
অ্যানিমের পর্দার প্রিয় চরিত্রগুলো যদি বাস্তবের শহরে নেমে আসে, দৃশ্যটা কেমন হবে? বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে ঢুঁ মারলে মিলবে এর উত্তর। ভেতরে ঢুকতেই মন ভালো হয়ে যাওয়ার মতোই এক আবহ। জেন-জি, জেন-আলফা থেকে শুরু করে মিলেনিয়াল—জাপানি সংস্কৃতির অনুরাগী নানা বয়সের মানুষ এসেছেন এই আয়োজনে।
কারও সাজে ফুটে উঠেছে প্রিয় চরিত্রের ছাপ, কেউ আবার পুরোপুরি কসপ্লে করে হাজির। কারও হাতে অ্যানিমে চরিত্রের অ্যাকশন ফিগার, কেউ গেম খেলায় ব্যস্ত, আবার কোনো স্টল থেকে ভেসে আসছে জাপানি খাবারের ঘ্রাণ।

সব মিলিয়ে তরুণদের পদচারণায় মুখর এই আয়োজনজুড়ে যেন ফুটে উঠেছে জাপানি সংস্কৃতির এক টুকরো জগৎ। জাপান ও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বন্ধন আরও দৃঢ় করার পাশাপাশি জাপানি সংস্কৃতি, বিনোদন ও সৃজনশীলতার নানা দিক তুলে ধরাই ‘নিহন যাই ’-এর উদ্দেশ্য।
ভেন্যুতে ঢুকতেই মনে হলো, অ্যানিমের পর্দার চরিত্রগুলো যেন একে একে বাস্তবে চলে এসেছে আর সামনে হেঁটে বেড়াচ্ছে। একেকজনের লুক আরেকজন থেকে ভিন্ন।
কারও পোশাক, মেকআপ আর চুলের সাজে প্রিয় চরিত্রটির সঙ্গে হুবহু মিল; কারও সঙ্গে থাকা অনুষঙ্গেও প্রকাশ পেয়েছে সেই চরিত্রের ছাপ। প্রতিটি লুক দেখেই বোঝা যাচ্ছে, প্রিয় চরিত্র হয়ে ওঠার পেছনে ছিল যথেষ্ট প্রস্তুতি।
তবে এই আয়োজনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত অংশগুলোর একটি কসপ্লে। পছন্দের অ্যানিমে, মাঙ্গা কিংবা গেমের চরিত্রকে নিজের মধ্যে ধারণ করে হাজির হয়েছেন অনেকে।
ফ্রিরেন, ‘ঘোস্ট অব সুশিমা’, ডার্থ ভেডার, ‘দ্য প্রমিসড নেভারল্যান্ড’-এর এমা, ‘দ্য কিং অব ফাইটার্স’ গেমের জনপ্রিয় চরিত্র লিওনা হেইডার্ন, ‘ওয়ান পিস’-এর লুফি, গ্যাবান, গাচিয়াকুতার জানকা নিজিকু, ড্রাগন বল জি-এর গোকু, ‘ডেমন স্লেয়ার’-এর ইনোসুকেসহ জনপ্রিয় নানা চরিত্রের সাজে দেখা গেছে তাঁদের।
কারও সাজ ছিল চরিত্রের একেবারে নিখুঁত অনুকরণ, আবার কেউ নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে চরিত্রটিকে তুলে ধরেছেন নিজের মতো করে।
শুধু কসপ্লেতে অংশ নেওয়া প্রতিযোগীরাই নন, অনেক দর্শনার্থীও প্রিয় চরিত্র হয়ে ওঠার আনন্দেই বেছে নিয়েছেন এই সাজ। ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে পোজ দেওয়া থেকে শুরু করে চরিত্রের অঙ্গভঙ্গি ও আচরণ ফুটিয়ে তোলা—সব মিলিয়ে কসপ্লে এখানে শুধু পোশাক পরার বিষয় নয়, বরং পছন্দের একটি চরিত্রকে কিছু সময়ের জন্য নিজের করে নেওয়ার আনন্দ।
একক ও দলীয় কসপ্লের পাশাপাশি রয়েছে মাঙ্গা, ইলাস্ট্রেশন ও কারাওকে প্রতিযোগিতা। একক কসপ্লে প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্বে রয়েছেন বাংলাদেশের পপ-কালচার অঙ্গনের পরিচিত মুখেরা।
