
প্রাচীন লিডিয়া থেকে স্বাধীন বাংলাদেশ—মুদ্রা ও নোটের ইতিহাস, নকশা আর সভ্যতার গল্প নিয়ে ঢাকার মাইডাস সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ নিউমিসম্যাটিক কালেক্টরস সোসাইটির ষষ্ঠ মুদ্রা প্রদর্শনী ২০২৬। এখানে প্রদর্শিত হয়েছে ৪৩ জন সংগ্রাহকের ৬১টি বিষয়ভিত্তিক সংগ্রহ।
একটি ছোট্ট মুদ্রা হাতে নিলে চোখে পড়ে তাতে খোদাই করা কোনো শাসকের মুখচ্ছবি, প্রতীক কিংবা সাল। কিন্তু সেই মুদ্রার পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে একটি সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, হারিয়ে যাওয়া কোনো জনপদের পরিচয়, বাণিজ্যের বিস্তার কিংবা একটি সময়ের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস।

বিশ্বের বিভিন্ন সভ্যতায় মুদ্রার উদ্ভব, বিনিময়ব্যবস্থার পরিবর্তন এবং মুদ্রার নকশা ও ব্যবহারের বিবর্তন নিয়ে গবেষণা ও সংগ্রহের চর্চাই নিউমিসম্যাটিক বা মুদ্রাতত্ত্ব। এর পরিধি শুধু মুদ্রা সংগ্রহে সীমাবদ্ধ নয়; কাগুজে নোট, পদক, স্মারক মুদ্রা এবং অর্থ বিনিময়ের সঙ্গে সম্পর্কিত নানা নিদর্শনও এর অন্তর্ভুক্ত।
এই বৈশ্বিক ইতিহাসের নানা অধ্যায় এক ছাদের নিচে তুলে ধরেছে বাংলাদেশ নিউমিসম্যাটিক কালেক্টরস সোসাইটির ষষ্ঠ মুদ্রা প্রদর্শনী ২০২৬। প্রাচীন লিডিয়ার মুদ্রা থেকে শুরু করে বাংলার সুলতানি আমল, মোগল শাসন, ব্রিটিশ ভারত, পাকিস্তান পর্ব এবং স্বাধীন বাংলাদেশের মুদ্রা—সংগ্রাহকদের ব্যক্তিগত সংগ্রহে উঠে এসেছে সময় ও সভ্যতার দীর্ঘ যাত্রা।

৪৩ জন সংগ্রাহকের ৬১টি বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা দেখতে পাচ্ছেন মুদ্রা ও নোটের বিচিত্র ইতিহাস, নকশা, উপাদান ও ব্যবহার। এবারের আয়োজনের বিশেষ সংযোজন উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রথমবারের মতো প্রকাশিত মুদ্রাবিষয়ক গবেষণাধর্মী জার্নাল ‘বিএনসিএস জার্নাল’। মুদ্রা সংগ্রহের পাশাপাশি এ বিষয়ে গবেষণা, তথ্য সংরক্ষণ ও জ্ঞানচর্চাকে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি সংগঠনটির নতুন উদ্যোগ।
প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ সুদীপ্ত পালের সংগ্রহ ‘লিডিয়া টু জাহাঙ্গীরনগর’। প্রাচীন লিডিয়ার মুদ্রা থেকে শুরু করে এই অঞ্চলের মুদ্রার বিবর্তন তিনি সাজিয়েছেন ধারাবাহিকভাবে। প্রায় আড়াই হাজার বছরের উপমহাদেশীয় মুদ্রার ইতিহাসে উঠে এসেছে গান্ধার, মগধ, বঙ্গ, সমতট, মৌর্য, কুষাণ, গুপ্ত, দিল্লি সালতানাত, বাংলার সুলতানি আমল, মোগল শাসন, ব্রিটিশ সাম্রাজ্য, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ পর্ব। একই সঙ্গে তুলে ধরেছেন ঢাকার নামের ইতিহাস—ঢাকা থেকে জাহাঙ্গীরনগর, আবার জাহাঙ্গীরনগর থেকে ঢাকা হয়ে ওঠার সময়কাল। বিভিন্ন শাসকের আমল ও মুদ্রার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সাজানো এই সংগ্রহ দর্শনার্থীদের সামনে ইতিহাসের একটি ধারাবাহিক চিত্র তুলে ধরে।


