
প্রাচীন ভারতীয় আয়ুর্বেদে আমলকিকে বলা হয় ‘রসায়ন’—অর্থাৎ এমন একটি ফল, যা শরীরকে সুস্থ ও দীর্ঘায়ু রাখতে সহায়তা করে। পুরাণে এমনও উল্লেখ আছে, ব্রহ্মার অশ্রু থেকেই নাকি পৃথিবীর প্রথম আমলকি গাছের জন্ম। তাই একে অনেক সময় ‘আদি বৃক্ষ’ বলেও অভিহিত করা হয়। বৌদ্ধ সাহিত্যে আমলকির স্বচ্ছতা ও পূর্ণতার উপমাও পাওয়া যায়।

পুরাণের গল্প একদিকে থাক, আধুনিক বিজ্ঞানও কিন্তু আমলকির অসাধারণ পুষ্টিগুণের স্বীকৃতি দিয়েছে।

আমলকি (Phyllanthus emblica বা Emblica officinalis), যা Indian Gooseberry নামেও পরিচিত, ভিটামিন সি-এর অন্যতম সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক উৎস। জাতভেদে প্রতি ১০০ গ্রাম তাজা আমলকিতে প্রায় ১৯৩ থেকে ৭২০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত ভিটামিন সি পাওয়া যায়। সাধারণভাবে এতে ৫০০–৬০০ মিলিগ্রাম বা তারও বেশি ভিটামিন সি থাকতে পারে, যা কমলার তুলনায় বহুগুণ বেশি।
শুধু ভিটামিন সি-ই নয়, আমলকিতে রয়েছে গ্যালিক অ্যাসিড, এলাজিক অ্যাসিড, এমবলিক্যানিন, ফ্ল্যাভোনয়েডসহ নানা ধরনের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। এসব উপাদান শরীরকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, আমলকি শরীরের ক্ষতিকর ফ্রি র্যাডিক্যাল নিষ্ক্রিয় করে প্রদাহ কমাতে সাহায্য করে। নিয়মিত পরিমিত পরিমাণে খেলে বার্ধক্যের গতি ধীর হতে পারে এবং কোষের ক্ষয় কমে।
ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে দেখা গেছে, আমলকির নির্যাস খেলে এলডিএল (খারাপ) কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমতে পারে, আবার এইচডিএল (ভালো) কোলেস্টেরল বাড়তে পারে। পাশাপাশি এটি রক্তনালির কার্যকারিতা উন্নত করতে এবং রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
কিছু গবেষণায় আরও দেখা গেছে, প্রতিদিন ১–৩ গ্রাম আমলকির গুঁড়া গ্রহণ করলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে এটি ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প নয়।
উচ্চমাত্রার ভিটামিন সি ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়া হার্টবার্ন কমানো, লিভার সুরক্ষা, কোলাজেন সংরক্ষণ এবং সুস্থ বার্ধক্য বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এর সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে গবেষণা চলছে।

আয়ুর্বেদে বহু শতাব্দী ধরে চুলের যত্নে আমলকি ব্যবহার হয়ে আসছে। আধুনিক গবেষণাও এই ধারণার কিছু বৈজ্ঞানিক ভিত্তি খুঁজে পেয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, আমলকির নির্যাস ৫-আলফা রিডাক্টেজ (5α-reductase) এনজাইমের কার্যকারিতা কমাতে পারে। এই এনজাইম টেস্টোস্টেরনকে ডিএইচটি (DHT)-তে রূপান্তর করে, যা নারী ও পুরুষ উভয়ের প্যাটার্ন টাকের অন্যতম কারণ।
২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি র্যান্ডমাইজড, প্লেসিবো-কন্ট্রোলড, ট্রিপল-ব্লাইন্ড গবেষণায় দেখা গেছে, ১২ সপ্তাহ আমলকি সিরাপ ব্যবহারের ফলে চুলের বৃদ্ধিপর্ব (Anagen phase) বেড়েছে এবং চুল পড়ার পর্যায় (Telogen phase) কমেছে। উল্লেখযোগ্য কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও দেখা যায়নি।
এছাড়া আমলকির অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি কোলাজেন তৈরিতে সহায়তা করে, মাথার ত্বকের প্রদাহ কমায় এবং চুলের গোড়া মজবুত রাখতে সাহায্য করতে পারে।
বেশিরভাগ ফলের ভিটামিন সি রান্না বা শুকানোর সময় নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু আমলকিতে থাকা এমবলিক্যানিন এ ও বি নামের বিশেষ ট্যানিন ভিটামিন সি-কে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখতে সাহায্য করে। ফলে শুকনো আমলকি বা গুঁড়াতেও এর অনেক পুষ্টিগুণ বজায় থাকতে পারে।
প্রতিদিন ১–২টি তাজা আমলকি খাওয়া যেতে পারে। চাইলে জুস হিসেবেও পান করা যায়। আবার প্রতিদিন ১–৩ গ্রাম আমলকির গুঁড়াও গ্রহণ করা যেতে পারে।

অতিরিক্ত আমলকি খেলে কারও কারও পেটের সমস্যা হতে পারে। যারা রক্ত পাতলা করার ওষুধ বা ডায়াবেটিসের ওষুধ খান, তাদের চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে আমলকি খাওয়া উচিত। গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মায়েদের ক্ষেত্রেও একই পরামর্শ প্রযোজ্য।
ছোট্ট এই ফলটি শুধু ভিটামিন সি-এর ভান্ডার নয়; এটি শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা হৃদ্স্বাস্থ্য, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা, ত্বক ও চুলের যত্নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে যেকোনো প্রাকৃতিক খাদ্যের মতোই আমলকিও পরিমিত পরিমাণে এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হিসেবেই সবচেয়ে বেশি উপকার দেয়।
লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র
ছবি: পেকজেলসডটকম