শীতে গোসল করতে এই এক ভুলের কারণেই কি আপনার চুল পাতলা হয়ে যাচ্ছে
শেয়ার করুন
ফলো করুন

শীতে গোসল করতে গড়িমসি হয়, গরম পানি থাকলে গোসল সহজ হয়। এটা খুবই সাধারণ বিষয়। কিন্তু আপনি জেনে আশ্চর্য হবেন যে মাথায় গরম পানি ঢাললে চুলের ক্ষতি হয়। এটা একটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত সত্যি। যদিও এটা সরাসরি চুল উপড়ে ফেলে না।

গরম পানি (বিশেষ করে ৪০ ডিগ্রি সেলিয়াসের ওপরে, যেমন খুব গরম শাওয়ার) চুল ও স্ক্যাল্পের স্বাভাবিক গঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, যার ফলে চুল শুষ্ক, ভঙ্গুর, ফ্রিজি হয় এবং ভাঙতে শুরু করে। দীর্ঘদিন নিয়মিত এমন করলে চুল পাতলা লাগে এবং ব্রেকেজ (ভাঙা) বেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

চুলের কিউটিকল হলো চুলের শাফটের সবচেয়ে বাইরের স্তর, এটা চুলের প্রধান প্রতিরক্ষা বর্ম। এটি চুলকে শুষ্কতা, ক্ষতি, রাসায়নিক আক্রমণ এবং যান্ত্রিক ঘর্ষণ থেকে রক্ষা করে। কিউটিকল ক্ষতিগ্রস্ত হলে চুল রুক্ষ, ফ্রিজি, ভঙ্গুর হয়ে যায় এবং সহজে ভাঙে। চুলের বাইরের স্তরকে বলে কিউটিকল এটা ওভারল্যাপিং স্কেলের মতো (যেমন মাছের আঁশ) কেরাটিন সেল দিয়ে তৈরি। এই স্কেলগুলো সুস্থ থাকলে চুল চকচকে, মসৃণ এবং আর্দ্রতা ধরে রাখে।

গরম পানিতে চুলের কেরাটিন প্রোটিনের স্ট্রাকচার দুর্বল হয়
গরম পানিতে চুলের কেরাটিন প্রোটিনের স্ট্রাকচার দুর্বল হয়

গরম পানি কিউটিকলকে উঠিয়ে দেয় বা ওপেন করে দেয়। ফলে চুল পোরাস (ছিদ্রযুক্ত) হয়ে যায় আর্দ্রতা দ্রুত বেরিয়ে যায় চুল শুষ্ক, রুক্ষ ও ফ্রিজি হয়। এই ওপেন কিউটিকল সহজেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যার ফলে চুলের আগা ফেটে যায় ও চুলের ভঙ্গুরতা বেড়ে যায়।

বেশি গরম পানি ব্যবহার করলে চুলের আগা ফেটে যায় ও চুলের ভঙ্গুরতা বেড়ে যায়
বেশি গরম পানি ব্যবহার করলে চুলের আগা ফেটে যায় ও চুলের ভঙ্গুরতা বেড়ে যায়

গরম পানি প্রাকৃতিক তেল বা সিবাম ধুয়ে ফেলে। স্ক্যাল্পের সেবেসিয়াস গ্ল্যান্ড থেকে সেবাম (প্রাকৃতিক তেল) বের হয়, এটা চুল ও স্ক্যাল্পকে হাইড্রেট করে, কিউটিকলকে সিল করে রাখে এবং প্রতিরক্ষা দেয়। গরম পানি সেবামকে দ্রবীভূত করে এবং সহজে ধুয়ে ফেলে (যেমন গরম পানিতে তেলের দাগ সহজে উঠে)। সেবাম না থাকলে চুলের ময়শ্চার ব্যারিয়ার ভেঙে যায়, চুল ডিহাইড্রেটেড হয়, ভঙ্গুরতা বাড়ে। স্ক্যাল্প শুষ্ক হয়ে গেলে ইরিটেশন, চুলকানি বা খুশকি হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে চুলের স্বাস্থ্য নষ্ট করে।
গরম পানিতে কেরাটিন প্রোটিনের স্ট্রাকচার দুর্বল হয়।

