
পাড়া ও গ্যেটে ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের উদ্যোগে কড়াইল সিটি অব কালচারে আয়োজিত ‘মজা করি’ উৎসবের প্রথম পর্ব ছিল ৬ ও ৭ ডিসেম্বর। কড়াইলের এরশাদ মাঠে আয়োজিত এই আয়োজনে সাজানো হয়েছে সংস্কৃতি কেন্দ্র ‘মাচান’। এ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য হলো কড়াইলের জনগোষ্ঠীকে একটি বিস্তৃত মঞ্চ দেওয়া, যেখানে তাঁদের প্রতিভার বিকাশ ঘটবে।

প্রথম পর্বের দুদিনের এই আয়োজনে চিত্রকর্ম প্রদর্শনী, ইন্সটলেশন, ফটো এক্সিবিশনের পাশাপাশি ছিল নানা আলোচনা অনুষ্ঠান, কর্মশালা ও প্রতিযোগিতা। ৭ ডিসেম্বর অন্যান্য আয়োজনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ‘ডিজাইন শিক্ষা’বিষয়ক এক ঘণ্টার আলোচনা।
আলোচক হিসেবে ছিলেন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির ফ্যাশন ডিজাইন ডিপার্টমেন্টের প্রধান শর্মিলী সরকার, শান্ত–মারিয়ম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির সহকারী অধ্যাপক ফারহানা করিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সহকারী অধ্যাপক ও শিল্পী বিশ্বজিৎ গোস্বামী ও ফ্যাশন ডিজাইনার ফারজানা ইউসুফ। এই আলোচনায় সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন হাল ফ্যাশনের কনসালট্যান্ট শেখ সাইফুর রহমান।

এই আলোচকদের সবাই শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত। ক্ষেত্র আলাদা হলেও সবাই ডিজাইন শিক্ষা নিয়ে কাজ করেন। আর এই আলোচনার বিষয় ও শিরোনামও ছিল, ‘ডিজাইন শিক্ষা’। ফ্যাশনের আলোকে ডিজাইনারের ভূমিকা কিংবা চিত্রশিল্পীর আলোকে ভবিষ্যতের ডিজাইন কেমন হবে বা আমাদের ডিজাইনের শিক্ষাকে কীভাবে সময়োপযোগী ও ভবিষ্যৎকামী হবে, তা নিয়ে উপভোগ্য আলোচনা হয়। আলোচনায় মূল দুটি দিক নিয়ে বেশি আলোকপাত করা হয়। এক. আমাদের কারিকুলাম, যেটা ছাত্রদের আমরা কী শেখাচ্ছি এবং ভবিষ্যতে কী শেখাব। দুই. আমরা কীভাবে, কোন উপায়ে শেখাব। শিক্ষার ক্ষেত্রে এই দুটি বিষয়ই জরুরি।
আমাদের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে আসলে? একদিকে মেশিন ও প্রযুক্তি, অন্যদিকে হাতে তৈরি। একদিকে স্লো ফ্যাশন, অন্যদিকে ফাস্ট ফ্যাশন। এই নিয়ে আলোচনার শুরু করেন শর্মিলী সরকার। শিক্ষকতার দিক থেকে তিনি জানান, যাঁরা স্লো ফ্যাশন নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন, তাঁরা এটা নিয়েই কাজ করতে থাকবে। কিন্তু যাঁরা ফাস্ট ফ্যাশন পছন্দ করেন, তাঁদেরকে স্লো ফ্যাশনের দিকে আনাটা এত সহজ হবে না। যে যে পথে হাঁটতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবেন, তাঁকে সেই পথেই হাঁটতে দেওয়া উচিত।

আর আমরা যারা শিক্ষক হিসেবে আছি, আমাদের উচিত হবে তাদের অনুপ্রাণিত করে যাওয়া। টেক্সটাইল দিয়ে আমরা প্রকৃতির সব ধ্বংস করে ফেলছি। তাই টেকসই ফ্যাশন থেকে শুরু করে কতটা জিরো ওয়েস্টের দিকে যাওয়া যেতে পারে, সেটা আমরা চেষ্টা করছি ছাত্রদের শেখানো। শুধু ফ্যাশনের ছাত্রদের না, জনগণকেও এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে। ইকো ফ্রেন্ডলি লাইফস্টাইল হওয়াটা জরুরি। শুধু ফ্যাশন না, সব সেক্টরেই।
ডিজাইন এডুকেশনটা কোন পথে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ফারজানা ইউসুফ। তিনি বলেন, সকালে ঘুম থেকে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া অব্দি সবকিছুই কিন্তু ডিজাইনের আওতায় থাকে। ডিজাইন বলতে শুরুতে আমরা বুঝতাম শুধু সাবানের মোড়ক বানানো, বিজ্ঞাপন বানানো কিংবা গ্রাফিক ডিজাইন। এরপর সেটা হয়ে গেছে প্রোডাক্ট ডিজাইন। তারপর আসে ইন্টারেকশন ডিজাইন, যেন আমরা একটা অর্গানাইজেশন ডিজাইন করতে পারি, প্রোগ্রাম ডিজাইন করতে পারি কিংবা ইভেন্ট ডিজাইন করতে পারি। এখন আবার উচ্চতর লেভেলে এসেছে। আমরা একটা সোসাইটি থেকে শুরু করে কালচারাল প্রতিষ্ঠান ডিজাইন করতে পারি, সরকারের পলিসিও ডিজাইন করতে পারি।

