সুরক্ষিত স্বাস্থ্য, উচ্ছল তারুণ্য: কিশোরীদের স্বাস্থ্য সচেতনতায় পাওয়ার অব শির বিশেষ আয়োজন
শেয়ার করুন
ফলো করুন

নারীর স্বাস্থ্যকে ঘিরে সামাজিক সংকোচ, ভুল ধারণা ও নীরবতা ভাঙার লক্ষ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম (পিসিওএস), বন্ধ্যাত্ব, স্তন ক্যানসার এবং কিশোরীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্য বিষয়ে বিশেষ সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করেছে পাওয়ার অব শি ট্রাস্ট।

মঙ্গলবার ৬ অক্টোবর রাজধানীর সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে নারীর প্রজননস্বাস্থ্য, পিসিওএস, বন্ধ্যাত্ব, স্তন ক্যানসার শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা এবং কিশোরীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী কিশোরীদের মধ্যে প্যাড ব্যাংক উপহার দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে ছাত্রীদের সঙ্গে অতিথিরা
অনুষ্ঠানে ছাত্রীদের সঙ্গে অতিথিরা

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম খান। বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের (ওজিএসবি) সাবেক মহাসচিব অধ্যাপক ডা. গুলশান আরা, আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের গাইনোকোলজিস্ট ও বন্ধ্যাত্ব এবং আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ডা. শারমিন আব্বাসী, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সার্জিক্যাল অনকোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হাসান শাহরিয়ার কল্লোল এবং মাইন্ড কেয়ারের সাইকোলজিস্ট তানিয়া সুভাষিতা। অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, নারী উদ্যোক্তা, চিকিৎসক ও গণমাধ্যমকর্মীরাও অংশ নেন।

বিজ্ঞাপন

পিসিওএস নিয়ে সচেতনতা

আলোচনায় ডা. শারমিন আব্বাসী কিশোরী ও তরুণীদের মধ্যে হরমোনজনিত সমস্যা পলিসিস্টিক ওভারি সিন্ড্রোম বা পিসিওএস নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, পিসিওএসকে শুধু ডিম্বাশয়ের সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না; এটি শরীরের হরমোন ও বিপাকীয় ভারসাম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জটিলতা।

দুই-তিন মাস পরপর মাসিক হওয়া, অতিরিক্ত রক্তস্রাব বা তীব্র ব্যথা, হঠাৎ ওজন বৃদ্ধি, মুখে অনাকাঙ্ক্ষিত লোম, ব্রণ কিংবা অতিরিক্ত চুল পড়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

ছাত্রীরা শুনছেন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য
ছাত্রীরা শুনছেন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য

সময়মতো শনাক্তকরণ ও যথাযথ ব্যবস্থাপনা না হলে ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ফ্যাটি লিভার, মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যা এবং গর্ভধারণে জটিলতার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

পিসিওএস মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের ওপর গুরুত্ব দিয়ে ডা. শারমিন সুষম খাবার গ্রহণ, জাঙ্ক ফুড ও সফট ড্রিংকস এড়িয়ে চলা, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং পর্যাপ্ত ঘুমের পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খেয়ে অনিয়মিত মাসিক বা শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিলে শুরুতেই গাইনোকোলজিস্টের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

স্তন ক্যানসারে গুরুত্ব প্রাথমিক শনাক্তকরণে

স্তন ক্যানসার শনাক্তকরণে স্ক্রিনিং, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সার্জিক্যাল চিকিৎসার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন ডা. হাসান শাহরিয়ার কল্লোল। তিনি জানান, রোগের ধরন, পর্যায় এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করেই চিকিৎসার পরিকল্পনা নির্ধারণ করা হয়।

স্তন ক্যানসারের চিকিৎসায় প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের ধরন এবং পরবর্তী চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ করা হয় উল্লেখ করে তিনি প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ, সময়মতো বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানার ওপর গুরুত্ব দেন। স্তনে কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে তা অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কিশোরীদের স্বাস্থ্য ও মানসিক সুস্থতা

