
বাংলাদেশের ফ্যাশন, নকশা ও সৃজনশীল শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে প্রয়োজন ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন ও সচেতনতার সমন্বয়। দেশের হেরিটেজকে শুধু সংরক্ষণ নয়, মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে তোলা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের সৃজনশীলতাকে আরও শক্ত অবস্থানে নেওয়ার নানা দিক উঠে এসেছে ‘ডিজাইন ইন বাংলাদেশ সপ্তাহ ২০২৬’ আয়োজিত আলোচনায়।

রাজধানীর ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টারে দুই দিনব্যাপী এই আয়োজনের দ্বিতীয় দিনের শুরুতেই অনুষ্ঠিত হয় ‘ঐতিহ্য, ফ্যাশন, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে একটি টেকসই সৃজনশীল রপ্তানি অর্থনীতি গড়ে তোলা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। আলোচনায় বাংলাদেশের ফ্যাশন ও সৃজনশীল শিল্পের সম্ভাবনার পাশাপাশি সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধা এবং করণীয় নিয়ে কথা বলেন সংশ্লিষ্টরা।
প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির ফ্যাশন ডিজাইন ও টেকনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শিবানন্দ অধিকারী বিপ্লব, মণ্ডল গ্রুপের এইচআর, অ্যাডমিন ও কমপ্লায়েন্স বিভাগের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার খন্দকার নাজমুল আলম, বাংলা ক্রাফটের সাবেক সভাপতি আশরাফুল রহমান, হেরিটেজ বিশেষজ্ঞ ও হাল ফ্যাশনের কনসালট্যান্ট শেখ সাইফুর রহমান এবং লার্ন লাইটের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক অদিতি চৌধুরী। আলোচনা সঞ্চালনা করেন শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির ফ্যাশন ডিজাইন ও টেকনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. সরকার সুবর্ণা নওশিন।
আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পায় দেশের ফ্যাশন শিক্ষার বর্তমান কাঠামো। ফ্যাশন স্কুলগুলোর পাঠ্যক্রমকে আরও বাস্তবমুখী ও শিল্পের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার ওপর জোর দেন আলোচকরা। তাঁদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া জ্ঞান ও বাস্তব কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতার মধ্যে সমন্বয় তৈরি করা গেলে দেশের তরুণ ডিজাইনারদের সৃজনশীলতা আরও কার্যকরভাবে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব।

একই সঙ্গে ডিজাইনার ও উদ্যোক্তাদের দক্ষতা ও মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কার্যকর মানদণ্ড তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে আসে। সৃজনশীল শিল্পকে একটি শক্তিশালী রপ্তানি খাতে পরিণত করতে সরকারি পর্যায়ে আরও কার্যকর উদ্যোগ ও সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে বলেও মত দেন আলোচকরা।
তবে শুধু নীতি বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগই যথেষ্ট নয়, দেশের নিজস্ব ঐতিহ্য সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা তৈরির বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পায়। বাংলাদেশের হেরিটেজকে মানুষের জীবনযাপন ও দৈনন্দিন সংস্কৃতির অংশ করে তুলতে মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে ধারাবাহিক সচেতনতামূলক প্রচারণার প্রয়োজন রয়েছে বলে উঠে আসে আলোচনায়। হেরিটেজ সংরক্ষণ বা প্রচারের দায়িত্ব শুধু ডিজাইনার, সরকার কিংবা নীতিনির্ধারকদের নয়—এটি সমাজের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব বলেও মত দেন বক্তারা।