সুদীপ্ত পাল জানান, পুরোনো জিনিসের প্রতি আগ্রহ থেকেই তাঁর মুদ্রা সংগ্রহের শুরু। সময়ের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে অন্য সংগ্রাহকদের সঙ্গে। তাঁদের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময় ও ভাবনার আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে তাঁর সংগ্রহ। কোনো একটি মুদ্রা সংগ্রহে যুক্ত হওয়ার পর সেটির উৎস, সময়কাল ও প্রেক্ষাপট জানার আগ্রহ তৈরি হয়। সেই অনুসন্ধানই ধীরে ধীরে সংগ্রহকে জ্ঞানচর্চার আনন্দময় অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।
প্রদর্শনীর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক উদ্যোগ। বাংলাদেশ নিউমিসম্যাটিক কালেক্টরস সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক এন এম আমিন জানান, দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা মুদ্রা সংগ্রাহকদের এক জায়গায় আনার প্রয়োজন থেকেই ২০০৮ সালে সংগঠনটির যাত্রা শুরু। তখন অনেক সংগ্রাহক ব্যক্তিগতভাবে মুদ্রা ও বিদেশি নোট সংগ্রহ করতেন। কিন্তু বিদেশ থেকে এসব সংগ্রহ করতে ডাক ও শুল্কসংক্রান্ত নানা জটিলতার মুখোমুখি হতে হতো। সংগ্রাহকদের জন্য একটি স্বীকৃত প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং বৈধভাবে সংগ্রহের চর্চা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই সংগঠনটি গড়ে তোলা হয়। ২০০৯ সালে সরকারি নিবন্ধন পাওয়ার পর থেকে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনা করছে সংগঠনটি।

এবারের আয়োজনসহ এ পর্যন্ত ছয়টি প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে তারা।
সংগঠনটির সদস্য হতে হলে আগ্রহী ব্যক্তিকে একজন সক্রিয় সদস্যের সুপারিশ নিতে হয়। এরপর নির্বাহী কমিটি যাচাই-বাছাই করে সদস্যপদ অনুমোদন করে। নিয়মিত সভায় সদস্যরা নিজেদের সংগ্রহের মুদ্রা বিনিময় করেন, নিলামের আয়োজন করেন এবং সংগ্রহের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। পাশাপাশি প্রতিবছর ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান পরিদর্শনের আয়োজন করা হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মুদ্রা সংগ্রহের ইতিহাস ও গুরুত্ব সম্পর্কে জানাতে বক্তৃতা ও আলোচনার উদ্যোগও রয়েছে।
এন এম আমিন মনে করেন, মুদ্রা সংগ্রহ কেবল শখের বিষয় নয়; এটি ইতিহাস জানার একটি কার্যকর মাধ্যম। কোনো দেশের শাসক পরিবর্তনের পর নতুন মুদ্রা প্রচলনের মাধ্যমে অনেক সময় নিজের শাসন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করতেন। মুদ্রায় থাকা শাসকের নাম, সাল, লিপি ও প্রতীক থেকে সেই সময়ের শাসনব্যবস্থা, ধর্মীয় বিশ্বাস, অর্থনীতি এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। কোনো কোনো মুদ্রা এমন জনপদ বা রাজ্যের অস্তিত্বের প্রমাণ দেয়, যাদের সম্পর্কে লিখিত ইতিহাসে তথ্য খুবই সীমিত। তরুণদের অতিরিক্ত মুঠোফোন ও কম্পিউটারনির্ভরতা, মাদক কিংবা কিশোর অপরাধের মতো নেতিবাচক প্রবণতা থেকে দূরে রেখে জ্ঞাননির্ভর শখের সঙ্গে যুক্ত করাও সংগঠনটির অন্যতম লক্ষ্য।

