ার প্রভাব ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ এর পেছনে থাকতে পারে ‘পেরিমেনোপজ’।

পেরিমেনোপজ হলো মেনোপজের আগের সময়, যখন শরীরে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন হরমোনের ওঠানামা শুরু হয়। এই সময় সাধারণত মেনোপজের দুই থেকে দশ বছর আগে শুরু হতে পারে। অনেকের ক্ষেত্রে ত্রিশের শেষ দিক থেকেই এই পরিবর্তন শুরু হলেও বিষয়টি সম্পর্কে সচেতনতা কম থাকায় সহজে ধরা পড়ে না।

হরমোনের এই পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে দ্রুত দেখা যায় ত্বকে। এক সপ্তাহ ত্বক অতিরিক্ত তৈলাক্ত, আবার পরের সপ্তাহেই খুব শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। কারণ, ইস্ট্রোজেন কমে গেলে ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা, কোলাজেন এবং সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল হতে শুরু করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কল্পনা নয় বা শুধু বয়সের ছাপও নয়। শরীরের ভেতরের পরিবর্তনের প্রতিফলনই দেখা যায় ত্বকে।

অতিরিক্ত শুষ্কতা
এটি সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ। ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করেও ত্বক টানটান ও শুষ্ক লাগে। কারণ, এই সময়ে ত্বকে স্বাভাবিকভাবে হায়ালুরোনিক অ্যাসিড ও সিরামাইডের উৎপাদন কমে যায়।
হঠাৎ সংবেদনশীল হয়ে যাওয়া
বছরের পর বছর ব্যবহার করা প্রসাধনীও হঠাৎ জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তির কারণ হতে পারে। অনেকের রোদে বের হলেই মুখ লাল হয়ে যায়।
প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে ব্রণ
যাদের বহু বছর ব্রণের সমস্যা ছিল না, তাদেরও চোয়াল, থুতনি বা গলার আশপাশে ব্যথাযুক্ত ব্রণ দেখা দিতে পারে। এটি মূলত হরমোনের পরিবর্তনের ফল।
অস্বাভাবিক চুলকানি
কখনো কখনো ত্বকে তীব্র চুলকানি বা পোকা হাঁটার মতো অনুভূতিও হতে পারে, যা অনেকের জন্য অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে।

না। একজিমা, থাইরয়েডের সমস্যা বা অন্য কিছু রোগেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই শুধু নিজের অনুমানের ওপর ভরসা না করে ত্বক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো। প্রয়োজন হলে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শও নিতে হতে পারে।

এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী রাখা।
সকালে ব্যবহার করতে পারেন–
* মৃদু ফেসওয়াশ
* ভিটামিন সি সমৃদ্ধ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সিরাম
* ভালো ময়েশ্চারাইজার
* চোখের চারপাশের জন্য আই ক্রিম
* অবশ্যই ব্রড-স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন
রাতে ব্যবহার করতে পারেন–
* ভালোভাবে মুখ পরিষ্কার করুন
* সপ্তাহে এক বা দুই দিন হালকা এক্সফোলিয়েশন করুন
* প্রয়োজন অনুযায়ী মৃদু রেটিনয়েড ব্যবহার করতে পারেন
* শেষে সমৃদ্ধ ময়েশ্চারাইজার লাগান
ত্বকের জন্য উপকারী উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে সিরামাইড, হায়ালুরোনিক অ্যাসিড, পেপটাইড, গ্লিসারিন, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও রেটিনয়েড।

* একসঙ্গে অনেক সক্রিয় উপাদান ব্যবহার করা
* অতিরিক্ত স্ক্রাব বা এক্সফোলিয়েশন
* বারবার স্কিনকেয়ার পণ্য পরিবর্তন করা
* সামাজিক মাধ্যমে দেখে নতুন ট্রেন্ড অনুসরণ করে ত্বকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালানো

হরমোনের পরিবর্তন সব নারীর জীবনেই আসে। তবে সবার ত্বকে এর প্রভাব একরকম হয় না। বংশগত বৈশিষ্ট্য, সূর্যের ক্ষতি, ধূমপান, মানসিক চাপ, ঘুমের অভাব ও জীবনযাপন। সবকিছুই এই পরিবর্তনের মাত্রা বাড়াতে বা কমাতে পারে।
পেরিমেনোপজ কোনো রোগ নয়, জীবনের একটি স্বাভাবিক অধ্যায়। তাই ত্বকের পরিবর্তন দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং সময়মতো কারণ বুঝে সঠিক যত্ন নিলে ত্বক এই পরিবর্তনের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নিতে পারে।
মনে রাখবেন, আপনার ত্বক নষ্ট হয়ে যাচ্ছে না। শুধু নতুন এক হরমোনগত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। আর সেই সময়টাতে প্রয়োজন সচেতনতা, ধৈর্য এবং সঠিক পরিচর্যা।
ছবি: এআই ও ইনস্টাগ্রাম