
বাংলাদেশের সমৃদ্ধ অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, গবেষণা, নথিবদ্ধকরণ ও প্রজন্মান্তরে হস্তান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন দেশি-বিদেশি গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, ঐতিহ্যের টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ, স্থানীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার যথাযথ মূল্যায়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা জরুরি।

আন্তর্জাতিক অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য দিবস–২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও ইউনেসকোর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। ২৪ অক্টোবর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের কবি সুফিয়া কামাল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত সেমিনারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘কমিউনিটিভিত্তিক অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের কৌশল’।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ঐতিহ্য রক্ষায় সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। লোকজ উৎসব, নৌকাবাইচ ও লোকসংগীত মানুষের মধ্যে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করে। নতুন প্রজন্মকে দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা জরুরি, যাতে তারা মাদকসহ নেতিবাচক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকতে পারে। সমাজ ও সংস্কৃতির বিকাশে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বিশেষ অতিথি ছিলেন মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন বেগম। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ইউনেসকো বাংলাদেশের অফিসপ্রধান ও প্রতিনিধি ড. সুজান ভাইজ এবং আন্তর্জাতিক অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য গবেষক ও নৃবিজ্ঞানী ড. আলেকজান্দ্রা ডেনেস।
সেমিনারে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর ও ইউনেসকোর সহযোগিতায় পরিচালিত একটি বিশেষ প্রকল্পের কার্যক্রম তুলে ধরা হয়। ‘ইমপ্লিমেন্টিং কমিউনিটিভিত্তিক হেরিটেজ ফেস্টিভ্যালস ইন এইট অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ডিভিশনস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই প্রকল্পের আওতায় দেশের আটটি প্রশাসনিক বিভাগে আটটি জনগোষ্ঠীর অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে উৎসব ও বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর শুরু হওয়া দুই বছর মেয়াদি এই প্রকল্পের জন্য ৯৯ হাজার ৭০০ মার্কিন ডলার অনুদান দেওয়া হয়েছে। এর লক্ষ্য স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রচার ও পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হস্তান্তর। এ জন্য স্থানীয় শিল্পী, কারুশিল্পী, পরিবেশক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ, ঐতিহ্য নথিবদ্ধকরণ এবং প্রজন্মান্তরে জ্ঞান বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উৎসব আয়োজনের পর সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর মতামত নিয়ে ভবিষ্যৎ কার্যক্রম ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের স্থায়িত্ব নিয়েও আলোচনা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সেমিনারে প্রকল্পের আওতাভুক্ত আটটি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যভিত্তিক উৎসব নিয়ে তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। পাশাপাশি হাজং ও মণিপুরি সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরে।

সেমিনারের দ্বিতীয় অধিবেশনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের জনশিক্ষা বিভাগের কিপার ও প্রকল্পের ফোকাল পয়েন্ট আসমা ফেরদৌসী। প্রকল্পের অংশীদার আটটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরাও তাঁদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। এ ছাড়া বক্তব্য দেন রবীন্দ্র সৃজনকলা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড. সাইদুর রহমান এবং লেখক, অনুবাদক ও সম্পাদক রিফাত মুনিম।
পরবর্তী সময়ে ড. আলেকজান্দ্রা ডেনেস জনগোষ্ঠীভিত্তিক অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিভিন্ন সুপারিশ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করেন। অনুষ্ঠানে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের পরিচালক মো. সাদেকুল ইসলাম। দেশি-বিদেশি গবেষক, বিশেষজ্ঞ, ঐতিহ্য সংরক্ষণে যুক্ত বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, জাদুঘরের কর্মকর্তা ও আমন্ত্রিত অতিথিরা সেমিনারে অংশ নেন।

উল্লেখ্য, ইউনেসকোর সংজ্ঞায় অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্যে রয়েছে মৌখিক ঐতিহ্য ও অভিব্যক্তি, পরিবেশনশিল্প, সামাজিক রীতিনীতি ও উৎসব, প্রকৃতি ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কিত জ্ঞান এবং ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প। বাংলাদেশের জামদানি বয়নশিল্প, বাউলগান, মঙ্গল শোভাযাত্রা, শীতলপাটি বয়নশিল্প ও ঢাকার রিকশাচিত্র এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এসব ঐতিহ্য কেবল অতীতের স্মারক নয়, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন, জ্ঞান ও পরিচয়ের অংশ।
ছবি: বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর