
পশুর চামড়া যখন দক্ষ কারিগরের হাতে রূপ নেয়, তখন তা আর শুধু কাঁচামাল থাকে না; হয়ে ওঠে ব্যবহারিক পণ্য, নান্দনিকতা ও কারিগরি দক্ষতার সমন্বয়। সেই দেশীয় সম্ভাবনাকে সামনে রেখে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিসিক ভবনের নিচতলায় আয়োজন করা হয় ‘বিসিক চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য মেলা ২০২৬’। ১৬ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া পাঁচ দিনব্যাপী এ মেলা চলে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত। মেলা ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ মেলার মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রচার, বাজার সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ক্রেতাদের সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করা। মেলায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্যোক্তারা ব্যাগ, জুতা, স্যান্ডেল, বেল্ট, মানিব্যাগ, পার্স, জ্যাকেটসহ নানা ধরনের চামড়াজাত পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করেছে। মোট ৪৯টি স্টলের মধ্যে ৪৩টিতেই ছিল চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য।

মেলার চতুর্থ দিনে বৃষ্টি উপেক্ষা করেও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কেউ কিনছেন দৈনন্দিন ব্যবহারের মানিব্যাগ ও বেল্ট, কেউ পছন্দ করছেন ব্যাগ, জুতা কিংবা জ্যাকেট। ক্রেতাদের এই আগ্রহ উদ্যোক্তাদের মধ্যেও তৈরি করেছে নতুন আশাবাদ।
হাজারীবাগের উদ্যোক্তা মো. তাসনিম আলম শাহীন প্রায় দুই দশক ধরে চামড়াজাত পণ্যের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। লেদার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষে চাকরিতে না গিয়ে সরাসরি ব্যবসায় যুক্ত হন তিনি। বর্তমানে হাজারীবাগে তার শোরুম রয়েছে এবং ‘থ্রি টেক’ নামে লেদার গুডসের ব্যবসা পরিচালনা করছেন। বিসিকের এ মেলায় এবারই প্রথম অংশনেন তিনি।

মেলার অভিজ্ঞতা জানিয়ে শাহীন বলেন, প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি সাড়া পেয়েছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত টানা ক্রেতা আসেছেন, যা অন্যান্য মেলায় খুব একটা দেখা যায় না। মেলায় তার স্টলে প্রায় তিন লাখ টাকার বেশি বিক্রি হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শাহীন জানান, মেলার শুরুতে মানিব্যাগ, বেল্ট ও ব্যাগের চাহিদা বেশি থাকলেও পরে জ্যাকেট, স্যান্ডেল ও জুতার বিক্রিও বেড়েছে। একপর্যায়ে তার স্টকের প্রায় ৭০ শতাংশ পণ্য বিক্রি হয়ে যাওয়ায় নতুন করে পণ্য আনতে হয়।
মেলায় পণ্যের দামও রাখা হয় তুলনামূলকভাবে সাধ্যের মধ্যে। তার স্টলে মানিব্যাগের দাম ৪০০ থেকে ১ হাজার টাকা, বেল্ট ৫০০ থেকে ৯০০ টাকা, ব্যাগ ২ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা, জুতা ২ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা এবং নারীদের ব্যাগ ১ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকার মধ্যে বিক্রি হয়।

তবে মেলায় শুধু কেনাকাটাই নয়, দেশীয় চামড়ার মান নিয়েও আগ্রহ দেখা যায় ক্রেতা ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে। একই ধরনের দেখতে দুটি চামড়ার পণ্যের দামের পার্থক্যের পেছনে চামড়ার পুরুত্ব, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবহৃত রাসায়নিকের মতো বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ শুধু ‘চামড়া’ বললেই মানের পার্থক্য বোঝা যায় না; প্রক্রিয়াজাতকরণ ও গুণগত বৈশিষ্ট্যও পণ্যের মূল্য ও স্থায়িত্ব নির্ধারণ করে।

বিসিক চেয়ারম্যান বেনজীর আহমেদ বলেন, দেশের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের উন্নয়ন, উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ এবং ভোক্তাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরির লক্ষ্যেই এ আয়োজন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি বিসিক নকশা কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া উদ্যোক্তারাও এতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
চামড়া শিল্পের প্রসারে নিয়মিত এ ধরনের আয়োজনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন বিসিক চেয়ারম্যান। দেশীয় চামড়াকে কেবল কাঁচামাল হিসেবে না দেখে এর মাধ্যমে আরও বেশি মূল্য সংযোজন এবং তৈরি পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। উদ্যোক্তাদের জন্য এমন আয়োজন পণ্য প্রচার, ক্রেতার সঙ্গে পরিচিতি তৈরি এবং বাজার সম্পর্কে সরাসরি ধারণা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করে।

মেলায় অংশ নেওয়া উদ্যোক্তারাও বলেন, চামড়াজাত পণ্যের বাজারে প্রতিযোগিতা থাকলেও দেশীয় পণ্যের ক্রেতা রয়েছে। প্রয়োজন নিয়মিত প্রচার, মানোন্নয়ন ও বাজারের সঙ্গে উদ্যোক্তাদের আরও নিবিড় যোগাযোগ।

চামড়া বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্পখাত। কাঁচা চামড়া প্রক্রিয়াজাত করে জুতা, ব্যাগ, বেল্ট, জ্যাকেটসহ নানা উচ্চমূল্যের পণ্যে রূপান্তরের মাধ্যমে দেশীয় উদ্যোক্তারা এ খাতে মূল্য সংযোজন করছেন। আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ জনবল, আন্তর্জাতিক মান এবং পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব রয়েছে।

তাই তেজগাঁওয়ের এ মেলা শুধু কেনাবেচার আয়োজন ছিল না; দেশীয় চামড়াজাত পণ্যের সঙ্গে ক্রেতাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়ারও একটি সুযোগ। উদ্যোক্তাদের প্রত্যাশা, এমন আয়োজন নিয়মিত হলে দেশীয় পণ্যের পরিচিতি আরও বাড়বে এবং ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য তৈরি হবে নতুন বাজার।
ছবি: হাল ফ্যাশন