প্রদর্শনীতে মুদ্রার পাশাপাশি নোটের ইতিহাসও পেয়েছে আলাদা গুরুত্ব। শামসুল আলমের ‘জার্নি অব ওয়ান রুপি/টাকা ফ্রম ১৯১৭–১৯৯৩’ শিরোনামের সংগ্রহে এক রুপি থেকে এক টাকার নোটের বিবর্তন তুলে ধরা হয়েছে। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ ভারতে প্রথম এক রুপির কাগুজে নোট চালুর ইতিহাস থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ের নোটের নকশা ও পরিবর্তন এতে স্থান পেয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে শের শাহ সুরির আমলে প্রচলিত রৌপ্যমুদ্রা থেকে রুপির ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত ধারাবাহিকতা।
মেজর পঙ্কজ মল্লিকের ‘মেডেলস অ্যান্ড অ্যাওয়ার্ডস’ প্রদর্শনীতে রয়েছে বিভিন্ন পদক ও সম্মাননা। এম ডি নাজমুল হকের ‘হিস্টোরিক্যাল কয়েন ব্যাংক’ সংগ্রহে দেখা যায় বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকসহ বিভিন্ন সময়ের মুদ্রা জমানোর বাক্স। আহসানুজ্জামান জুয়েলের ‘ওয়ার অ্যান্ড সোলজার’ প্রদর্শনীতে বিভিন্ন দেশের নোটে যুদ্ধ ও সৈনিকের উপস্থাপন তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধ ও সংঘাতের ইতিহাস।


‘দ্য কটন স্টোরি’ শিরোনামের প্রদর্শনীতে তুলার ক্ষেত থেকে সুতা ও কাপড় তৈরির যাত্রা তুলে ধরা হয়েছে। নোটে তুলা ও বস্ত্রশিল্পের উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে অর্থের ইতিহাসের সঙ্গে উৎপাদন ও শিল্পের সম্পর্কও দেখানো হয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রচলিত বিভিন্ন নোটের নকশা, সব মূল্যমানের নোট, নমুনা নোট, প্রথম ও শেষ ক্রমিক নম্বরের নোট এবং ত্রুটিপূর্ণ নোটও রয়েছে প্রদর্শনীতে। পাঁচ শ টাকার নোটের বিভিন্ন উপসর্গের নমুনা এবং প্রচলিত ও স্মারক ধাতব মুদ্রাও স্থান পেয়েছে।
বিশ্বের নানা দেশ ও সময়ের নোটের সংগ্রহে রয়েছে বিলুপ্ত রাষ্ট্রের নোট, ঔপনিবেশিক আমলের নোট, মসজিদের ছবি ও ক্যালিগ্রাফি, শিক্ষা, বিমান ও রেলপথের চিত্রসংবলিত নোট। রয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির বিভিন্ন শহরে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত স্বল্পমূল্যের নোট এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানের দখল করা দেশগুলোতে প্রচলিত নোট। এ ছাড়া আছে ক্যারিবীয় অঞ্চলের নোট ও মুদ্রা, উল্লম্ব নকশার নোট, পলিমার নোট এবং কাগজ ও পলিমারের বৈশিষ্ট্যযুক্ত নোট। বিভিন্ন বছরের সেরা নকশার নোট, সবচেয়ে বড় ও ছোট নোট এবং নির্দিষ্ট একটি মূল্যমানের বিভিন্ন দেশের নোটও সংগ্রহের অংশ।