বিজ্ঞাপন

চুল মূলত কেরাটিন প্রোটিন দিয়ে তৈরি। খুব গরম পানি এই প্রোটিনের বন্ধন দুর্বল করে বা ক্ষতিগ্রস্ত করে। উচ্চ তাপমাত্রায় কেরাটিন নষ্ট হতে পারে, অর্থাৎ প্রোটিনের গঠন ভেঙে যায়। ফলে চুলের স্থিতিস্থাপকতা কমে,  চুল সহজে ভাঙে। গবেষণায় দেখা গেছে ১৪০ ডিগ্রির ওপরে কেরাটিনের স্ট্রাকচার পুরোপুরি অপরিবর্তনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় (যদিও পানির তাপমাত্রা এতটা হয় না, কিন্তু নিয়মিত গরম পানি স্থায়ী ক্ষতি করে)।

নিয়মিত গরম পানি চুলের স্থায়ী ক্ষতি করে
নিয়মিত গরম পানি চুলের স্থায়ী ক্ষতি করে

স্ক্যাল্পের পিএইচ ও ব্যারিয়ার নষ্ট হয় এতে।গরম পানি স্ক্যাল্পের অ্যাসিড ম্যান্টল ধুয়ে ফেলে, পিএইচ বেড়ে যায়, ব্যারিয়ার দুর্বল হয়, প্রদাহ বা ইরিটেশন হয়। এতে ফলিকল দুর্বল হয় চুলের গ্রোথ সাইকেল প্রভাবিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে চুল ভাঙা বেড়ে চুল পাতলা লাগে (যদিও সরাসরি ফলিকল থেকে চুল উপড়ে যায় না)।

কোন তাপমাত্রা নিরাপদ

শরীরে: কুসুম গরম বা লুকওয়ার্ম (৩৭–৪০ ডিগ্রি, শরীরের তাপমাত্রার কাছাকাছি) পরিষ্কার করে কিন্তু ক্ষতি করে না।
মাথা: গোসলের শেষে ঠান্ডা পানি দিয়ে ধুয়ে নিন।  এতে কিউটিকল বন্ধ হয়, আর্দ্রতা লক হয়, চুল চকচকে হয়।

ঠান্ডা পানি কিউটিকল বন্ধ করে আর্দ্রতা এবং কন্ডিশনার লক করে, চুল চকচকে হয়
ঠান্ডা পানি কিউটিকল বন্ধ করে আর্দ্রতা এবং কন্ডিশনার লক করে, চুল চকচকে হয়

ঠান্ডা পানি মাথায় ঢালার উপকার

ঠান্ডা পানি চুলের প্রাকৃতিক তেল ধুয়ে ফেলে না, শুষ্কতা কমায়। এটা কোঁকড়া চুলের ফ্রিজি ভাব কমাতে সাহায্য করে। ঠান্ডা পানি কিউটিকল বন্ধ করে আর্দ্রতা এবং কন্ডিশনার লক করে, চুল চকচকে হয়। ডার্মাটোলজিস্টরা বলেন, কিউটিকল ছাদের টাইলের মতো, যা পানির তাপমাত্রায় খোলে ও বন্ধ হয়। ঠান্ডা পানি রক্ত সঞ্চালন উন্নত করতে পারে, যা চুলের ফলিকলকে পুষ্টি দেয়। তবে অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি স্ক্যাল্পের রক্তনালী সংকুচিত করতে পারে, যা উল্টো ক্ষতি করে। কিউটিকল নিজেই একটা জটিল, মাল্টি-লেয়ার্ড স্ট্রাকচার। এটি মৃত কেরাটিনোসাইট সেল দিয়ে তৈরি, যা ওভারল্যাপিং স্কেল (আঁশের মতো) আকারে সাজানো থাকে ঠিক যেমন ছাদের টাইলস বা মাছের আঁশ। গরম পানি চুল উপড়ে ফেলে না, কিন্তু নিয়মিত ব্যবহারে কিউটিকল, সেবাম, কেরাটিন ক্ষতিগ্রস্ত করে চুলকে দুর্বল, শুষ্ক ও ভঙ্গুর করে দেয়। তাই শীতকালেও কুসুম গরম পানি ব্যবহার শেষে ঠান্ডা পানিতে ধুয়ে নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।  কিউটিকল হলো চুলের স্বাস্থ্যের আয়না। এটা ভালো রাখলে চুল সুন্দর, চকচকে ও মজবুত থাকে। তাই গোসলে শরীরে কুসুম গরম পানি ঢালবেন কিন্তু মাথায় ঠান্ডা বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি ঢাললে অনেক উপকার পাবেন।

লেখক: খাদ্যপথ্য বিশেষজ্ঞ, প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: এআই ও পেকজেলস

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০১: ০০
বিজ্ঞাপন