প্রতিযোগিতায় তাই শুধু পোশাক কতটা নিখুঁত, সেটিই নয়; চরিত্রটি কতটা সুন্দরভাবে তুলে ধরা হয়েছে, সৃজনশীলতা, পরিবেশন এবং পুরো সাজের পেছনে অংশগ্রহণকারীর শ্রম, সবকিছুকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনে বসেছে অনেকগুলো স্টল। জাপানি সংস্কৃতি ও পপ-কালচারের নানা অনুষঙ্গে সাজানো হয়েছে এখানে সবকিছু। কোথাও অ্যাকশন ফিগার, কাতানা, কিরিংস, পোস্টার ও বই, আবার কোনো স্টল সাজানো হয়েছে নানা ধরনের পোশাকে।
জাপানি কিমোনোর পাশাপাশি রয়েছে অ্যানিমে চরিত্রের প্রিন্ট করা টি-শার্টও। অ্যানিমে ও মাঙ্গার অনুরাগীদের জন্য এসব স্টল যেন পছন্দের জগতের একটি ছোট্ট অংশ আরও কাছে থেকে দেখার সুযোগ।
ওয়ান স্টপ মার্চেন্ডাইজ, কিয়ান’স কালেকটিবলস, অতিবেগুনী, পুরিনস হেভেনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নিয়ে এসেছে নানা ধরনের সংগ্রহ। বইপ্রেমী ও মাঙ্গা অনুরাগীদের জন্য আছে জাপানিজ চেইন বুকস্টোক কিনোকুনিয়া বাংলাদেশের বিশেষ স্টল।
পছন্দের চরিত্রের স্মারক খোঁজা, প্রিয় মাঙ্গা কেনা কিংবা সংগ্রহে নতুন কোনো অ্যাকশন ফিগার যোগ করা—স্টলগুলোতে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে এমন নানা সুযোগ। ফলে কেনাকাটার পাশাপাশি জাপানি পপ-কালচারের নানা অনুষঙ্গও কাছ থেকে দেখার সুযোগ মিলছে এখানে।
জাপানি সংস্কৃতির সঙ্গে গেমিংয়ের সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। সেই অভিজ্ঞতা নেওয়ারও সুযোগ আছে আয়োজনে। পোকেমন গো কিংবা বেব্লেড ব্যাটলে অংশ নিচ্ছেন অনেকেই। কেউ নিজের দক্ষতা যাচাই করছেন, আবার কেউ দাঁড়িয়ে উপভোগ করছেন অন্যের খেলা। শোগেন ক্ল্যাশ ও জেমস পিটের মতো গেমেও দেখা গেছে দর্শনার্থীদের আগ্রহ। কনসোল গেমিংয়ের আয়োজনেও জমেছে ভিড়। চলছে ‘স্ট্রিট ফাইটার সিক্স’-এর মতো জনপ্রিয় গেম।
জাপান দূতাবাসের আয়োজনে এই আয়োজনে রয়েছে বিশেষভাবে নির্বাচিত জাপানি চলচ্চিত্র প্রদর্শনীও।
শুধু দেখা বা কেনাকাটা নয়, জাপানি সংস্কৃতিকে হাতে-কলমে জানার সুযোগও রয়েছে এই উৎসবে। জাপানের ঐতিহ্যবাহী শিল্পের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ থাকছে। মাঙ্গা, ইকেবানা ও অরিগামি নিয়ে আয়োজন করা হয়েছে বিশেষ কর্মশালা। মাঙ্গা কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা জানতে পারবেন বিভিন্ন কৌশল ও গল্প বলার প্রক্রিয়া।
অন্যদিকে, ইকেবানা কর্মশালায় জাপানের ঐতিহ্যবাহী ফুল সাজানোর শিল্পের নান্দনিকতা ও এর দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ থাকছে। অরিগামি কর্মশালায় সাধারণ কাগজ ভাঁজ করে কীভাবে নানা আকৃতির শিল্পকর্ম তৈরি করা যায়, তা শেখাবেন বাংলাদেশে জাপান দূতাবাসের জনসংযোগ ও সাংস্কৃতিক বিশেষজ্ঞ কাজী বুশরা আহমেদ তিথি। কর্মশালাগুলোতে অংশগ্রহণের জন্য আলাদা কোনো ফি নেই। তবে প্রয়োজন উৎসবের বৈধ টিকিট ও আগে থেকে নিবন্ধন।