ধাতব মুদ্রার সংগ্রহেও রয়েছে বৈচিত্র্য। সোনারগাঁও থেকে প্রচলিত সুলতানি মুদ্রা, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কিত ত্রিপুরা রাজ্যের মুদ্রা, উপমহাদেশের দুই হাজার বছরেরও বেশি সময়ের বিভিন্ন শাসক ও সাম্রাজ্যের স্বর্ণমুদ্রা, ব্রিটিশ ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলোর মুদ্রা এবং বাংলার সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদের বিভিন্ন নকশার মুদ্রা দেখা যায়। বাংলার সুলতানি মুদ্রার অলংকরণ, ছিদ্রযুক্ত মুদ্রা, দুই ধাতুতে তৈরি মুদ্রা, রঙিন মুদ্রা এবং বিচিত্র আকৃতির প্রাচীন ও আধুনিক মুদ্রাও রয়েছে। কোনোটি ছুরির মতো, কোনোটি নৌকার মতো, আবার কোনোটি বুলেটের আদলে তৈরি। চীনের ছুরির আকৃতির মুদ্রা, কাতাঙ্গা ক্রস, বুলেট মানি, বোট মানি, টাইগার টাং কয়েন এবং লাইবেরিয়ার কিসি পেনির মতো অস্বাভাবিক বিনিময়মাধ্যমও দর্শনার্থীদের কৌতূহল জাগায়।
রয়েছে চায়ের পাতা দিয়ে তৈরি মুদ্রা, দাস ব্যবসার সময় ব্যবহৃত ব্রেসলেট মুদ্রা এবং ২৪ ক্যারেট সোনার তৈরি কাগুজে নোটের নিদর্শন।বাংলাদেশের স্মারক মুদ্রার সংগ্রহেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য কিছু নিদর্শন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২০১১ সালে প্রকাশিত ৯২৫ মানের রৌপ্যমুদ্রা, বাংলাদেশের বিজয়ের ৪০ বছর পূর্তি উপলক্ষে একই বছর প্রকাশিত ৯৯৯ মানের রৌপ্যমুদ্রা এবং বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের শতবর্ষ উপলক্ষে ২০১৩ সালে প্রকাশিত স্মারক মুদ্রা প্রদর্শিত হচ্ছে।

রবীন্দ্রনাথের জন্মবার্ষিকীর মুদ্রাটির অভিহিত মূল্য ১০ টাকা, ব্যাস ৩৮ মিলিমিটার এবং ওজন ২২ দশমিক ১০ গ্রাম। বিজয়ের ৪০ বছর পূর্তির মুদ্রাটির অভিহিত মূল্যও ১০ টাকা। এর ব্যাস ৩৮ মিলিমিটার এবং ওজন ২৫ গ্রাম। জাতীয় জাদুঘরের শতবর্ষের মুদ্রায় রয়েছে অষ্টাদশ শতকের পোড়ামাটির ফলকে ঘোড়সওয়ারের চিত্র।
দীর্ঘদিনের যত্ন, অনুসন্ধান ও সংগ্রহের ফল এসব প্রদর্শনী। কোনো একটি মুদ্রা সংগ্রহে যুক্ত হওয়ার পর সেটির সময়কাল, উৎস, প্রচলন ও ইতিহাস জানার আগ্রহ তৈরি হয়। অনেক সময় একটি ছোট্ট মুদ্রাই খুলে দেয় অজানা কোনো রাজ্য কিংবা সভ্যতার দরজা। সংগ্রাহকদের নিষ্ঠা ও অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে সেই গল্পগুলোই নতুন করে জানার সুযোগ করে দিয়েছে এবারের আয়োজন।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রকাশিত ‘বিএনসিএস জার্নাল’ সেই চর্চাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা জাগায়। এর মাধ্যমে সংগ্রহের পাশাপাশি মুদ্রা নিয়ে গবেষণা, তথ্য সংরক্ষণ ও ইতিহাসের পাঠও গুরুত্ব পাবে। মুদ্রা এখানে কেবল লেনদেনের মাধ্যম নয়, সময়ের সাক্ষী। ধাতু, কাগজ, নকশা কিংবা একটি ছোট্ট ছিদ্রের মধ্যেও লুকিয়ে থাকে মানুষের জীবনযাপন, শাসনব্যবস্থা, বাণিজ্য ও সভ্যতার গল্প।
ছবি: হাল ফ্যাশন