
একটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার প্ল্যাটফর্ম কি জনস্বাস্থ্য নিয়ে জাতীয় সচেতনতা গড়ে তুলতে পারে? বাংলাদেশে সেই প্রশ্নের নতুন উত্তর খুঁজতে শুরু হয়েছে ‘হাইজিন ফর হেলথ বাংলাদেশ’। গুলশান সোসাইটির সহযোগিতায় শুরু হওয়া এই উদ্যোগের মাধ্যমে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে দেশব্যাপী প্রচারণা চালাবে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ। আর এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রথমবারের মতো কোনো সরকারি মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের একটি সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হলো।


রাজধানীর গুলশান-২ লেক পার্কে বুধবার (২২ জুলাই) কর্মসূচির উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন, এমপি। অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন, গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম।
এবারের মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশ ২০২৬ সামানজার সাঈদ তাঁর জাতীয় অ্যাডভোকেসি প্রকল্প হিসেবে এই উদ্যোগের নেতৃত্ব দেবেন। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তরুণ স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অভ্যাস গড়ে তোলা এবং প্রতিরোধযোগ্য রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোই হবে কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সর্দার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার শিক্ষা শুরু হয় পরিবার থেকেই। অনেক বড় রোগ প্রতিরোধের সবচেয়ে সহজ উপায় হলো দৈনন্দিন জীবনে পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস গড়ে তোলা। তাই এমন সচেতনতামূলক উদ্যোগ মানুষের আচরণগত পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে আজরা মাহমুদ ট্যালেন্ট ক্যাম্প (এএমটিসি)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও মিস ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের জাতীয় পরিচালক আজরা মাহমুদ বলেন, ‘বিউটি উইথ আ পারপাস’ কেবল একটি প্রতিযোগিতার স্লোগান নয়, এটি মিস ওয়ার্ল্ডের মূল দর্শন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে প্রতিযোগীরা শুধু নিজেদের নয়, নিজেদের দেশের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও সামাজিক বাস্তবতাকেও তুলে ধরেন। তাই একজন বিজয়ী শুধু একটি মুকুটের অধিকারী হন না; তিনি হয়ে ওঠেন সামাজিক পরিবর্তনের একজন প্রতিনিধি।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব আরও শক্তিশালী করতে সরকারি সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই উদ্যোগে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সম্পৃক্ততা ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
সামানজার সাঈদ বলেন, মিস ওয়ার্ল্ডের মঞ্চে প্রতিযোগীরা শুধু একটি দেশের সৌন্দর্য নয়, বরং সেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জগুলোকেও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধির বিষয়গুলো আমরা জানলেও দৈনন্দিন জীবনে অনেক সময় তা অনুসরণ করি না। যেখানে-সেখানে বর্জ্য ও প্লাস্টিক ফেলা, নিরাপদ স্বাস্থ্যচর্চাকে অবহেলা করা কিংবা পরিচ্ছন্নতার অভাব—এসব কারণে নানা প্রতিরোধযোগ্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি জানান, তাঁর ক্যাম্পেইনে সাতটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে—ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি, হাতের স্বাস্থ্যবিধি, খাদ্য স্বাস্থ্যবিধি, নিরাপদ পানির ব্যবহার, মুখ ও দাঁতের স্বাস্থ্যবিধি, মাসিক স্বাস্থ্যবিধি এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্যবিধি। দেশের বিভিন্ন এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকদের মাধ্যমে এসব বিষয়ে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া হবে।
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, বিষয়টি সাধারণ মনে হলেও বাস্তবে অসংখ্য মানুষ এখনো স্বাস্থ্যবিধির মৌলিক বিষয়গুলো মেনে চলেন না। তাই এই উদ্যোগে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থাও সম্পৃক্ত হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

গুলশান সোসাইটির সভাপতি ব্যারিস্টার ওমর সাদাত বলেন, কমিউনিটির কল্যাণে নাগরিক সংগঠন ও জাতীয় প্ল্যাটফর্মের যৌথ উদ্যোগ ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। এমন একটি কর্মসূচির অংশ হতে পেরে গুলশান সোসাইটি গর্বিত।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, শুধু স্বাস্থ্যবিধি মেনেই অসংখ্য রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই এই ধরনের জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি সময়ের দাবি। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে সামানজার সাঈদ বাংলাদেশের জন্য নতুন সাফল্য বয়ে আনবেন।
এই উদ্যোগের অংশীদার হিসেবে রয়েছে গুলশান সোসাইটি, চিটাগং গ্রামার স্কুল, ড্যাফোডিল স্কুল, মা হাদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ডিউক অব এডিনবরা ইন্টারন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড বাংলাদেশ, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, ফ্রেন্ডশিপ, গ্লেনরিচ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, বাংলাদেশ উইমেন স্পোর্টস ফেডারেশন, ইন্টারন্যাশনাল হোপ স্কুল বাংলাদেশ, স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড ও এর হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন, আমিশে, এএমটিসি, পারসোনা, র্যাডিসন ব্লু, ভি-ফ্রেম, সিনে স্কাল্পচার এবং কনকর্ড গার্মেন্টস গ্রুপ।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অতিথিরা প্রতীকীভাবে পায়রা ও পরিবেশবান্ধব বেলুন উড়িয়ে ‘হাইজিন ফর হেলথ বাংলাদেশ’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। পরে ডিজিটাল বাটনে ক্লিকের মাধ্যমে শুরু হয় দেশব্যাপী স্বেচ্ছাসেবক নিবন্ধন কার্যক্রম। এই স্বেচ্ছাসেবকেরা ‘অ্যাম্বাসেডরস ফর চেঞ্জ’ হিসেবে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাস্থ্যসচেতনতা ছড়িয়ে দিতে কাজ করবেন।

আগামী ৫ সেপ্টেম্বর ভিয়েতনামের ন্যা ট্রাং শহরে অনুষ্ঠিতব্য মিস ওয়ার্ল্ড ২০২৬-এর গ্র্যান্ড ফিনালেতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন সামানজার সাঈদ। তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে ওঠার আগেই তিনি শুরু করলেন আরেকটি যাত্রা—দেশজুড়ে স্বাস্থ্যসচেতনতা ও পরিচ্ছন্নতার বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এক সামাজিক অভিযাত্রা।
ছবি: এএমটিসি ও হাল ফ্যাশন