রিভাইভ মিরপুর কাতান, রিভাইভ কালচার: কাতানবয়ন বাঁচাতে বিইউপির দুই শিক্ষার্থীর উদ্যোগ
শেয়ার করুন
ফলো করুন

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘রিভাইভ মিরপুর কাতান, রিভাইভ কালচার’ শীর্ষক সেমিনার। মিরপুরের কাতান বয়নশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে আয়োজিত এই সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন কাতান বয়নশিল্পী, বয়ন–বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গণমাধ্যমকর্মীরা।

অনুষ্ঠান শেষে অতিথিদের সঙ্গে শিলচি (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) ও ফাহা (সর্বডানে)
অনুষ্ঠান শেষে অতিথিদের সঙ্গে শিলচি (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) ও ফাহা (সর্বডানে)

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশানালাসের (বিইউপি) গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন প্রথম আলো হাল ফ্যাশনের পরামর্শক ও হেরিটেজ টেক্সটাইল বিশেষজ্ঞ শেখ সাইফুর রহমান। অনুষ্ঠানে অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চিফ প্ল্যানিং অফিসার মো. আইয়ুব আলী, বিইউএফটির ফ্যাশন স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শর্মিলী সরকার, স্থপতি ও ডিজাইনার তন্বী কবির ও কাতান বয়নশিল্পী মোহাম্মদ রফিক।

বিজ্ঞাপন

৩০ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার বিইউপির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী জাহানুর রশিদ ফাহা ও শিলচি দালবতের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের গবেষণা প্রকল্প উপস্থাপনার জন্য এই সেমিনারের আয়োজন করা হয়। উভয়ই মিরপুরের কাতান শাড়ির পুনরুজ্জীবনকে গুরুত্ব দিয়ে এই গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা করেন। এই প্রকল্পে মেন্টরের দায়িত্ব পালন করেন শেখ সাইফুর রহমান।

অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য
অনুষ্ঠানে উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য

অনুষ্ঠানের শুরুতে ফাহা ও শিলচি তাঁদের গবেষণার তথ্য–উপাত্ত উপস্থাপন করেন। এর পর স্বাগত বক্তব্যে এই বিষয়ের প্রশংসা করেন বিইউপির গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মালিহা তাবাসসুম। তিনি বলেন, ‘কাতান শুধু কাপড় নয়, আমাদের জীবনের অংশ। আমাদের ঐতিহ্য নিয়ে সচেতনতা তৈরি না হলে এটি হারিয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিশেষ ভূমিকা রাখতে হবে।’

বিজ্ঞাপন

আলোচনায় বক্তারা বাংলাদেশের বয়নশিল্পের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিভিন্ন প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। বিশেষত কাতান বয়নশিল্পী মো. রফিক হারিয়ে যাওয়া কাতান বয়নশিল্পকে বাঁচাতে তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। তিনি বাংলাদেশের বয়নশিল্প নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আরও গবেষণা করার তাগিদ দেন।

মালিহা তাবাসসুম, শর্মিলী সরকা ও মো, রফিক
মালিহা তাবাসসুম, শর্মিলী সরকা ও মো, রফিক

মো. আইয়ুব আলী বলেন, ‘আমাদের দেশে যুগে যুগে বিভিন্ন দেশ থেকে বয়নশিল্পী এসেছেন। এর মূল পৃষ্ঠপোষকতা করেন মোগলরা। এই বয়নশিল্প আমাদের ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।’ তিনি বিশেষভাবে উল্লেখ করে বলেন, কেবল শাড়ি আর লুঙ্গি দিয়ে শিল্প হয় না। এ ক্ষেত্রে পণ্যের বহুমুখীকরণ দরকার।

জামদানি বয়নশিল্পী মোমিনুর রহমান শাহীনও বাংলাদেশের বয়নশিল্পকে টিকিয়ে রাখার জন্য সবাইকে আহ্বান জানান।

আইয়ুব আলী (বাঁয়ে) ও মো. মোমিনুর রহমান
আইয়ুব আলী (বাঁয়ে) ও মো. মোমিনুর রহমান

এসব শিল্পীর গল্প দেশবাসীর কাছে তুলে ধরতে মো. আইয়ুব আলী গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীদের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশি পণ্য বিভিন্ন স্থানে বিদেশি নামে বিক্রি হচ্ছে, সে বিষয়ে সচেতনতামূলক উদ্যোগ নেওয়া দরকার।

শর্মিলী সরকার বলেন, আমাদের দেশের টেক্সটাইলকে আরও ছড়িয়ে দিতে হবে। সচেততনতা সৃষ্টির পাশাপাশি ডিজাইনার ও বয়নশিল্পীদের একসঙ্গে কাজ করার কথা বলেন শর্মিলী সরকার। এ দেশের ছাত্রছাত্রীদের টেক্সটাইলের জ্ঞানকে ব্র্যান্ডিংয়ে রূপান্তরের আগ্রহ বেশি দেখা যায় বলে মন্তব্য করে তিনি শুধু বিদেশ থেকে স্যাম্পল পণ্য এনে তা ডেভেলপ না করে নিজেদের ঐতিহ্যের সঙ্গে মিশিয়ে নতুন কিছু তৈরি করার আহ্বান জানান।

তন্বী কবির ও শেখ সাইফুর রহমান
তন্বী কবির ও শেখ সাইফুর রহমান

স্থাপত্যবিদ ও ডিজাইনার তন্বী কবির চমৎকার পাওয়ারপয়েন্ট প্রেজেন্টেশনে তুলে ধরেন বেনারসি ও কাতান নিয়ে কাজ করার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, ‘একসময় পোশাকশিল্পের সব কাঁচামাল ছিল আমাদের দেশেই উৎপাদিত। কিন্তু একসময় চীনা কম দামি সুতা আমাদের দেশে প্রবেশ করে শিল্প নষ্ট করে দেয়। একসময় হাতের দক্ষতা ও মেধার সম্মিলন ছিল এ শিল্পে। কিন্তু আধুনিক মেশিন আসার ফলে অনেক শিল্পীই বেকার হয়ে যায়।’ তিনি বলেন, পাওয়ারলুমে শাড়ি পাওয়া যাবে তবে শিল্প পাওয়া যাবে না।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিভাগের চেয়ারম্যান লে. কর্নেল মাহমুদ হাসান তারিক, পিপিএম, পিপিএমএস, পিএসসি, আর্টি।

এই সেমিনার পরিচালনা করেন প্রথম আলোর হাল ফ্যাশনের পরামর্শক শেখ সাইফুর রহমান। বিভিন্ন সময় তিনি মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী তাঁতের ইতিহাসসহ বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আসন্ন বিয়ের মৌসুমে সবাই মিলে যদি বাংলাদেশি শাড়ি কেনে তবে সেটা হতে পারে দারুণ ইতিবাচক পরিবর্তন। তিনি সবাইকে মিরপুর কাতান বাঁচাতে ফাহা ও শিলচির এই নীরব আন্দোলনে অংশ নিতে অনুরোধ জানান।

সবশেষে ‘রিভাইভ মিরপুর কাতান, রিভাইভ কালচার’ গবেষণা প্রকল্পের দুই শিক্ষার্থী জাহানুর রশিদ ফাহা ও শিলচি দালবত সবাইকে ধন্যবাদ জানান এবং সবাইকে দেশীয় পণ্য কিনে দেশীয় বয়নসংস্কৃতিকে বাঁচানোর আহ্বান জানান।
ছবি: হাল ফ্যাশন ও বিউপি

প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর ২০২৫, ১৯: ৩৩
বিজ্ঞাপন