‘দ্য থ্রেডস অব ট্রান্সফরমেশন’—ফ্যাশনের সঙ্গে সচেতনতার যোগসূত্র
প্যানেল আলোচনার পর অনুষ্ঠিত হয় ‘দ্য থ্রেডস অব ট্রান্সফরমেশন’ শীর্ষক লার্নিং সেশন। সেশনটি পরিচালনা করেন লার্ন লাইটের প্রতিষ্ঠাতা ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক অদিতি চৌধুরী। লার্ন লাইটকে এমন একটি রূপান্তরমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে তুলে ধরা হয়, যেখানে কারিগরি দক্ষতার পাশাপাশি মানুষের অন্তর্গত বিকাশ, সহমর্মিতা, মূল্যবোধ, আত্মসচেতনতা ও ইতিবাচক মানসিকতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিক্ষার্থী, অভিবাসী কর্মী, বিভিন্ন পেশার মানুষ এবং পরিবারের নারী সদস্যসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কাজ করে দক্ষতার পাশাপাশি আরও মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশসচেতন সমাজ গঠনের লক্ষ্য তুলে ধরা হয় এই সেশনে।
লার্নিং সেশনে ফ্যাশন ও নকশার সঙ্গে মানবিক মূল্যবোধ এবং সচেতনতার সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়। প্রশ্ন রাখা হয়—বাংলাদেশের ফ্যাশন ডিজাইনের জন্য কি এখন একটি নিজস্ব মানদণ্ড বা পরিচয় নির্ধারণের সময় এসেছে? সেখানে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’-এর পাশাপাশি মানবিক ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ একটি ফ্যাশন প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়, যেখানে কারিগরি দক্ষতার সঙ্গে সচেতনতাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।

'নীলচাষ থেকে টেকসই ফ্যাশন—ইতিহাসের ভিন্ন পাঠ' শীর্ষক সেশনে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ফ্যাশনের সম্পর্ক বোঝাতে নীলচাষের প্রসঙ্গও উঠে আসে। দীনবন্ধু মিত্রের ‘নীলদর্পণ’-এ প্রতিফলিত নীলচাষকে ঘিরে কৃষকের ওপর চাপ, খাদ্যশস্যের পরিবর্তে নীল চাষে বাধ্য করা এবং এর বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিরোধের ইতিহাসের সঙ্গে বর্তমান সময়ের পরিবেশবান্ধব ফ্যাশনে নীলের ব্যবহারকে পাশাপাশি দেখা হয়।
একসময় যে নীলচাষ ছিল শোষণ ও প্রতিরোধের ইতিহাসের অংশ, সময়ের পরিবর্তনে সেই নীলই প্রাকৃতিক ও টেকসই ফ্যাশনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এই উদাহরণের মাধ্যমে দেখানো হয়, কোনো উপকরণের মূল্য শুধু তার সৌন্দর্য বা ব্যবহারিক প্রয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়<bha>;</bha> বরং সেই উপকরণ কোন সময়ে, কীভাবে এবং কোন সামাজিক ও পরিবেশগত প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সেশনের মূল বার্তা ছিল—নকশার সঙ্গে সহমর্মিতা, সৃজনশীলতার সঙ্গে সচেতনতা এবং ফ্যাশনের সঙ্গে টেকসই চিন্তার যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। সৌন্দর্যের সঙ্গে মানবিকতা যুক্ত হলে একটি নকশা শুধু সুন্দর থাকে না, বরং আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে।
‘আনটোল্ড স্টোরি’ রানওয়ে
দুই দিনের আয়োজনের শেষ পর্যায়ে ছিল ‘আনটোল্ড স্টোরি’ শীর্ষক রানওয়ে। এরপর সন্ধ্যা ৬টা থেকে শুরু হয়েছে সমাপনী অনুষ্ঠান ও নৈশভোজ। সেখানে আয়োজনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যোগাযোগ ও মতবিনিময়ও হয়েছে।

‘ডিজাইন ইন বাংলাদেশ সপ্তাহ ২০২৬’-এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের নকশাকার, কারুশিল্প, বস্ত্র, ঐতিহ্য ও উদীয়মান সৃজনশীল প্রতিভাকে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত করা। একই সঙ্গে দেশের সৃজনশীল শিল্পকে বৈশ্বিক রপ্তানি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে এই আয়োজনে।
দুই দিনব্যাপী আয়োজনে ১০০ নকশাকারের কাজ প্রদর্শনের পাশাপাশি ফ্যাশন প্রদর্শনী, পোশাক প্রদর্শন, প্যানেল আলোচনা, লার্নিং সেশন এবং সৃজনশীল বিনিময়ের বিভিন্ন আয়োজন রাখা হয়েছে। পুরো আয়োজনজুড়ে মূল ভাবনা হিসেবে উঠে এসেছে একটি বিষয়—বাংলাদেশের ফ্যাশন ও ডিজাইনের ভবিষ্যৎ শুধু পোশাক বা নকশায় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দেশের মানুষ, পরিবেশ, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সমাজের গল্প।
ছবি: হাল ফ্যাশন