
একটি ছোট ব্যবসার শুরু অনেক সময় হয় খুব সাধারণভাবে। হয়তো ঘরের একটি ছোট কোণ থেকে, কয়েকটি হাতে তৈরি পোশাক দিয়ে কিংবা নিজস্ব রেসিপিতে বানানো খাবার নিয়ে। শুরুটা ছোট হলেও স্বপ্ন কখনো ছোট থাকে না। সেই ছোট স্বপ্নই একসময় বদলে দিতে পারে একটি পরিবারের জীবন, প্রভাব ফেলতে পারে একটি সমাজে, এমনকি শক্তিশালী করতে পারে দেশের অর্থনীতির ভিত্তি।

বাংলাদেশের লাখ লাখ ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো ও মাঝারি উদ্যোক্তার গল্পও ঠিক এমনই। তাঁরা শুধু ব্যবসাই করেন না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন, নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেন এবং দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যান। কিন্তু স্বপ্ন থেকে সাফল্যের পথে এখনো রয়েছে নানা বাধা—অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, বাজারে প্রবেশের চ্যালেঞ্জ, নীতিগত জটিলতা ও প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাব।

এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে জাতিসংঘ ক্ষুদ্র, কুটির, মাইক্রো ও মাঝারি উদ্যোগ দিবস উপলক্ষে ২ জুলাই ২০২৬ ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজন করা হয় একটি তাৎপর্যপূর্ণ সেমিনারের। এর বিষয় ছিল—‘জাতীয় বাজেটের প্রভাব: এমএসএমই উন্নয়ন ও নতুন সুযোগ সম্প্রসারণ’।
অনুষ্ঠানের মূল প্রতিপাদ্য ছিল স্পষ্ট—জাতীয় বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি উদ্যোক্তাদের ভবিষ্যৎ গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
মাইডাসের চেয়ারপারসন পারভীন মাহমুদ উদ্বোধনী বক্তব্যে বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা বলতে গেলে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের আলাদা করে মূল্যায়ন করতেই হয়। কারণ, বড় শিল্পের ভিত্তিও অনেক সময় গড়ে ওঠে ছোট উদ্যোগের হাত ধরে। তাঁর ভাষায়, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়ন মানে শুধু ব্যবসার প্রবৃদ্ধি নয়, একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণ।
করনীতি ও ব্যবসাবান্ধব নীতিগত সংস্কারের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন স্নেহাশীষ বড়ুয়া। তাঁর মতে, অনেক উদ্যোক্তা করব্যবস্থাকে জটিল মনে করে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে যুক্ত হতে দ্বিধা বোধ করেন। অথচ করকাঠামো যদি আরও সহজ, স্বচ্ছ ও উদ্যোক্তাবান্ধব হয়, তাহলে নতুন উদ্যোক্তারা অনেক বেশি উৎসাহিত হবেন। সঠিক করনীতি ব্যবসার প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করতে পারে।
আর্থিক অন্তর্ভুক্তির গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন অধ্যাপক ড. মেলিটা মেহজাবীন। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ব্যবসা সম্ভাবনাময় হলেও পর্যাপ্ত আর্থিক পরিকল্পনা ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের অভাবে তাঁরা ব্যাংকঋণ থেকে বঞ্চিত হন। ব্যাংক শুধু বর্তমান ব্যবসা নয়, উদ্যোক্তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও মূল্যায়ন করে। তাই আর্থিক সচেতনতা ও পরিকল্পনাকে তিনি সফল উদ্যোক্তা হওয়ার অন্যতম শর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।

কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজারে ক্ষুদ্র উদ্যোগের ভূমিকা তুলে ধরেন গুণজন বাহাদুর ডাল্লাকোটি। তাঁর মতে, বাংলাদেশে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সবচেয়ে বড় চালিকা শক্তিগুলোর একটি হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ। বিশেষ করে তরুণ ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্য এই খাত নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে। তাই এই খাতে বিনিয়োগ মানেই ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ।
ঋণপ্রাপ্তির বাস্তব চ্যালেঞ্জ নিয়ে বক্তব্য দেন মাহবুবুর রহমান। তিনি বলেন, অনেক উদ্যোক্তা মনে করেন ব্যাংকঋণ পাওয়া কঠিন। কিন্তু বাস্তবে সমস্যার বড় অংশই প্রস্তুতির ঘাটতিতে। ব্যবসার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা, আয়-ব্যয়ের সঠিক হিসাব এবং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য থাকলে অর্থায়নের পথ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে—বিশ্বাসযোগ্যতাই অর্থায়নের অন্যতম প্রধান ভিত্তি।

ব্যবসায় ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরেন ফারজানা চৌধুরী। তাঁর মতে, শুধু লাভের হিসাব করলেই চলবে না; অনিশ্চয়তার কথাও মাথায় রাখতে হবে। যথাযথ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সুরক্ষা একটি ব্যবসাকে দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই করে তোলে।
নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষমতায়ন প্রসঙ্গে ফাবিহা ফাইরোজ ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের অসংখ্য নারী ঘরে বসেই অসাধারণ পণ্য তৈরি করছেন। কিন্তু বাজারসংযোগের সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁদের অনেকেই বড় পরিসরে যেতে পারছেন না। সঠিক সহায়তা ও সুযোগ পেলে নারীরা শুধু সফল উদ্যোক্তাই নন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী নেতৃত্বেও পরিণত হতে পারেন।
সেমিনারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয় ছিল সবুজ ব্যবসা। বক্তারা বলেন, টেকসই উন্নয়ন এখন আর আলাদা কোনো ধারণা নয়; এটি ব্যবসার ভবিষ্যতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পুনর্ব্যবহার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ-সাশ্রয়ী উৎপাদনব্যবস্থা ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অন্যতম শর্ত।

পুরো আয়োজনজুড়ে ছিল আশাবাদের আবহ। শুধু বক্তৃতাই নয়, প্রশ্নোত্তর পর্বে উদ্যোক্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, উদ্বেগ ও প্রত্যাশাও উঠে আসে। কেউ জানতে চেয়েছেন ঋণ পাওয়ার পথ, কেউ বাজার সম্প্রসারণের কৌশল, আবার কেউ ছোট উদ্যোগকে কীভাবে বড় ব্র্যান্ডে পরিণত করা যায়, সে বিষয়ে পরামর্শ চেয়েছেন।
দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল উদ্যোক্তাদের নকশায় তৈরি পোশাকের ফ্যাশন প্রদর্শনী এবং পণ্য উপস্থাপন। সেখানে ফুটে ওঠে তাঁদের সৃজনশীলতা, পরিশ্রম ও স্বপ্নের রং। যেন প্রতিটি উপস্থাপনাই বলছিল—ক্ষুদ্র উদ্যোগ মানেই ছোট কিছু নয়, এর ভেতরেই লুকিয়ে থাকে বড় সম্ভাবনার বীজ।

দিন শেষে এই আয়োজন নতুন করে মনে করিয়ে দিল, একটি দেশের বৃহৎ অর্থনীতি গড়ে ওঠে অসংখ্য ছোট উদ্যোগের ভিত্তির ওপর। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার সাফল্য মানে শুধু একটি পরিবারের পরিবর্তন নয়; বরং একটি সমাজের অগ্রগতি এবং জাতীয় উন্নয়নের শক্ত ভিত নির্মাণ।
মাইডাসের এই আয়োজনের মূল বার্তাও ছিল সেটিই—সঠিক তথ্য, যথাযথ প্রস্তুতি এবং কার্যকর সংযোগ থাকলে ছোট স্বপ্নও একদিন বড় সাফল্যে রূপ নেয়। আর ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের এগিয়ে নেওয়া মানে শুধু ব্যবসার প্রসার নয়; বরং বাংলাদেশের আগামীকে আরও শক্তিশালী ও সম্ভাবনাময় করে তোলা।
ছবি: হাল ফ্যাশন