
যশোর শিল্পকলা একাডেমির গেটের বিপরীতে, স্টেডিয়াম রোডে ‘প্রিয়ভাষিনী’র শোরুম। ঐতিহ্যবাহী যশোর স্টিচসহ মেয়েদের নানা ধরনের পোশাকের এই প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা মুসলিমা খাতুন। ২০১৮ সাল থেকে কাজ করে তিনি আজকের অবস্থানে পৌঁছেছেন।
সেই মুসলিমা গত প্রায় দেড় মাস ধরে প্রতি শুক্রবার বিকেলে যশোর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। ধানমন্ডির একটি মেয়েদের হোস্টেলে রাত কাটিয়ে পরদিন সকাল সাতটায় সোবহানবাগ মসজিদের সামনে থেকে ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির বাসে উঠে পড়েন। গন্তব্য বিরুলিয়ায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। উদ্দেশ্য—নারী উদ্যোক্তাদের জন্য আয়োজিত ‘উদ্যোক্তা ১০১’ কোর্সে অংশগ্রহণ। কোনো কোনো দিন তিনি গভীর রাতে ঢাকায় পৌঁছেছেন। আবার শনিবার কোর্স শেষে যশোরে ফিরেছেন রাত দুইটায়।

এই কষ্ট কেন করছেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে মুসলিমা বলেন, “উদ্যোক্তাদের সব সময় শেখার মধ্যে থাকতে হয়। অনেকটা সেনাবাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত প্রশিক্ষণের মতো। আমি কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই ২০১৮ সালে ব্যবসা শুরু করি। তাই নিজের না-জানা বিষয়গুলো জানতে এবং জানা বিষয়গুলো আরও ঝালিয়ে নিতে এই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, “পড়াশোনা শেষ করার অনেক বছর পর আবার একটি সুন্দর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ক্লাস করার অভিজ্ঞতা সত্যিই অসাধারণ।” বিবিএ পড়ার সময়ই কর্মজীবন শুরু করায় ক্যাম্পাসজীবন উপভোগ করার সুযোগ তেমন হয়নি। তাই এই সুযোগটি তিনি কাজে লাগিয়েছেন।
মুসলিমার মতো নারী উদ্যোক্তাদের উদ্যোক্তাজীবনের বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করার জন্য ব্র্যাক ব্যাংকের ‘তারা’ কয়েক বছর আগে ‘উদ্যোক্তা ১০১’ কোর্স চালু করে। ড্যাফোডিলসহ দেশের চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে এ আয়োজন পরিচালিত হচ্ছে। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতি শনিবার একটি সেশন অনুষ্ঠিত হলেও শহর থেকে দূরে হওয়ায় ড্যাফোডিলে প্রতি শনিবার দুটি সেশন অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের জন্য সকালের নাশতা ও দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। ড্যাফোডিলের কোর্সটি শেষ হয় ছয় সপ্তাহে।

‘আশালতা’-এর উদ্যোক্তা আশরাফুন নাহার দীর্ঘদিন ধরে খাদ্যভিত্তিক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। সম্প্রতি তিনি আরও তিনজন অংশীদারকে নিয়ে একটি যৌথ উদ্যোগ শুরু করেন। তবে ব্যবসা পরিচালনার প্রাথমিক পর্যায়েই তারা উপলব্ধি করেন, ব্যক্তিগতভাবে ব্যবসা পরিচালনার অভিজ্ঞতা থাকলেও অংশীদারিত্বভিত্তিক ব্যবসার নানা চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে তাদের পর্যাপ্ত ধারণা ছিল না। আশরাফুন নাহার বলেন, “আমাদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা দিচ্ছিল। কার্যকর যোগাযোগ, মতবিরোধের সমাধান কিংবা যৌথভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আমরা বেশ কিছু সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছিলাম। ঠিক তখনই ফেসবুকের মাধ্যমে ‘উদ্যোক্তা ১০১’ সম্পর্কে জানতে পারি এবং এতে অংশগ্রহণ করি।” তিনি জানান, ‘উদ্যোক্তা ১০১’-এর পাঠ্যবিষয় ও সেশনগুলো একটি উদ্যোগ পরিচালনার প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ দিককে অন্তর্ভুক্ত করেছে। “মনোযোগ ও ধৈর্য নিয়ে অংশগ্রহণ করলে এটি যেকোনো উদ্যোক্তার জন্য অত্যন্ত সহায়ক হতে পারে,” বলেন তিনি। অর্জিত জ্ঞানকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি সব রিসোর্স ও ডকুমেন্ট তাঁর অংশীদারদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেছেন এবং সেগুলো নিয়ে নিয়মিত আলোচনা করেছেন। ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস নিয়েও উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “প্রকৃতির মাঝে এত সুন্দর ও প্রাণবন্ত শেখার পরিবেশ ঢাকার খুব কম বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে। প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে যাতায়াত এবং ব্যস্ত জীবনের বাইরে এমন একটি শিক্ষামূলক পরিবেশে সময় কাটানো ছিল সত্যিই আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা।”
এই আয়োজনে মোট ১২টি সেশন রয়েছে। ব্যবসা পরিচালনা, আইনগত বিষয়, মার্কেটিং ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি এতে রয়েছে মানসিক স্বাস্থ্য ও সুস্থতা নিয়ে সেশন। নেতৃত্ব, তহবিল সংগ্রহ এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের কৌশল নিয়েও আলোচনা করা হয়।

ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনগুলো পরিচালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মামুন ইকবাল, ইনোভেশন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ বিভাগের বিভাগীয় প্রধান কামরুজ্জামান দিদার, বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের সভাপতি মুনির হাসান, ব্র্যাক ব্যাংকের নারী উদ্যোক্তা সেলের প্রধান খাদিজা মরিয়ম, উদ্যোক্তা তানিয়া ওয়াহাব, তাসলিমা মিজি, আশিক খান এবং ‘চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব’ প্ল্যাটফর্মের পরিচালক সাজ্জাত হোসেন প্রমুখ।
এক্সক্লুসিভ অর্থি ফ্যাশন হাউজের উদ্যোক্তা তাসলিমা খানমের মতে, ‘উদ্যোক্তা ১০১’ তাঁর উদ্যোক্তা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। তিনি মনে করেন, একটি ব্যবসার শুরু থেকে পরিচালনা ও সম্প্রসারণ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের নির্দেশনা এই আয়োজনে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

তাসলিমা খানম বলেন, “আগে আমি একটি পোশাক তৈরির ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন খরচ হিসাব করতাম। কিন্তু ‘উদ্যোক্তা ১০১’-এ অংশ নেওয়ার পর বুঝতে পেরেছি, কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য যাতায়াত ব্যয় থেকে শুরু করে পণ্যটি ক্রেতার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি খরচই ব্যবসার হিসাবের অংশ হওয়া উচিত।” এই আয়োজনের উপকারিতা সম্পর্কে তিনি এতটাই আশাবাদী যে, নিজের কানাডাপ্রবাসী এক বন্ধুকেও পরবর্তী ব্যাচে অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন করিয়েছেন। তাঁর বন্ধু বর্তমানে একটি নতুন উদ্যোগ শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
এই কোর্সের উদ্যোক্তা ব্র্যাক ব্যাংকের অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর অ্যান্ড হেড অব এসএমই ব্যাংকিং সৈয়দ আব্দুল মোমেন বলেন, “‘উদ্যোক্তা ১০১’ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা খাতের অংশীদারত্বের একটি অনন্য উদাহরণ। এই কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য হলো ব্যবসা পরিচালনা, আর্থিক জ্ঞান এবং পণ্যের বাজারজাতকরণ সম্পর্কে নারী উদ্যোক্তাদের বাস্তবভিত্তিক ধারণা দেওয়া। ২০২১ সালে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সহযোগিতায় আমরা এখন পর্যন্ত ৫০০-এর বেশি নারী উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দিয়েছি। আমরা এই কর্মসূচির আরও উন্নয়ন করতে চাই, যাতে তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোক্তারাও এর সুবিধা পান।”

স্কেল-আপ সামিট এই কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করা তিন শতাধিক নারী উদ্যোক্তাকে নিয়ে গত ১৩ মে ঢাকায় আয়োজন করা হয় ‘উদ্যোক্তা ১০১ স্কেল-আপ সামিট’। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ আব্দুল মোমেন বলেন, “অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর ব্যাপারে আমাদের ব্যাংকের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন হলো ‘তারা উদ্যোক্তা ১০১ স্কেল-আপ সামিট’। বাংলাদেশে নারী-নেতৃত্বাধীন ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে আমরা এই সম্মেলনের আয়োজন করেছি।”
সম্মেলনে অংশ নেওয়া শুরুর দিকের অংশগ্রহণকারীদের একজন, তানি’স বাংলাদেশের উদ্যোক্তা তানিয়া নাজনীন বলেন, “এই সম্মেলনে অনেক উদ্যোক্তা ও মেন্টরের সঙ্গে আবারও যোগাযোগের সুযোগ হয়েছে। পরস্পরের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে পেরেছি।” তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে ‘উদ্যোক্তা ১০২’ নামে নতুন কোর্সের আয়োজন করা হবে।

সম্মেলনে ‘উদ্যোক্তা ১০১’-এর গুণগত মূল্যায়ন করা হয় এবং সম্ভাব্য ‘উদ্যোক্তা ১০২’ কর্মসূচি সম্পর্কে নারী উদ্যোক্তাদের মতামত সংগ্রহ করা হয়। উদ্যোক্তা ১০১ বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রগতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তাঁর ভাষায়, “স্বল্প সময়ে অনেক কিছু শেখার প্রত্যাশায় যেসব প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া হয়, সেগুলোর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হাতে-কলমে শেখার সুযোগ সীমিত থাকে। কিন্তু ‘উদ্যোক্তা ১০১’ ছিল ব্যতিক্রম। প্রাপ্তি অনেক বেশি।”
অংশগ্রহণকারীরা জানান, নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে গড়ে ওঠা নেটওয়ার্কিং এই আয়োজনের অন্যতম বড় অর্জন। তাঁদের মতে, “আমরা এখন নিয়মিতভাবে নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন সুযোগ, সম্ভাবনা ও ব্যবসায়িক ধারণা নিয়ে আলোচনা করি। বিভিন্ন আয়োজনে একসঙ্গে কাজ করি এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় একে অপরের পরামর্শ নিতে পারি। এই পারস্পরিক সহযোগিতা ও সংযোগ আমাদের উদ্যোক্তা হিসেবে আরও শক্তিশালী করেছে।”

জানা যায়, এই কোর্সে জনপ্রতি ব্যয় প্রায় ৪৬ হাজার টাকা। তবে অংশগ্রহণকারীদের দিতে হয় মাত্র ৫ হাজার টাকা। বাকি ব্যয় বহন করে ব্র্যাক ব্যাংক। ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে নতুন একটি ব্যাচের নিবন্ধন চলছে। জুন মাসের শেষে কোর্সটি শুরু হবে। আগ্রহী উদ্যোক্তারা নিচের লিংকে গিয়ে নিবন্ধন করতে পারেন:
https://tinyurl.com/101DIUJN
ছবি: উদ্যোক্তা ১০১