আসলে আমাদের পুরো সোসাইটিটাকেই ডিজাইন করতে হবে। আইন থেকে শুরু করে কীভাবে একজন আরেকজনের সঙ্গে কথা বলব, ওঠাবসা করব, স্কুল-ইউনিভার্সিটি এই সমস্ত কিছুই কাউকে না কাউকে ডিজাইন করে বের করতে হয়েছে। ডিজাইন মানে হলো কোন একজিস্টিং অভিজ্ঞতাকে কীভাবে আরেকটু ভালো করতে পারি। এখান থেকেই ভালো আর খারাপ ডিজাইনের পার্থক্য বের করতে পারি আমরা। ডিজাইনটা সোসাইটির মানুষের আয়-ব্যয়, তাদের সামর্থ্য, লাইফস্টাইল ইত্যাদি সবকিছুর সঙ্গে মিল রেখে করতে হবে। এ ছাড়া ফ্যাশনের দিক থেকে বলতে গেলে, ডিজাইনার হিসেবে আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। সারা বিশ্বে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয় হচ্ছে। তাই সতর্ক থাকতে হবে একদম ব্যক্তি পর্যায় থেকেই।
একজন চিত্রশিল্পী আর শিক্ষকের জায়গা থেকে বিশ্বজিৎ গোস্বামী কীভাবে ডিজাইনকে দেখেন? উত্তরটা তিনি একটু অন্যভাবে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সে ক্ষেত্রে গাছ একটি সুন্দর উদাহরণ। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি একটা গাছকে দেখি, তাহলে দেখা যাবে কী সুন্দর নকশা আছে তাতে। সময়ের সঙ্গে পাতা হচ্ছে, ফুল-ফল হচ্ছে আবার পাতা ঝরছে। আমরা এমন একটা সময়ে আছি, যেখানে দাঁড়িয়ে এখন গাছের ভেতরটাও দেখা উচিত। অর্থাৎ গাছের শিকড়েও যে ডিজাইন আছে, সেটাও দেখা উচিত। ডিজাইন বলতে আমি বুঝি, ‘অদৃশ্য জায়গার খোঁজ করা’। ডিজাইনটাকে আমরা কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখব, সেটাও আসল। আমাদের টেকসই ডিজাইনের কথা ভাবতে হবে। প্রতিদিন আমরা কীভাবে কাটাচ্ছি, সেদিকে খেয়াল রাখার সময় এখন। সবকিছুই ডিজাইনের অংশ।

