
সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলেছে, বদলেছে সৌন্দর্যচর্চার অভ্যাসও। একসময় সাজগোজের পরিধি সীমিত ছিল পরিচিত প্রসাধনী ও সুগন্ধিতে। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ত্বক ও চুলের যত্ন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, সৌন্দর্যচর্চার প্রযুক্তি, গবেষণা ও উৎপাদনব্যবস্থা। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে বড় একটি শিল্প।

বদলে যাওয়া এই সৌন্দর্যজগতেরই একটি প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল ‘কসমেটিকা ঢাকা ২০২৬’।
রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার নবরাত্রি হলে ৩ থেকে ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক এই প্রদর্শনীর দ্বিতীয় আসর। তিন দিনের আয়োজনে ছিল দেশি–বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্য প্রদর্শন, পণ্য ব্যবহারের সরাসরি আয়োজন, সৌন্দর্য পরামর্শ, বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা, ফ্যাশন শো, তারকাদের উপস্থিতি ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরির সুযোগ।
ফলে কসমেটিকা ঢাকা শুধু সৌন্দর্যপণ্যের প্রদর্শনীতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বাংলাদেশের সৌন্দর্যশিল্পের বর্তমান অবস্থা ও সম্ভাবনার কিছু দিক সামনে এনেছে।
প্রদর্শনীতে ঢুকতেই বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সাজানো স্টল ও প্যাভিলিয়ন নজরে পড়েছে। কোথাও ত্বকের যত্নের পণ্য, কোথাও চুলের পরিচর্যার সামগ্রী, আবার কোথাও সুগন্ধি ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য।
দর্শনার্থীদের কেউ এসেছেন নতুন পণ্য দেখতে, কেউ পণ্যের ব্যবহার সম্পর্কে জানতে, আবার কেউ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা খুঁজতে।

আয়োজনটির একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল অনেক স্টলেই শুধু পণ্য প্রদর্শন নয়, তার ব্যবহার, উপযোগিতা ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ। লাইভ প্রদর্শনী ও সৌন্দর্য পরামর্শের অংশও দর্শনার্থীদের আগ্রহ তৈরি করেছে।
ফলে প্রদর্শনীটি শুধু পণ্য দেখার জায়গা না হয়ে পণ্য সম্পর্কে জানার ও সরাসরি অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগও তৈরি করেছে।

কসমেটিকা ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি ছিল প্রসাধনী তৈরির পেছনের পুরো প্রক্রিয়ার কিছুটা তুলে ধরা।
আগ্রহী যাঁরা দেশে প্রসাধনী তৈরির ব্যবসা শুরু করতে চান, তাঁদের জন্য কাঁচামাল, বোতল, ঢাকনা, স্প্রে, প্যাকেজিংসহ বিভিন্ন উপকরণের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ছিল।

একটি সিরামের বোতল বা সুগন্ধির প্যাকেট ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগে কাঁচামাল নির্বাচন, ফর্মুলেশন, মান পরীক্ষা, প্যাকেজিং ও সরবরাহব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। প্রদর্শনীতে এসব ধাপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর উপস্থিতি সৌন্দর্যপণ্যের শিল্পভিত্তিক কাঠামোটিও সামনে এনেছে।

এবারের কসমেটিকা ঢাকায় বাংলাদেশ ছাড়া কোরিয়া, থাইল্যান্ড, ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, সিঙ্গাপুর, চীন, জাপান, হংকংসহ মোট ১৬টি দেশের প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়।
বাংলাদেশসহ ৫৮টি কোম্পানি ও ১৩২টি ব্র্যান্ডের উপস্থিতিতে প্রদর্শনীতে ছিল পণ্যের বৈচিত্র্য। স্কিনও, ইমেই আই, ক্যাথি ডল, কে–মার্ট বাংলাদেশ, ড্রিমক্যাস, ক্যামিহাউস, স্কিনঅক্সি, গ্যাটসবি, আইএই কসমেটিকস, হারলান, অসাম, ফগ, রিয়েল ম্যান ও অর্গানিকাওনের মতো ব্র্যান্ডের স্টলে দর্শনার্থীদের আগ্রহ দেখা গেছে।

অন্যদিকে কেম কানেক্ট বিডি, ডিভাইন পিএইচসি, আইএমসিডি, ইনজিনিয়াস রিসোর্সেস এবং সাশিরোম ফ্র্যাগরেন্সেস অ্যান্ড ফ্লেভার্সের মতো প্রতিষ্ঠান কাঁচামাল, সুগন্ধি ও শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমাধান তুলে ধরেছে।

ফলে সাধারণ দর্শনার্থীরা যেমন নতুন পণ্যের সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন, তেমনি উদ্যোক্তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী ও প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগও তৈরি হয়েছে।

