
ঢাকায় রিকশাচিত্র বা রিকশা পেইন্টের শুরুটা ১৯৪০-এর দশকে। ২০২৩ সালে ঢাকার রিকশা ও রিকশাচিত্রকে ইউনেস্কোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আর এই রিকশা পেইন্ট নিয়ে গুলশানের আলোকি কনভেনশন সেন্টারে রিকশা কানেক্টসের আয়োজনে হয়ে গেল দুই দিনব্যাপী ব্যতিক্রমী রিশকা ফেস্টিভ্যাল। ঢাকায় উৎসবমুখর আয়োজনের এক জনপ্রিয় ও হ্যাপেনিং প্লেস বলা চলে আলোকি কনভেনশন সেন্টারকে। সারা বছর জুড়ে বিভিন্ন ব্যতিক্রমী আয়োজনে মুখর থাকে আলোকি। গত ২৯ ও ৩০ নভেম্বর এখানে আয়োজিত হয়ে গেল রিশকা ফেস্টিভ্যাল। ঢাকার স্থানীয় ডায়ালেক্টে রিকশার অপভ্রংশ রূপ 'রিশকা'। আর সেজন্যই এই নাম।


সারাদিন জুড়ে এই আয়োজনে ছিল দ্য মেলা, দ্য বাজার, দ্য শিল্পঘর, রিকশা পেইন্ট, ফেস পেইন্ট, টেরাকোটা কর্মশালা,হাওয়াই মিঠাই ও ফুচকার মতো মুখরোচক খাবারের পসরা, সেই শৈশবের স্মৃতি জাগানো আর্কেড গেমস ও ভিডিও গেমস, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, বাউল গান আর সেই সঙ্গে জনপ্রিয় ব্যান্ড জলের গান ও ইন্দালোর পরিবেশনা।
প্রবেশ মুখেই গামছা দিয়ে নান্দনিক সজ্জা নজর কেড়েছে। আলোকির মুক্ত স্থানে গামছা দিয়ে সাজানো হয়েছে মঞ্চ, যেখানে জমেছিল বাউল গানের আসর। ভেতরে মুল অডিটোরিয়ামের গ্যালারিতে আয়োজিত হয়েছিল লাইভ আর্ট সেশন। রিকশা পেইন্ট মোটিফে ফেস পেইন্ট, ক্লে স্টেশনের সৌজন্যে মাটির পটারি নিজ হাতে তৈরির ব্যবস্থা,বায়োস্কোপ, পুতুল নাচ আর রিকশা মোটিফের ফটোবুথও ছিল।

দেখা গেল একটা আস্ত রিকশা রাখা রয়েছে। সেখানে দর্শনার্থীরা নিজেদের ইচ্ছেমতো রংতুলি ছুঁয়ে দিচ্ছেন। দায়িত্বে থাকা আদিবা ও সানজিদা জানালেন অ্যাক্রিলিক রং দিয়ে আঁকছেন সবাই, যাতে একজনের আঁকার ওপর আরেকজন আঁকতে পারেন। শিশুরা খুব আগ্রহ নিয়ে আঁকাআঁকি করেছে এখানে।


বিডি রিকশা আর্ট গ্যালারির বুথে দেখা গেল চলছে লাইভ রিকশা মোটিফে পেইন্টিং। আর্টিস্টিক ইভেন্ট প্ল্যানার ততোধিক এর স্টলে দেখা গেল মাটির বিভিন্ন পাত্র, কাপড়ের ফ্রেম, ক্যানভাসে বিভিন্ন দেশিয় মোটিফের কাজ। তারাই ছিল পুরো ফেস্টের সাজসজ্জার দায়িত্বে। কথা হয় ক্রিয়েটিভ টিমের কামরুন নাহার জয়ীর সঙ্গে। তিনি জানান দুইজন কিউরেটরের তত্ত্বাবধানে ১০জন শিল্পী কাজ করেছেন পুরো আয়োজনের সাজসজ্জায়।

গ্যালারির পাশেই বিশাল আকৃতির ঐতিহ্যবাহী টেপা পুতুল দেখা গেল, যাকে পরানো হয়েছিল লাল পেড়ে হলুদ শাড়ি। সেই সঙ্গে বেতের পাটি ও কুলা দিয়ে সাজানো হয়েছিল দৃষ্টিনন্দন ফটোবুথ।
শিল্পঘরের ওপরের অংশ সাজানো হয়েছিল গামছা ও ট্র্যাডিশনাল টাঙ্গাইল শাড়ি দিয়ে। ওপর থেকে ঝোলানো জামদানি শাড়ি চমৎকার আবহ তৈরি করেছে। এখানে আরো ছিল আর্ট এক্সিবিশন, যেখানে পটচিত্র, নকশীকাঁথা, গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্যসহ বিভিন্ন পেইন্টিং দেখা যায়। মুল অডিটোরিয়ামের ভেতরে ছিল পাঠাও, এশিয়ান পেইন্ট, স্ন্যাপ অ্যান্ড কিপ, সাং কুইক এর বুথ, যারা পৃষ্ঠপোষক হিসেবে ছিলেন এখানে।