অধ্যাপক ডা. গুলশান আরা নারীর প্রজননস্বাস্থ্য এবং কিশোরীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, কিশোরীদের বয়স-উপযোগী ও সঠিক তথ্য দেওয়া জরুরি, যাতে তারা শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তনগুলো বুঝতে পারে এবং প্রয়োজনে যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা নিতে পারে।

নারীর শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান সাইকোলজিস্ট তানিয়া সুভাষিতা। স্বাস্থ্য নিয়ে ভয়, সংকোচ কিংবা সামাজিক চাপের কারণে কোনো নারী যেন প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হন, সে জন্য পরিবার ও সমাজের ইতিবাচক ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

আলোচনা পর্বে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা নারীর স্বাস্থ্য, পিসিওএস, মাসিককালীন স্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য ও স্তন ক্যানসারসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের কাছে প্রশ্ন করেন। আলোচকেরা তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা দূর করতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও তথ্য দেন। শিক্ষার্থীদের সরাসরি অংশগ্রহণে আলোচনাটি হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত ও তথ্যবহুল।

নারীর স্বাস্থ্য সবার দায়িত্ব

আলোচনায় বক্তারা নারীর স্বাস্থ্যকে শুধু ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব হিসেবে দেখার ওপর গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে কিশোরীদের মাসিককালীন স্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক তথ্য, রোগ প্রতিরোধ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

পাওয়ার অব শি ট্রাস্টের চেয়ারম্যান সাবিনা স্যাবি বলেন, “নারীর স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, এটা তার অধিকার। আমাদের আজকের আয়োজনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে কিশোরীদের স্বাস্থ্য সচেতনতা তৈরি করা। কারণ স্বাস্থ্য সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান যদি আমরা ছোটবেলা থেকেই দিতে পারি, তাহলে একজন কিশোরী নিজের শরীরের পরিবর্তনকে ভয় না পেয়ে বুঝতে শিখবে, প্রয়োজন হলে সাহায্য চাইতে শিখবে এবং ভবিষ্যতে নিজের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।”

তিনি বলেন, পাওয়ার অব শি ট্রাস্ট শুধু একটি আয়োজনের মধ্যে নিজেদের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখতে চায় না; বরং স্বাস্থ্যসচেতনতার বার্তা আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চায়। শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল—দেশের প্রতিটি নারী ও পরিবার যেন বুঝতে পারে, নিজের স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, এটি অধিকার।

সাবিনা স্যাবি আরও বলেন, “আমরা চাই, একজন মা যেন মেয়ের মাসিক নিয়ে কথা বলতে সংকোচ না করেন, একজন কিশোরী যেন নিজের শারীরিক পরিবর্তন নিয়ে ভয় না পায়, একজন নারী যেন স্তনে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন হলে তা অবহেলা না করেন। সবচেয়ে বড় কথা, নারীর স্বাস্থ্য নিয়ে নীরবতা যেন ভাঙে। আজকের এই আয়োজন সেই নীরবতা ভাঙারই একটি ছোট্ট পদক্ষেপ।”

দীর্ঘদিনের কাজ

২০১৭ সাল থেকে নারীর ক্ষমতায়ন, দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি, স্বাস্থ্যসচেতনতা ও টেকসই নেটওয়ার্কিং নিয়ে কাজ করছে পাওয়ার অব শি ট্রাস্ট। ২০২০ সাল থেকে নিয়মিত আয়োজন করছে ‘উইমেন সামিট অ্যান্ড এক্সিবিশন’। এসব আয়োজনে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য দেশীয় পণ্যের প্রদর্শনী, নেটওয়ার্কিং, প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপের পাশাপাশি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য, প্রজননস্বাস্থ্য এবং নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে সচেতনতামূলক আলোচনা ও সেশন অনুষ্ঠিত হয়।

পাওয়ার অব শি ট্রাস্টের এ ধরনের উদ্যোগের লক্ষ্য—ঢাকা থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত নারী ও কিশোরীদের কাছে স্বাস্থ্যসচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া এবং নিজেদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের উৎসাহিত করা।

ছবি: পাওয়ার অব শি

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৪: ৫১
বিজ্ঞাপন