প্রদর্শনীর শেষ দিনের ভিড়েও বাংলাদেশের সৌন্দর্যচর্চার পরিবর্তনের কিছুটা চিত্র পাওয়া গেছে।
বিশেষ করে ত্বকের যত্ন ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্যের স্টলগুলোয় তরুণ–তরুণীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। তাঁদের আগ্রহ শুধু পণ্যের ব্র্যান্ড বা প্যাকেজিংয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না। পণ্যের উপাদান, ব্যবহারবিধি ও ত্বকের ধরন অনুযায়ী উপযোগিতা নিয়েও ছিল নানা প্রশ্ন।

সানস্ক্রিন, সিরাম, কার্যকর উপাদান, ত্বকের আর্দ্রতা, ত্বকের সুরক্ষা, বয়সের ছাপ কমানোর পরিচর্যা এবং চুল ও শরীরের যত্নের মতো নির্দিষ্ট বিভাগে আগ্রহও দেখা গেছে।

এতে বোঝা যায়, সৌন্দর্যপণ্যের ক্রেতাদের আগ্রহ ধীরে ধীরে শুধু ব্র্যান্ডকেন্দ্রিকতা থেকে পণ্যের উপাদান, কার্যকারিতা ও নিরাপত্তার দিকে যাচ্ছে।

কসমেটিকা ঢাকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ব্যবসায়িক যোগাযোগের সুযোগ।
একই জায়গায় ছিলেন উদ্যোক্তা, প্রস্তুতকারক, আমদানিকারক, পরিবেশক, খুচরা ব্যবসায়ী, কাঁচামাল সরবরাহকারী ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।

একজন সাধারণ দর্শনার্থীর কাছে এটি নতুন প্রসাধনী দেখার জায়গা হলেও একজন উদ্যোক্তার জন্য একই আয়োজন হতে পারে কাঁচামাল সরবরাহকারী খোঁজা, সম্ভাব্য ব্যবসায়িক অংশীদারের সঙ্গে পরিচিত হওয়া কিংবা নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্র।এই ব্যবসায়িক সংযোগের জায়গাটিই কসমেটিকা ঢাকার পরিধিকে সাধারণ পণ্য প্রদর্শনীর বাইরে নিয়ে গেছে।
প্রদর্শনীর গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ছিল স্থানীয় উৎপাদনের সক্ষমতা।
রিমার্ক হারলান গ্রুপের প্যাভিলিয়নে বাংলাদেশে উৎপাদিত বিভিন্ন প্রসাধনী ও ত্বকের যত্নের পণ্য প্রদর্শন করা হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদন প্রযুক্তি ও মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়ও তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য স্থানীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। দেশের সৌন্দর্যপণ্যের বাজার দীর্ঘদিন ধরে আমদানিনির্ভরতার সঙ্গে পরিচিত। স্থানীয় উৎপাদন বাড়লে সেই নির্ভরতা কমানোর পাশাপাশি দেশে কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে।
এরপরের ধাপ হতে পারে ফর্মুলেশন, গবেষণা ও পণ্য উন্নয়নের সক্ষমতা তৈরি করা এবং স্থানীয় ব্র্যান্ডকে আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রস্তুত করা।

কসমেটিকা ঢাকার আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন ছিল—বাংলাদেশ কি শুধু প্রসাধনীর বড় বাজার হয়ে থাকবে, নাকি উৎপাদন ও রপ্তানির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারবে?
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম কসমেটিকস ও ব্যক্তিগত পরিচর্যাশিল্পকে আমদানিনির্ভর বাজার হিসেবে না দেখে উৎপাদন, রপ্তানি ও দেশি–বিদেশি বিনিয়োগের সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
দেশের পোশাকশিল্পে তৈরি উৎপাদন সক্ষমতা, দক্ষ জনবল, মান নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক বাজারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কসমেটিকস শিল্পেও চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন, ফর্মুলেশন, বিশেষায়িত প্যাকেজিং, গবেষণাগার ও আন্তর্জাতিক সনদের অবকাঠামো গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
একই সঙ্গে দেশের কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে মানসম্পন্ন ভেষজ ও উদ্ভিজ্জ উপাদানের সরবরাহব্যবস্থা তৈরি করা গেলে স্থানীয় শিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ লক্ষ্য শুধু ‘বাংলাদেশে তৈরি’ পণ্য নয়; গবেষণা, ফর্মুলেশন, পণ্য উন্নয়ন ও নিজস্ব ব্র্যান্ড তৈরির সক্ষমতাও দেশে গড়ে তোলার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের সৌন্দর্যপণ্যের বাজারে স্থানীয় ব্র্যান্ডের উপস্থিতি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ছে, প্যাকেজিংয়ে পরিবর্তন আসছে এবং উৎপাদনে আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত হচ্ছে। তবে চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি, নিরাপদ কাঁচামাল ব্যবহার, আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখা, গবেষণায় বিনিয়োগ ও পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা—সবকিছুকে একসঙ্গে গুরুত্ব দিতে হবে।
কারণ, বাজার বড় হওয়াই যথেষ্ট নয়; দীর্ঘ মেয়াদে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন পণ্যের মান ও ভোক্তার আস্থা।
ব্যবসা ও শিল্পের আলোচনার পাশাপাশি কসমেটিকা ঢাকায় ছিল বিনোদনের আয়োজন।দ্বিতীয় দিনে অভিনেত্রী সাবিলা নূর, শবনব ফারিয়া, আইসা খান, নাজিফা তুষি, প্রভা, কেয়া পায়েল, সামিয়া অথৈসহ কয়েকজন তারকার উপস্থিতি দর্শনার্থীদের মধ্যে বাড়তি আগ্রহ তৈরি করে। প্রথম দিনেও মডেল ও অভিনেত্রী অথৈয়ের উপস্থিতি ছিল আকর্ষণের অন্যতম কারণ।
তারকাদের উপস্থিতি প্রদর্শনীতে বাড়তি উচ্ছ্বাস তৈরি করলেও আয়োজনটির মূল গুরুত্ব ছিল সৌন্দর্যপণ্যের বাজার ও শিল্পের বিভিন্ন দিককে একই পরিসরে তুলে ধরা।

তিন দিনের আয়োজনের শেষ দিনেও দর্শনার্থীদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। একদিকে নতুন সৌন্দর্যপণ্য নিয়ে মানুষের আগ্রহ, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের মধ্যে যোগাযোগ তৈরির চেষ্টা। কোথাও চলছে পণ্যের সরাসরি ব্যবহার দেখানো, কোথাও উপাদান নিয়ে আলোচনা, আবার কোথাও ভবিষ্যৎ ব্যবসা নিয়ে কথাবার্তা।
এই বৈচিত্র্য কসমেটিকা ঢাকাকে কেবল একটি পণ্য প্রদর্শনী হিসেবে দেখার সুযোগ দেয় না; বরং সৌন্দর্যশিল্পের সঙ্গে কাঁচামাল, গবেষণা, প্রযুক্তি, উৎপাদন, মান নিয়ন্ত্রণ, প্যাকেজিং, সরবরাহব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মতো বিষয়ও যুক্ত। ফলে এই শিল্পের বিকাশের প্রশ্নটি শুধু নতুন প্রসাধনী বাজারে আনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
তিন দিন শেষে কসমেটিকা ঢাকা ২০২৬ থেকে পাওয়া বড় উপলব্ধিগুলোর একটি হলো—সৌন্দর্য এখন আর শুধু ব্যক্তিগত সাজসজ্জার বিষয় নয়। এর পেছনে রয়েছে বড় একটি বাজার ও বিস্তৃত শিল্পকাঠামো।
কেউ এখানে নিজের ত্বকের জন্য নতুন পণ্য খুঁজেছেন, কেউ পছন্দের সুগন্ধি বা মেকআপ। কোনো উদ্যোক্তা হয়তো খুঁজেছেন কাঁচামাল, প্যাকেজিং কিংবা সম্ভাব্য ব্যবসায়িক সহযোগী।

এই ভিন্ন ভিন্ন আগ্রহের সমন্বয়েই তৈরি হচ্ছে সৌন্দর্যশিল্পের বৃহত্তর চিত্র।
১৬ দেশের ৫৮টি কোম্পানি ও ১৩২টি ব্র্যান্ডের অংশগ্রহণে কসমেটিকা ঢাকা ২০২৬ বাংলাদেশের সৌন্দর্যপণ্যের বাজারের বিস্তৃতি যেমন দেখিয়েছে, তেমনি স্থানীয় উৎপাদন, প্রযুক্তি, গবেষণা, বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সম্ভাবনাও সামনে এনেছে।

তিন দিনের আয়োজন শেষ হয়েছে। তবে প্রদর্শনীতে তৈরি হওয়া ব্যবসায়িক যোগাযোগ, নতুন ধারণা ও সম্ভাব্য অংশীদারত্বের ফলাফল কতটা বাস্তবে রূপ নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
কসমেটিকা ঢাকা ২০২৬–এর গুরুত্ব তাই শুধু প্রদর্শনীতে নয়; বাংলাদেশের সৌন্দর্যশিল্প কতটা সংগঠিত, প্রতিযোগিতামূলক ও রপ্তানিমুখী হয়ে উঠতে পারে, তার একটি প্রাথমিক ইঙ্গিত হিসেবেও আয়োজনটিকে দেখা যায়।
ছবি: হাল ফ্যাশন