জ্ঞানের প্রবেশদ্বার
শেয়ার করুন
ফলো করুন

ঢাকা–আরিচা মহাসড়কের পাশে বাইশ মাইল স্ট্যান্ডে নামলেই চোখে পড়ে বিশাল এক গেট—‘জ্ঞানের প্রবেশদ্বার’। এক পাশে খোদাই করা বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের নেতাদের মুখ, অন্য পাশে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের প্রতিকৃতি। একই পথ ধরে কিছুটা এগোলেই ‘মূল ফটক’, যার বাইরের দেয়ালে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্য আর ভেতরে বাংলার বিপ্লবী মহীয়সী নারীর মুখাবয়বের ছবি। দুটি ফটক একসঙ্গে যেন ইতিহাসের দুই প্রহরী, ঠিক এই দুই ফটকের পরেই দাঁড়িয়ে আছে এক বিশ্ববিদ্যালয়, যা প্রতিদিন শিক্ষার্থীদের শেখায়, ইতিহাসকে বাঁচানো, চেতনা ধারণ করা, সাহস ও দায়িত্বের পাঠ। বলছিলাম গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের (গবি) কথা।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর হাতে গড়া এই বিশ্ববিদ্যালয় যেন এক জীবন্ত পাঠশালা—যেখানে প্রতিটি ইট, প্রতিটি গেট, প্রতিটি দেয়াল বলে যায় মুক্তিযুদ্ধের গল্প। এই বিদ্যাপীঠের স্বপ্নদ্রষ্টা জাফরুল্লাহ চৌধুরীর চিন্তা ছিল স্পষ্ট—শিক্ষা কেবল পেশা নয়, এটি সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার। তাই গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যে যেমন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস খোদাই করা, তেমনি পাঠক্রমেও সেই চেতনার প্রতিফলন। এই গেটের এক পাশে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানসহ দেশের প্রথম অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রীদের প্রতিকৃতি খোদাই করা। অন্য পাশে খচিত রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের মুখাবয়ব। দূর থেকে তাকালেই মনে হয়, দেশের অতীত, সংগ্রাম আর আত্মত্যাগ যেন এখানে পাথরে খোদাই হয়ে আছে।

মহাসড়ক থেকে ক্যাম্পাসে প্রবেশের মুখেই সাভারের বাইশ মাইল এলাকায় দাঁড়িয়ে আছে গর্বভরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে লাল-সাদা রঙে গড়া এক বিশাল গেট। এই গেটের নামকরণও অর্থবহ। ‘জ্ঞানের প্রবেশদ্বার’—মানে যেন কেবল শিক্ষার শুরু নয়, ইতিহাসে প্রবেশ।

বিজ্ঞাপন

জ্ঞানের প্রবেশদ্বার দিয়ে ঢুকে গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস, ঘোড়াপীর মাজার পেরিয়ে কিছুদূর এগোলেই সড়কের ডানপাশে আরেকটি গেট। এটি গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক। বাইরের দেয়ালে খোদাই করা আছে ভাষা আন্দোলনের দৃশ্য—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি’—এই সুর যেন পাথরের ভেতরেও প্রতিধ্বনিত হয়। ভেতরের দেয়ালে খোদাই করা আছে বাংলার বিপ্লবী মহীয়সী নারী—বেগম রোকেয়া, সুফিয়া কামাল, ইলা মিত্র, জাহানারা ইমাম, নভেরা আহমেদসহ যারা নারী জাগরণের প্রতীক হয়ে আছেন। তাঁদের মুখে প্রতিবাদের ছাপ, চোখে সাহসের দীপ্তি। এই দেয়াল যেন নারীর অবস্থান ও অবদানের ইতিহাসকে চিরস্থায়ী করে তুলেছে। ক্যাম্পাসের প্রতিটি নারী শিক্ষার্থী যেন এখানে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে নতুনভাবে উপলব্ধি করে। এই ফটক থেকেই যেন সবাই ভেতরে ধারণ করে, ‘দাম দিয়ে কিনেছি বাংলা, কারও দানে পাওয়া নয়।’

নাগরিক সংবাদ–এ জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই–মেইল: [email protected]

শিক্ষার্থীদের শুধু পেশাগত শিক্ষা নয় বরং সমাজ, রাষ্ট্র ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধ হতে শেখাতেই যেন এত আয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি স্থাপনায় মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, নারী জাগরণ—এই তিনটি বিষয়কে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে স্থাপত্য ও শিল্পকর্ম। যেন এগুলোই জীবন্ত শিক্ষক। গেটগুলোর নির্মাণশৈলীতে ব্যবহৃত হয়েছে শক্ত কংক্রিট আর মাটির রঙের ছোঁয়া। স্থপতিরা চেয়েছিলেন এটি যেন সময়ের সঙ্গে ইতিহাসকে ধারণ করে টিকে থাকে—যেন মুছে না যায় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি।

বিজ্ঞাপন

‎ইতিহাসকে বাঁচিয়ে রাখার এই প্রচেষ্টাই যেন ‘ইউনিভার্সিটি উইথ ডিফারেন্স’ মোটোধারী এই বিশ্ববিদ্যালয়কে অনন্য করে তুলেছে দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চেয়ে। প্রবেশপথেই যেন প্রতিটি মুখ, প্রতিটি খোদাই শিক্ষার্থীদের মনে প্রশ্ন তোলে, ‘তুমি কি জানো তোমার ইতিহাস? তুমি কি জানো কেন পড়ছো?’

‎গেটের গল্প বলতে গিয়ে কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী শেখ রোহান বলেন, মুক্তিযুদ্ধ শব্দটির মর্মার্থ আজকের সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটে ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। শিশু থেকে তরুণ—সব বয়সের মানুষের মাঝেই তৈরি হচ্ছে একধরনের উদাসীনতা। অথচ বিশ্ববিদ্যালয় হলো একটি দেশের মেরুদণ্ড, যেখানে গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব—যারা দেশকে আলোকিত পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

মূল ফটকের ভেতরের অংশ
মূল ফটকের ভেতরের অংশ
ছবি: হামিম মন্ডল

এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হতে পেরে আমি গর্বিত, যেখানে এখনো মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গ করা অকুতোভয় বীরদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হয়। বাইশ মাইলের ফটকে ‘প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার’-এর মুখচ্ছবি যেন স্মরণ করিয়ে দেয় তাদের ত্যাগের গৌরবগাথা এবং আমাদের স্বাধীনতার শিকড়ের গল্প।

‎বিপ্লবী নারীদের মুখাবয়ব স্মরণ করে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আফরা রুমালি সুপ্তি বলেন, ‘বিজয়লক্ষ্মী নারীদের অনুপ্রেরণার গল্প গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক। কামিনী রায় থেকে জাহেদা খানম ১১ জন নারীর প্রতিটা ছবি যেন প্রতিনিধিত্ব করছে নারীদের সংগ্রামের প্রতিটা ক্ষেত্রকে। শিল্প, সাহিত্য, দেশের জন্য সংগ্রাম, আত্মত্যাগের গল্প, যা আমাদের শিক্ষা দেয় কোনো বাধা না মেনে সামনে এগিয়ে যাওয়ার, নিজেদের জয় করার শিক্ষা।’

মূল ফটক ২
মূল ফটক ২
ছবি: হামিম মন্ডল

ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক লিটন হোসেন বলেন, গণ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই গণমানুষের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার যে দর্শন ধারণ করে এসেছে, প্রবেশদ্বারের এই শিল্পকর্মগুলো তারই প্রতিফলন। এখানে ইতিহাস কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় নয়; বরং তা বর্তমান শিক্ষাজীবনের অংশ হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীরা যখন প্রতিদিন এই গেট অতিক্রম করে, তখন তারা অজান্তেই ইতিহাসের সঙ্গে একটি নৈতিক সংযোগ স্থাপন করে। ‎তিনি বলেন, ‘এই প্রবেশদ্বারগুলো তাই শুধু যাতায়াতের পথ নয়; এগুলো এক স্মরণচিহ্ন, যেখানে অতীতের সংগ্রাম বর্তমানের শিক্ষাকে গভীরতা দেয় এবং ভবিষ্যতের দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করে। গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই চেতনাই একে কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং একটি মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষাঙ্গন হিসেবে স্বতন্ত্র করে তোলে।’

প্রকাশ: ০৬ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯: ২৫
বিজ্ঞাপন