
ঢাকার নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতার কিছুটা হলেও আঁচ পাওয়া যায় ঢাকা মেকার্সে। এই আয়োজনের তৃতীয় আসরের আজ শেষ দিন। গত ৩০ জানুয়ারি শুরু হয় রাজধানীর গুলশান তেজগাঁও লিংক রোডের হ্যাপেনিং প্লেস আলোকি কনভেনশন সেন্টারে। প্রবেশপথে ঢুকতেই আপনার মন ভালো হয়ে যাবে। ফলের ক্রেট দিয়ে সজানো হয়েছে অস্থায়ী ফুড জোন। উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আছে সংগীতের মঞ্চ। দেশীয় কারুপণ্য প্রদর্শন ও বিক্রি করার জন্য ক্র্যাফটস জোন করা হয়েছে গ্লাস হাউসে। দোতলায় ভীড় জমেছে আর্ট মার্কেটে। আর মূল বলরুমে গেলেই দেখতে পাবেন সৃজনশীলতায় উৎসবমুখর ঢাকা মেকার্সের মেকার্স মার্কেট।
রোজই এখানে দেশি–বিদেশি দর্শনার্থীদের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। আলোকির বলরুমে আলোকিত সজ্জায় সাজানো এই দৃষ্টিনন্দন মেকার্স মার্কেটের স্টলগুলো নিয়ে আলাদা করে বলতেই হয়।
৬০ জন উদ্যোক্তা অংশ নিয়েছেন এই মেকার্স মার্কেটে। তাঁদের সম্ভারে প্রতিফলন রয়েছে সৃষ্টিশীল প্রতিভার। পোশাক, অনুষঙ্গ, হোম ডেকোর, রিকশার অনুষঙ্গ কিংবা গেরস্থালির প্রয়োজনীয় সামগ্রীর পাশাপাশি আছে বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে তৈরি সৃজনশীল পণ্য, জুয়েলারি, পরিধেয় আর্ট, মজার মজার মেসেজ, আর্টওয়ার্ক করা স্টেশনারি আর পোস্টার।
হানিফ পাপ্পু, শাবানা, হল্লা, আয়শা, গুড ফর লিভিং, অলক্ষ্মী, ডেয়ারিং, ইকিগাই, সো কলড আর্টিস্ট, ক্রিস্টাল ইন আ র্যাপ, ব্যাড গার্ল নেশন, লী-বার, সেভেন ডেজ ডায়েরি, বক্স অব অর্নামেন্টস, পশুপ্রেমীদের জন্য ফারি ঘর গুডিস, মিল্ক, সোর, ইকারুস, র্যান্ডম, পাকা, ডাক্কা, ফুটপাত, অরাম, আর্টিস্ট সিদ্দিক, রফিক ওয়ার্ক বক্স, স্টুডিও সিক্স বাই সিক্স, তাওসিন তাওহা, ওয়াইল্ড ওভেন, পেস্টেল হোক্স, রেড পেনসিল, নুজ আর্ট, এথনিক ওয়্যার, মনির হোসেন, স্ট্রেইট আউট টোকো, ডিএম মার্চেন্ট, হোসেন ওয়ার্কস, কংক্রিট অ্যান্ড বিয়ন্ড, প্লাম পিসেস, গেরো, স্কুইন্টি পান্ডা, যথাশিল্প, সি লা ভি, পটারি বুথ, প্যাস্টেল হোমস, ওগোপোগো স্টুডিওর মতো সৃজনশীল উদ্যোক্তারা এখানে অংশ নিয়েছেন।
মেকার্স মার্কেটের শুরুতে ঢুকতে চোখে পড়বে হল্লার অভিনব উদ্যোগ। ব্র্যান্ডটির উদ্যোক্তা শিমলা হক জানান, রিকশাহুডের আর্টিফিশিয়াল লেদার দিয়ে তৈরি নানা ধরনের পণ্য ডিজাইন করেন তিনি।
নানা নকশার কানের দুল, গিটারের বেন্ট, ছবির ফ্রেম, টোট ব্যাগের মতো পণ্যে রয়েছে হল্লাতে। এ ছাড়া ব্রাশ মেটালের জুয়েলারি আর আরামদায়ক সুতি কাপড়ের একরঙা পোশাক এনেছে তারা।
আরেকটু এগিয়ে গেলেই আর্টিস্ট সিদ্দিকের স্টল দেখা যাবে। আলাদাভাবে চোখে পড়বে তাদের রংচঙে পণ্যগুলো।