আলোচলার একপর্যায়ে ফারহানা করিমের কাছে প্রশ্ন করা হয়, ডিজাইন শিক্ষায় টেকনোলজির ইন্টিগ্রেশনটা কী হবে। এখন এআই এসেছে, নানা ধরনের টুলস আছে। সে ক্ষেত্রে প্রযুক্তি কি আমাদের বন্ধু হতে পারে নাকি বিরূপ কোনো প্রভাব ফেলবে? ফারহানা করিম বলেন, প্রযুক্তি অনেক বেশি জরুরি এই সময়ে। হাতে আঁকা ডিজাইনের চেয়ে প্রযুক্তি ব্যবহারে আরও কম সময় লাগে, সহজ হয় কাজটা। কিন্তু ডিজাইনের বিষয়টা আমার কাছে লাইফস্টাইলের মতো। প্রতিদিনের নানা কাজ কিংবা অবসর সময়েও আমরা ডিজাইনের রসদ পেতে পারি। প্রযুক্তির ব্যবহার বেশি করতে চায় স্টুডেন্টরা, কারণ কাজটা সহজ হয়। সেদিক থেকে ডিজিটাল প্রিন্ট অনেক এগিয়ে। তারা প্রিন্ট করে, ফেব্রিক ডেভেলপ করে ফেলতে পারে সহজেই। তবে ম্যানুয়ালি কাজটা করলে সময় বেশি লাগত ঠিকই কিন্তু সেটারও অনন্যতা ও স্থায়িত্ব অন্য রকম হতো। মেশিন স্টিচ না করে হাতে তৈরি করলেও কিন্তু হয়। তাহলে ছাত্ররা অন্তত হ্যান্ডলুম আর পাওয়ারলুমের পার্থক্যটা বুঝত।’
নানা ফিল্ড বা সেক্টরের ডিজাইন এডুকেশন নিয়ে এই আলোচনা চলতে থাকে। শর্মিলী সরকারকে প্রশ্ন করা হয়, একজন এডুকেটরের ভূমিকা কী হওয়া উচিত। উত্তরে তিনি জানান, ‘আমরা একজন ছাত্রকে শুধু ক্লাসের পড়াই শেখাই না, সেই সঙ্গে লাইফ স্কিলও শেখাই। যেন সে ডিজাইনটা ঠিক করতে পারে। সকাল থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত সে কতটা এথিকসের সঙ্গে চলবে, এটাও শেখাই একজন এডুকেটর হিসেবে। সময় জ্ঞান, ব্যবহার, পোশাক, অনুষঙ্গ সবকিছুর বিষয়েই আমরা তাঁদের পলিশ করতে থাকি। করপোরেট সেক্টরের জন্য প্রস্তুত করার পাশাপাশি তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ডেভেলপ করায় আমরা গাইড করি। যাতে সে যেকোনো জায়গায় মানিয়ে নিতে পারে।’

এডুকেটরের ভূমিকা কী ডিজাইন শিক্ষার ক্ষেত্রে? একই প্রশ্নের উত্তর দেন বিশ্বজিৎ গোস্বামী। জানান, ‘আমাদের কারিকুলামে আরও এক্সপেরিমেন্ট করার জায়গা আছে। একজন ছাত্রের ভেতরে কী আছে, এটাকে সে কীভাবে দেখতে পাচ্ছে সেটা জানা, তাকে একটু নাড়া দেওয়া বা সাহায্য করা আমাদের কাজ। সম্ভাবনা কি আছে আমাদের, এটাকে আমরা খুঁজে কাজ করতে পারি। একজন এডুকেটর হিসেবে আমাদের আরও খোলামেলা, উদার হতে হবে।’
আলোচনার এই পর্যায়ে ডেমোক্রেটাজাইজেশন অব ডিজাইন এডুকেশন নিয়ে কথা বলেন ফারজানা ইউসুফ। তিনি জানান, ‘আগে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা খুব শিক্ষকভিত্তিক ছিল। এখন সেটা পাল্টে ছাত্রকেন্দ্রিক শিক্ষার দিকে যাচ্ছে। এখন ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার ভবিষ্যৎটা সে কীভাবে বানাতে চায়, কোন দিকে যেতে চায়, একজন আর্টিস্ট বা ডিজাইনার হিসেবে তার দৃষ্টিভঙ্গি সে কীভাবে তৈরি করবে।

সে ক্ষেত্রে শিক্ষকদের ভূমিকা থাকবে, এটাই যেন আমরা সুন্দরভাবে গাইড করতে পারি তাদের। এডুকেশন সিস্টেমটাও এমনভাবে সাজাতে বা ডিজাইন করতে হবে।’
রেস্পন্সিবল ডিজাইন থেকে শুরু করে ইকো ফ্রেন্ডলি ও টেকসই ডিজাইন, প্রযুক্তি, সার্কুলারিটি, এডুকেশন সিস্টেম নানা দিক উঠে আসে এই এক ঘণ্টার আলোচনায়।
এসব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের দৃষ্টিকোণ থেকে, সোশ্যাল সিস্টেমের পরিবর্তনটকে আমরা কীভাবে দেখতে পারি। এই প্রশ্নে আলোচকদের দেওয়া উত্তর থেকে কয়েকটি মূল পয়েন্ট সাজানো যেতে পারে।
১। আমাদের সংস্কৃতির বিষয়কে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। ইকোনমি, ইকোলজি ও সোসাইটি—এই তিনটা পিলারকে ধরে আমরা টেকসই গোলের দিকে আগাতে পারি। তবে চতুর্থ পিলার হিসেবে কালচারটাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলে শিক্ষার ভিত আরও মজবুত হবে।
২. টেকসই বা সাসটেইনেবল প্র্যাকটিসটা আমাদের ঘর থেকেই হওয়া উচিত। জিরো ওয়েস্ট বিষয়টাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
৩. সবকিছুই আসলে আমাদের আছে। আমরা ভাবছি সেটা পুরোনো। কিন্তু সেটাকেই নতুন সাজে নিয়ে আসতে হবে এই সময়ে।
ছবি: হাল ফ্যাশন