
বায়ুদূষণের প্রভাবে বাড়তে পারে ব্রণ, ত্বকের রুক্ষতা, চুলকানি, অস্বস্তি এবং চুলের ভেঙে যাওয়ার সমস্যা। দীর্ঘদিন দূষিত পরিবেশে থাকলে ত্বকে অকালবার্ধক্যের লক্ষণও দেখা দিতে পারে। তাই দূষণের দিনে ত্বক ও চুলের যত্নে একটু বাড়তি সতর্কতা জরুরি।

বাতাসে থাকা সূক্ষ্ম ধূলিকণা, ধোঁয়া ও বিভিন্ন দূষক ত্বকের ওপর জমে যেতে পারে। এগুলো ত্বকের ছিদ্রে জমে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে এবং কারও কারও ক্ষেত্রে ব্রণ বা র্যাশের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। দূষণের কারণে ত্বক হয়ে উঠতে পারে নিস্তেজ, রুক্ষ ও শুষ্ক।
দূষিত বাতাসে থাকা কিছু উপাদান শরীরে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করতে পারে। এর প্রভাবে ত্বকের কোলাজেন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কোলাজেন ত্বকের দৃঢ়তা ও নমনীয়তা ধরে রাখতে সাহায্য করে। দীর্ঘদিন দূষণের সংস্পর্শে থাকলে বলিরেখা, সূক্ষ্ম রেখা ও অকালবার্ধক্যের লক্ষণ আরও স্পষ্ট হতে পারে।
এ ছাড়া দূষণ ত্বকের প্রাকৃতিক সুরক্ষাব্যবস্থা বা স্কিন ব্যারিয়ারের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে ত্বকে লালচে ভাব, চুলকানি, জ্বালাপোড়া এবং অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা দেখা দিতে পারে। যাঁদের একজিমা, সোরিয়াসিস বা অ্যালার্জিপ্রবণ ত্বক রয়েছে, তাঁদের সমস্যা আরও বেড়ে যেতে পারে।
চুল ও মাথার ত্বকও দূষণের প্রভাব থেকে পুরোপুরি মুক্ত নয়। ধূলিকণা ও দূষক মাথার ত্বকে জমে অস্বস্তি, চুলকানি ও প্রদাহ বাড়াতে পারে। চুলের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমে গেলে তা রুক্ষ ও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়তে পারে। চুল জট পাকানো, ভেঙে যাওয়া এবং চুল পড়ার সমস্যাও বেড়ে যেতে পারে। তবে চুল পড়ার পেছনে পুষ্টির ঘাটতি, হরমোনের পরিবর্তন, মানসিক চাপ ও নানা শারীরিক কারণ থাকতে পারে। তাই সব ক্ষেত্রে একে শুধু বায়ুদূষণের ফল ভাবা ঠিক নয়।

ত্বকে দূষণের প্রভাব পড়লে প্রথমেই কিছু পরিবর্তন চোখে পড়ে। যেমন–
- মুখ ধোয়ার পর ত্বক টানটান বা অস্বস্তিকর লাগা।
- ত্বক আগের তুলনায় নিস্তেজ, রুক্ষ ও শুষ্ক হয়ে যাওয়া।
- লালচে ভাব, চুলকানি বা জ্বালাপোড়া।
- হঠাৎ ব্রণ বেড়ে যাওয়া কিংবা ত্বকের ছিদ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া।
- ত্বকের রং অসমান হয়ে যাওয়া বা কালচে দাগ দেখা দেওয়া।
- আগের তুলনায় ত্বক বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়া।

অন্যদিকে চুল ও মাথার ত্বকের ক্ষেত্রে–
- চুল অতিরিক্ত শুষ্ক, রুক্ষ ও ফ্রিজি হয়ে যাওয়া।
- মাথার ত্বকে চুলকানি, জ্বালাপোড়া বা খুশকির সমস্যা।
- চুলের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত জট পাকানো।
- চুল ভেঙে যাওয়া বা আগা ফেটে যাওয়া।
- চুলের স্বাভাবিক উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া।
- চুল পড়া বেড়ে যাওয়া বা চুলের ঘনত্ব কমে আসা।
তবে এসব লক্ষণের পেছনে দূষণ ছাড়াও অন্য কারণ থাকতে পারে। অতিরিক্ত ফেসওয়াশ ব্যবহার, ঘন ঘন এক্সফোলিয়েশন, কড়া প্রসাধনী কিংবা ত্বকের উপযোগী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার না করলেও স্কিন ব্যারিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বাতাসের মান খারাপ থাকলে অপ্রয়োজনে বাইরে বের হওয়া এড়িয়ে চলুন। বিশেষ করে দিনের যেসব সময়ে দূষণের মাত্রা বেশি থাকে, তখন দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকা থেকে বিরত থাকুন। ঘরের জানালা খোলা রাখার ক্ষেত্রেও বাইরের বাতাসের মান বিবেচনা করুন।

ত্বকের সুস্থতা বজায় রাখতে খাবারের তালিকায় রাখুন ভিটামিন সি ও ই-সমৃদ্ধ ফলমূল, শাকসবজি ও বাদাম। এগুলো শরীরের স্বাভাবিক অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সহায়তা করে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ভিটামিন বা অন্য কোনো সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়।
ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতে পর্যাপ্ত পানি পান করা জরুরি। পাশাপাশি ত্বকের ধরন অনুযায়ী ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। শুষ্ক ত্বকের জন্য একটু ঘন ময়েশ্চারাইজার এবং তৈলাক্ত ত্বকের জন্য হালকা, নন-কমেডোজেনিক ফর্মুলা বেছে নিতে পারেন।
দিন শেষে মুখে জমে থাকা ধুলাবালি, দূষণের কণা, ঘাম, সানস্ক্রিন ও মেকআপ পরিষ্কার করা জরুরি। এ জন্য ত্বকের ধরন অনুযায়ী মৃদু ক্লেনজার ব্যবহার করুন। অতিরিক্ত ঘষাঘষি বা কড়া স্ক্রাব ব্যবহার করবেন না। এতে ত্বকের স্বাভাবিক সুরক্ষাপর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