দোতলায় চলছিল চলচ্চিত্র প্রদর্শনী। মার্কেট প্লেসে ছিল গ্রিও,পটু, তাঁত অ্যান্ড তানোরি, সৃষ্টি , শ্রীবসন, ক্লাউড অ্যান্ড ক্রিম, গহনাগল্প,খুশবু ,আমি,ঢেউ, কম্ফিস্টাইল, বিপ্রতীপ, নুজার্ট, বিমূর্ত, কোগোসি অ্যাপারেল, কেয়াস বুটিক, সিল্কেন্ডি, দ্যা ক্লজেট ক্লাউড, স্কিন ক্যাফে, কালাভ্রিত, বোনোরিটা,বাসা,সমস্যা নাই, আর্টেমিস,ক্যাঙ্গারু, আর্টজিনেক্স, তাশা, আরিকা, আর্কা স্টুডিও, কাঁঠাল সহ ৬৫জন উদ্যোক্তার স্টল।

এখানে বাসায় এর স্টলে দেখা যায় রিসাইকেল করা শাড়ি দিয়ে বানানো গৃহসজ্জাপণ্য। ক্যাঙ্গারুর স্টলে ছিল থ্রিফট পণ্য। এখানে বেশ কিছু উদ্যোক্তাকে দেখা গেল, যাঁরা কাজ করছেন রিসাইকেলড ও আপসাইকেল করা পণ্য নিয়ে। বাইরে ছিল কোণা, চিলক্স, জাস্ট জুস, বিরিয়া স্টপ, মোর মিট বক্স, বেগিজাস কিচেন, কড়া ফ্রাই, খিলগাঁও পিঠা ঘর সহ ১২টি খাবারের স্টল।
কথা হয় রিকশা কানেক্টসের চিফ অপারেটিং অফিসার ইমতিয়াজ মাহমুদ ও প্রোডাকশন পার্টনার ওমনি ডিজিটালের রাগিব জোহাইন নূরের সঙ্গে। তাঁরা জানান, বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে সবার কাছে পৌঁছে দিতেই এই আয়োজনের চিন্তা মাথায় আসে। আয়োজনের প্রস্তুতির সময় তাঁরা ভেবেছেন, কীভাবে এই বিষয়গুলো মানুষের কাছে বেশি বেশি পৌঁছানো যায়। সাধারণত গুলশানের মতো অভিজাত এলাকায় সবাই দেশিয় সংস্কৃতি নিয়ে সেভাবে জানেনা। এই শ্রেণির মানুষকে রিকশা পেইন্টের মতো দেশিয় ঐতিহ্য নিয়ে আগ্রহী ও উৎসাহিত করতেই এই আয়োজন। ইমতিয়াজ বলেন, 'রিকশা পেইন্টিং এমন এক শিল্প, যার মধ্যে বিভিন্ন রং ও মোটিফ নিয়ে মনের মতো করে কাজ করা যায়। এর মাধ্যমে সব শ্রেণির মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়। মেলার আমেজের সঙ্গে মিল রেখে, আমরা চেষ্টা করেছি যেন এখানে অংশ নেওয়া উদ্যোক্তা্রা তাঁদের দেশিয় মোটিফের কাজগুলোই হাইলাইট করেন'।


উৎসবের প্রথম দিনে ছিল মনপুরা সিনেমার প্রদর্শনী। এর পরেই ছিল পরিচালক গিয়াসউদ্দীন সেলিমের সঙ্গে প্যানেল ডিসকাশন। রিকশা পেইন্ট কর্মশালা পরিচালনা করে প্রতিভা ফাউন্ডেশন আর টেরাকোটা কর্মশালা পরিচালনা করে ক্লে হাউজ। দ্বিতীয় দিন ছিল দারুচিনি দ্বীপ সিনেমার প্রদর্শনী। প্রতিদিনের প্রবেশ মূল্য রাখা হয়েছিল ৩০০ টাকা। এছাড়া কর্মশালা, চলচ্চিত্র প্রদর্শনী ও কনসার্টের টিকেট কিনতে হয়েছে আলাদা করে। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই জমে উঠেছিল আলোকি প্রাঙ্গন। এই সফল ইভেন্টের পর আয়োজকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেন, তাঁরা আবার আবার ফিরে আসবেন রঙিন এই আয়োজন নিয়ে।
ছবি: প্রতিবেদক