দ্য কালার অ্যাটলাস অব বাংলাদেশ: বাংলাদেশের ঋতুভিত্তিক রঙের নতুন পাঠ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বাংলাদেশকে শুধু ছয় ঋতুর দেশ হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত ‘রঙের আর্কাইভ’ হিসেবে দেখার অভিনব উদ্যোগ নিয়ে সম্প্রতি রাজধানীর আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘দ্য কালার অ্যাটলাস অব বাংলাদেশ’ শিরোনামে ফ্যাশন প্রদর্শনী। তরুণ ও মেধাবী ফ্যাশন ডিজাইনার, শিক্ষাবিদ, টেক্সটাইল গবেষক এবং আরএপি ও ডিজাইন ইন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা ও সৃজনশীল পরিচালক রোকাইয়া আহমেদ পূর্ণার কিউরেশনে আয়োজিত কর্মশালার বাস্তব রূপ আসলে এই প্রদর্শনী। এখানে সংস্কৃতি, জলবায়ু, ঐতিহ্য ও সমকালীন ফ্যাশনচিন্তার মেলবন্ধনকেই তুলে ধরা হয়েছে।

সার্টিফিকেট বিতরণ
সার্টিফিকেট বিতরণ

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দো ঢাকার পরিচালক ফ্রাঁসোয়া শামব্রো, বাংলাদেশে ইউনেসকোর প্রতিনিধি সুসান ভাইজ এবং সিনিয়র ফ্যাশন ও লাইফস্টাইল সাংবাদিক ও হেরিটেজ টেক্সটাইল গবেষক শেখ সাইফুর রহমান।

বিজ্ঞাপন

প্রদর্শনীর মূল দর্শন বাংলাদেশের প্রতিটি ঋতু শুধু আবহাওয়ার পরিবর্তন নয়; বরং বহন করে স্বতন্ত্র রং, অনুভূতি, লোকজ ঐতিহ্য, খাদ্যসংস্কৃতি, ফুল, স্মৃতি, পোশাক এবং যাপনের ভাষা। সেই রঙের অভিধানকে সমকালীন ফ্যাশনের ভাষায় অনুবাদ করাই ছিল এ কর্মশালার লক্ষ্য।

বক্তব্য রাখছেন রোকাইয়া আহমেদ পূর্ণা
বক্তব্য রাখছেন রোকাইয়া আহমেদ পূর্ণা

রোকাইয়া আহমেদ পূর্ণা বলেন, বাংলাদেশের রংকে আমরা দীর্ঘদিন নান্দনিকতার চোখে দেখেছি। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে সমাজ, জলবায়ু, লোকজ সংস্কৃতি ও মানুষের স্মৃতির গভীর সম্পর্ক। এই কর্মশালার উদ্দেশ্য ছিল অংশগ্রহণকারীদের সেই সম্পর্ক গবেষণার মাধ্যমে আবিষ্কার করতে শেখানো এবং সেখান থেকে নতুন ডিজাইন ভাবনা তৈরি করা। তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে ডিজাইনের শুরু তখনই, যখন গবেষণা রঙে রূপ নেয়, রং ট্রেন্ডে পরিণত হয়, আর ট্রেন্ড ভবিষ্যতের ডিজাইনের গল্প বলে।’

বিজ্ঞাপন

প্রচলিত ফ্যাশন কর্মশালার বাইরে গিয়ে এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণাভিত্তিক ডিজাইন শিক্ষা কার্যক্রম। অংশগ্রহণকারীরা প্রথমে তাঁদের নির্বাচিত ঋতুকে কেন্দ্র করে গবেষণা করেন। প্রকৃতি, নদী, মাঠ, ফুল, উৎসব, লোকজ সংস্কৃতি, খাদ্য, স্থাপত্য, কারুশিল্প, আলোর পরিবর্তন এবং মানুষের জীবনযাত্রা বিশ্লেষণ করে তৈরি করেন গবেষণাপত্র। এরপর সেই গবেষণার ভিত্তিতে নির্মাণ করেন মুড বোর্ড, টেক্সচার, সিলুয়েট, কালার স্টোরি, রেঞ্জ প্ল্যান এবং চূড়ান্ত পোশাকের নকশা।

