
ঢাকার ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝেও এক ভিন্নধর্মী প্রশান্তির আবহ তৈরি হয়েছিল ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। ২২ এপ্রিল শুরু হওয়া দুইদিনব্যাপী ‘ন্যাশনাল ইয়ুথ ওয়েলনেস ফেস্টিভ্যাল’-এর প্রথম দিন যেন পরিণত হয় আত্ম-অন্বেষণ, মানসিক সুস্থতা এবং পারস্পরিক সংযোগের এক অনন্য প্ল্যাটফর্মে।


'দ্যা ফ্লো ফেস্ট' ও 'প্রাইম নাও'-এর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই উৎসবে ঢাকার ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেন। অ্যাকাডেমিক চাপ, ক্যারিয়ার অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক প্রত্যাশার চাপে নীরবে ভুগতে থাকা তরুণদের জন্য এই আয়োজন যেন এক মুক্ত বাতাসের জানালা খুলে দেয়।
আয়োজকদের এক জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। ১৯ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ৩৫ শতাংশ প্রায় প্রতিদিন এবং আরও ৩০ শতাংশ অধিকাংশ দিন মানসিক চাপে থাকেন।


এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে উৎসবের প্রতিটি আয়োজন সাজানো হয়েছে এমনভাবে, যেখানে তরুণরা নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, সমাধানের পথ খুঁজে পায় এবং বুঝতে পারে তারা একা নয়।
উৎসবের উদ্বোধন করেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, ‘দ্য বাংলাদেশি’ থিংক ট্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এবং বিসিবির এডহক কমিটির সদস্য ইসরাফিল খসরু। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্ম আগের তুলনায় অনেক বেশি সচেতন এবং নিজেদের স্বপ্ন অনুযায়ী এগিয়ে যেতে চায়। তবে এই যাত্রায় মানসিক চাপ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

তিনি বলেন, “মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি। কাজের চাপের মধ্যেও নিজের জন্য সময় বের করা এবং পরিবারকে সময় দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় সুবিধা হলো তারা বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও রিসোর্সের মাধ্যমে নিজেদের উন্নত করার সুযোগ পাচ্ছে। অতীতে যেসব বিষয় নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা হতো না, এখন সেগুলো নিয়ে সচেতনতা বাড়ছে।
আয়োজনের শুরুতেই দ্যা ফ্লো ফেস্টের প্রতিষ্ঠাতা ও যোগ বিশেষজ্ঞ সাজিয়া ওমর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। আর তা হলো, আমরা অনেক সময়ই খেয়াল করি না, আমাদের পাশের মানুষটি কেমন আছে। নিজের যত্ন নিজেই নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে জীবনের অনেক সমস্যাই সহজ হয়ে যায় বলে তিনি মত দেন।


সকালের ‘ওয়েলনেস নাও’ প্যানেল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা তুলে ধরেন ডিজিটাল বার্নআউট, ক্যারিয়ার উদ্বেগসহ বর্তমান প্রজন্মের বিভিন্ন মানসিক চাপের উৎস। পাশাপাশি তারা বাস্তবসম্মত কিছু করণীয়ও তুলে ধরেন, যা তরুণদের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগযোগ্য।
দুপুরের পর উৎসবের আবহে আসে নতুন মাত্রা। শারীরিক ও মানসিক শক্তি বাড়ানোর লক্ষ্যে অনুষ্ঠিত হয় সেলফ ডিফেন্স ও ফেন্সিং সেশন, যা অংশগ্রহণকারীদের আত্মবিশ্বাস ও শৃঙ্খলা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।


অন্যদিকে অর্থী আহমেদের নাচের সেশন শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত করে তোলে যেখানে নড়াচড়ার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায় আনন্দ ও আবেগ।
দিনটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘হিলিং আওয়ার’। দুপুর ১টা ১০ মিনিট থেকে শুরু হওয়া এই বিশেষ সেশনে ছিল ১০টি ভিন্নধর্মী অ্যাক্টিভিটি কর্নার।

আর্ট হিলিং, গ্রাফিটি ওয়াল, ভিশন বোর্ড, জার্নালিং, ক্যারিকেচার, স্ক্রিন প্রিন্টিং থেকে শুরু করে ফেন্সিং, পোই স্পিনিং, অরিগামি, পেইন্টিং প্রতিটি কর্নারই যেন আলাদা এক অভিজ্ঞতা।
কেউ তুলির আঁচড়ে মনের কথা প্রকাশ করেছেন, কেউ বা লিখেছেন নিজের অপ্রকাশিত অনুভূতি। আবার কেউ শরীরচর্চার মাধ্যমে খুঁজেছেন মুক্তির পথ।


এই সেশন প্রমাণ করে সুস্থ থাকার কোনো একক উপায় নেই। প্রত্যেকের পথ আলাদা, আর সেই পথ খুঁজে পাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দিনের শেষ হয় ‘সিং অ্যালং’ সেশনের মধ্য দিয়ে, যেখানে ব্ল্যাক বাসের সুরে একত্রিত হয় শতাধিক কণ্ঠ। মুহূর্তেই অপরিচিত মানুষগুলো পরিণত হয় একে অপরের সঙ্গীতে জড়িয়ে থাকা এক কমিউনিটিতে।
সাজিয়া ওমর বলেন, “আজকের অংশগ্রহণই প্রমাণ করে, তরুণরা শুধু এই আলোচনা চায় না তারা এর জন্য প্রস্তুত। আমরা তাদের জানাতে চাই, তারা একা নয়।”
এই উৎসবের দ্বিতীয় দিনে থাকছে আর্থিক সচেতনতা, আসক্তি বিষয়ে আলোচনা এবং সমাপনী সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।

আয়োজকদের আশা, এই উদ্যোগ তরুণদের মানসিকভাবে আরও দৃঢ় হতে এবং ইতিবাচক জীবনধারা গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করবে। এই উৎসব শুধু একটি আয়োজন নয় এটি এক ধরনের আন্দোলন, যেখানে শেখানো হচ্ছে থামতে, ভাবতে এবং নিজের সঙ্গে নতুন করে সংযোগ স্থাপন করতে।
ছবি: হাল ফ্যাশন