জাপানকে জানার আরেকটি সহজ পথ খাবার। ‘নিহন যাই’-এর খাবারের স্টলগুলোতেও তাই দেখা গেছে বেশ ভিড়।

চকোলেট মোচি, মাচা মোচি, সুশি, বিভিন্ন স্বাদের রামেন ও নিগিরির মতো নানা জাপানি খাবার আছে সেখানে। যাঁরা আগে থেকেই জাপানি খাবারের সঙ্গে পরিচিত, তাঁদের পাশাপাশি নতুন স্বাদ চেখে দেখতে আগ্রহী অনেককেও দেখা গেছে। অ্যানিমে কিংবা কসপ্লের প্রতি আগ্রহ না থাকলেও খাবারের টানেই কেউ কেউ ঘুরে দেখছেন এই অংশ। সব মিলিয়ে উৎসবের এই অংশে খাবারের স্বাদে জাপানকে একটু অন্যভাবে চেনার সুযোগ মিলছে।

বাংলাদেশে জাপানি সংস্কৃতির জনপ্রিয়তার পেছনে অ্যানিমে ও মাঙ্গার বড় ভূমিকা আছে। গত কয়েক বছরে জাপানি অ্যানিমেশন, চরিত্র ও গল্প তরুণদের বিনোদনের জগতে আরও বেশি জায়গা করে নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের কারণে সেই আগ্রহও ছড়িয়ে পড়ছে সহজে। কেউ অ্যানিমের গল্প ও চরিত্রে মুগ্ধ, কেউ মাঙ্গার পাতায় খুঁজে পান নিজের পছন্দের জগৎ। কেউ আবার প্রিয় চরিত্রের পোশাক তৈরি করে কসপ্লেতে অংশ নেন। জাপানি খাবার, গেমিং নিয়েও তৈরি হচ্ছে আগ্রহ।

এই আগ্রহ অবশ্য শুধু জাপানি সংস্কৃতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। কোরিয়ান কে-পপ, কোরিয়ান ড্রামা কিংবা বিশ্বের নানা দেশের পপ-কালচারের প্রতিও বাংলাদেশের তরুণদের আগ্রহ বাড়ছে। ফলে সংস্কৃতির প্রভাব এখন শুধু বই, সিনেমাতেই সীমাবদ্ধ নেই; পোশাক, সাজ, খাবার, গেমিং ও সৃজনশীলতার নানা ক্ষেত্রেও তার ছাপ দেখা যাচ্ছে। একসময় নির্দিষ্ট কিছু মানুষের শখ হিসেবে পরিচিত অ্যানিমে, মাঙ্গা বা কসপ্লে এখন অনেকের আগ্রহের অংশ। ‘নিহন যাই’-এর মতো আয়োজন সেই আগ্রহকে নিয়ে আসছে বাস্তবের পরিসরে। এখানে প্রিয় চরিত্রের মতো সাজা, মাঙ্গা নিয়ে কথা বলা, গেম খেলা কিংবা জাপানি খাবারের স্বাদ নেওয়ার মধ্য দিয়ে একই আগ্রহের মানুষদের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
এই আয়োজনে জাপানি চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, ক্যালিগ্রাফি, অরিগামি ও ইকেবানা কর্মশালা, একক ও দলীয় কসপ্লে, কারাওকে প্রতিযোগিতা এবং মাঙ্গা কর্মশালা—সবই রয়েছে। পাশাপাশি থাকছে বিজয়ীদের পুরস্কার ঘোষণা। জাপানি সংস্কৃতি, অ্যানিমে, মাঙ্গা ও কসপ্লেপ্রেমীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগও মিলছে এই আয়োজনে। তাই দেরি না করে শেষ দিনেও ঢুঁ মেরে আসতে পারেন । অনলাইনে কিংবা সরাসরি নিবন্ধন করে উপভোগ করা যাবে জাপানি সংস্কৃতির এই আয়োজন। চলবে সকাল ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত।
ছবি: হাল ফ্যাশন