বাংলাদেশে ইউনেসকোর প্রতিনিধি সুসান ভাইজ
বাংলাদেশে ইউনেসকোর প্রতিনিধি সুসান ভাইজ

কর্মশালার অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীর নিজস্ব রং উদ্ভাবন। প্রচলিত লাল, সবুজ আর হলুদের পরিবর্তে তাঁরা বাংলাদেশের ঋতু ও সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি করেছেন নতুন নতুন রং। এর মধ্যে রয়েছে শ্যামলিমা গ্রিন, কাশ অফ-হোয়াইট, প্রিস্টিন হোয়াইট, টমটম আইভরি, পৌষ ভারমিলিয়ন, বাতাসা পার্ল, নকশি আর্থ, শর্ষে গোল্ড, কৃষ্ণচূড়া রেড, সাকুরা রোজ, ফিউচার ফিউশনসহ নানা রঙের ভাষা। প্রতিটি রঙের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে একটি ঋতু, একটি গল্প এবং একটি ডিজাইন ভাবনা।

প্রদর্শনীতে অংশ নেন মাইমুনা আঞ্জুম মম, মো. রনি, তাসনুভা তানজুম সূচি, সুশমিতা জাহান ন্যান্সি, নুসরাত শারমিন, জহুরা আলম রাফা, মো. নাহিদ রহমান, নুজহাত জাহান নুহা ও কানিজ ফাতেমা তিথি। তাঁদের প্রত্যেকে একটি করে ঋতু বা ঋতুভিত্তিক বিষয় নিয়ে গবেষণা করে নিজস্ব ভিজ্যুয়াল ভাষা নির্মাণ করেছেন। প্রদর্শনীতে তাঁদের গবেষণাপত্র, কালার প্যালেট, মুড বোর্ড, রেঞ্জ প্ল্যান এবং চূড়ান্ত পোশাক একসঙ্গে প্রদর্শিত হয়েছে।

এভাবেই সাজানো হয়েছে প্রত্যেকের সৃষ্টিকর্ম
এভাবেই সাজানো হয়েছে প্রত্যেকের সৃষ্টিকর্ম

প্রদর্শনীর সহকারী কিউরেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ঐশী জাহান মরিয়ম। অংশগ্রহণকারীদের গবেষণা, প্রদর্শনীর ভিজ্যুয়াল বিন্যাস এবং দর্শনার্থীদের জন্য সমন্বিত বর্ণনাভঙ্গি তৈরি করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ব্যক্তিগত গবেষণাগুলোকে একটি সম্মিলিত ‘কালার অ্যাটলাস’-এ রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য।

কিউরেটর রোকাইয়া আহমেদ পূর্ণার মতে, বাংলাদেশের ছয় ঋতু কেবল ক্যালেন্ডারের বিষয় নয়, এগুলো একটি ডিজাইন সিস্টেম। জলবায়ু, কৃষি, লোকজ উৎসব, ফুল, খাদ্যসংস্কৃতি, বস্ত্র এবং মানুষের জীবনযাপন মিলিয়ে প্রতিটি ঋতু একেকটি স্বতন্ত্র ডিজাইন ভাষা তৈরি করে। এই কর্মশালায় সেই ভাষাকেই গবেষণার মাধ্যমে সমকালীন ফ্যাশনের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সূচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের পরিচালক ফ্রাঁসোয়া শামব্রো
সূচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখছেন আলিয়ঁস ফ্রঁসেজের পরিচালক ফ্রাঁসোয়া শামব্রো
অতিথিদের সঙ্গে অংশগ্রহণকারীরা
অতিথিদের সঙ্গে অংশগ্রহণকারীরা

প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা শুধু পোশাক দেখছেন না; তাঁরা দেখছেন একটি ডিজাইন কীভাবে গবেষণা থেকে জন্ম নেয়। একটি ধারণা কীভাবে পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, রং, উপকরণ ও নকশার মধ্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ পণ্যে রূপান্তরিত হয়, তারও একটি পূর্ণাঙ্গ প্রক্রিয়া এখানে তুলে ধরা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে অতিথিরা এই আয়োজনের প্রশংসা করে বলেন, বাংলাদেশের রং, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যভিত্তিক গবেষণানির্ভর ফ্যাশনচর্চাকে আরও সমৃদ্ধ করবে। একই সঙ্গে এটি তরুণ ডিজাইনারদের সামনে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেবে, যেখানে ঐতিহ্য কেবল অনুকরণের বিষয় নয়; বরং গবেষণা, উদ্ভাবন ও সমকালীন ডিজাইনের অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠবে।

ছবি: ডিআইবি

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯: ০০
বিজ্ঞাপন