বায়ুদূষণের দিনেও বাইরে গেলে ব্রড-স্পেকট্রাম SPF ৩০ বা তার বেশি মানের সানস্ক্রিন ব্যবহার করুন। এটি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির ক্ষতি থেকে ত্বককে সুরক্ষা দেয়। বাইরে দীর্ঘক্ষণ থাকলে পণ্যের নির্দেশনা অনুযায়ী পুনরায় সানস্ক্রিন লাগান। মনে রাখবেন, সানস্ক্রিন দূষণ থেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষা দেয় না।
রাতে মুখ পরিষ্কারের পর ত্বকে ময়েশ্চারাইজার লাগান। সিরামাইডযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ত্বকের সুরক্ষাপর্দা ভালো রাখতে এবং আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে। ত্বকে জ্বালাপোড়া বা অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা থাকলে নতুন কোনো সক্রিয় উপাদান ব্যবহারের আগে সতর্ক থাকুন।

ধুলাবালিপূর্ণ পরিবেশে দীর্ঘক্ষণ থাকার পর মাথার ত্বক ও চুল পরিষ্কার করা প্রয়োজন। মৃদু শ্যাম্পু দিয়ে চুল ধুয়ে নিন। তবে প্রতিদিন শ্যাম্পু করার প্রয়োজন নেই। চুলের ধরন, মাথার ত্বকের অবস্থা ও দূষণের সংস্পর্শের মাত্রা অনুযায়ী চুল পরিষ্কারের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
বাইরে বের হওয়ার সময় পরিষ্কার ও আরামদায়ক ক্যাপ, হ্যাট বা স্কার্ফ ব্যবহার করতে পারেন। এতে চুলে সরাসরি ধুলাবালি জমা কিছুটা কমবে। দূষণের মাত্রা বেশি থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী ভালোভাবে ফিট হয় এমন উপযুক্ত মাস্ক ব্যবহার করুন। মাস্ক যেন নাক ও মুখ ঠিকভাবে ঢেকে রাখে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।

শ্যাম্পু করার পর চুলের মাঝামাঝি অংশ থেকে আগা পর্যন্ত কন্ডিশনার লাগান। এতে চুলের জট কমে, চুল নরম থাকে এবং আঁচড়ানোর সময় ঘর্ষণজনিত ভাঙন কমতে পারে। কন্ডিশনার সাধারণত মাথার ত্বকে না লাগানোই ভালো, বিশেষ করে তৈলাক্ত স্ক্যাল্প হলে।
মাথার ত্বকে চুলকানি বা জ্বালাপোড়া থাকলে অতিরিক্ত সুগন্ধিযুক্ত ও কড়া উপাদানের হেয়ারকেয়ার পণ্য এড়িয়ে চলুন। প্রয়োজনে ফ্র্যাগরেন্স-ফ্রি শ্যাম্পু ও কন্ডিশনার বেছে নিন। নতুন পণ্য ব্যবহারের পর অস্বস্তি বাড়লে সেটি ব্যবহার বন্ধ করুন।

ত্বক ও চুলের যত্ন নিতে গিয়ে অনেকেই অজান্তে এমন কিছু অভ্যাস করেন, যা উল্টো ক্ষতি বাড়াতে পারে। যেমন, বারবার মুখ ধোয়া, জোরে স্ক্রাব করা, অতিরিক্ত এক্সফোলিয়েশন কিংবা একসঙ্গে অনেক ধরনের অ্যাকটিভ উপাদান ব্যবহার করা। খুব গরম পানি দিয়ে মুখ ও চুল ধোয়ার অভ্যাসও এড়িয়ে চলুন।
ত্বক তৈলাক্ত হলেও ময়েশ্চারাইজার বাদ দেওয়া ঠিক নয়। একইভাবে সানস্ক্রিন ব্যবহার না করা, মেকআপ ও সানস্ক্রিন না তুলে ঘুমিয়ে পড়া কিংবা ত্বকের ধরন না বুঝে ভাইরাল স্কিনকেয়ার ট্রেন্ড অনুসরণ করাও ক্ষতিকর হতে পারে।
চুলের ক্ষেত্রে দীর্ঘক্ষণ দূষিত পরিবেশে থাকার পর মাথার ত্বক অপরিষ্কার রাখা, বাইরে যাওয়ার আগে অতিরিক্ত ভারী হেয়ার অয়েল লাগানো কিংবা চুল না ঢেকে বাইরে বের হওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন। ঘন ঘন হিট স্টাইলিং এবং কড়া শ্যাম্পু ব্যবহার করলেও চুল আরও শুষ্ক ও ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহার করতে ভুলবেন না।
বায়ুদূষণ থেকে ত্বক ও চুলকে পুরোপুরি রক্ষা করা সম্ভব না হলেও কিছু নিয়ম মেনে চললে এর প্রভাব কমানো যায়। সবচেয়ে জরুরি হলো ত্বকের সুরক্ষাপর্দা ভালো রাখা, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা এবং চুলের যত্নে মৃদু পণ্য ব্যবহার করা। ত্বকে দীর্ঘদিন জ্বালাপোড়া, ব্রণ বেড়ে যাওয়া কিংবা অস্বাভাবিকভাবে চুল পড়তে থাকলে নিজে নিজে চিকিৎসা না করে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।