মাটি আর সিরামিক দিয়ে তৈরি নানা আকারের মাস্কগুলো সত্যিই নজরকাড়া। এ ছাড়া শোপিস, লকেট, আংটি, নেকপিস, কার্টুন ক্যারেক্টারের মিনিয়েচারও তাদের সিগনেচার পণ্য। উদ্যোক্তা তানজিলা সুমাইয়া সিদ্দিকী নিজেই তৈরি করেন এগুলো।

সামিয়া আহমেদের ব্র্যান্ড স্কুইন্টি পান্ডার স্টলে গেলে নিশ্চিত পশুপাখিপ্রেমীদের মন ভালো হয়ে যাবে। মূলত দেশীয় ও বিলুপ্ত প্রাণীদের নিয়ে তিনি কাজ করেন। শুশুক, কালো ভালুক, বেঙ্গল টাইগার, গুইসাপ, রাসেল ভাইপার, প্রজাপতি, ব্যাঙ, বিড়াল, খরগোশ, পাখি, খ্যাঁকশিয়ালের মতো পশুপাখির আদলে দুল, লকেট, শোপিস ডিজাইন করেন তিনি।
মানবে পাওয়া যাচ্ছে জিপসাম দিয়ে তৈরি করা মিনি ভাস্কর্য, হ্যান্ডমেড ক্যালেন্ডার, রেজিন ও শুকনা ফুলের লকেট, পাথর, কাঠ ও কাঁথাস্টিচের জুয়েলারি।
স্টুডিও সিক্স বাই সিক্সের আপসাইকেল্ড পণ্যগুলো বেশ নজর কেড়েছে। প্লাস্টিকের বোতলের ওপর পাটের দড়ি দিয়ে খুব সুন্দর ফুলদানি কিংবা গাছ লাগানোর পট বানিয়েছে তারা। এ ছাড়া এই স্টলে পাওয়া যাচ্ছে স্টিকার আর রিয়েল আর্টওয়ার্ক থেকে বানানো পোস্টার।

শিল্পী তাওসিন তাওহার উদ্যোগটি বেশ সুন্দর। তাঁর নিজের ডিজাইন করা পোস্টকার্ড, ডিজিটাল পেইন্টিং ক্যালেন্ডার, টাইপোগ্রাফি নির্ভর বুকমার্ক, স্টিকার আছে। তবে বিশেষ নজর কাড়বে তাঁর ক্যালিগ্রাফি করা টি–শার্ট ও শাল। এই স্টলে লাইভ ক্যালিগ্রাফি করার সুযোগও আছে।

পাশেই বিপ্রতীপের স্টল। যেখানে ছোট–বড় সব মানুষের উপচে পড়া ভিড়। নোটবুক, ডায়েরি, স্টিকার, ক্যালেন্ডার, বুকমার্ক, মাটির পুতুল, নানা নকশার খাম, ফ্রেমসহ হরেক রকম স্টেশনারি পণ্য পেয়ে যাবেন এখানে। ছোট্ট কর্নার নিয়ে বসেছে তুলসীপাতা নামের একটি ব্র্যান্ড। ফেব্রিকের রং হিসেবে তারা মূলত প্রাকৃতিক উপকরণ নিয়ে কাজ করে। মাস্ক, গজ কাপড়, রুমাল, ব্লাউজ আর টপসের চোখ জুড়ানো কালেকশন আছে এখানে।
ওয়াইল্ড ওভেনে পাওয়া যাচ্ছে লেদারের কালারফুল বিভিন্ন ধরন ও সাইজের ব্যাগ। অন্যদিকে রান্নাঘর ও ঘর সাজানোর নানা উপকরণ ও ক্রোকারিজ মিলবে প্যাস্টেল হোমে। পাশেই বসেছে রেড পেনসিলের স্টল। পাট ও কাঠের তৈরি গয়না, গৃহস্থালিসামগ্রী ও হোম ডেকর আছে এখানে।
হানিফ পাপ্পু নিয়ে আলাদা করে বলার কিছু নেই। বর্ষীয়ান রিকশাচিত্রশিল্পী মোহাম্মদ হানিফ পাপ্পুকে তাঁর কাজের মাধ্যমে সবাই একনামে চেনেন। তাঁর স্টলে সাজানো চশমা, হারিকেন, চায়ের কেতলি ও গ্লাস, পোস্টারের মতো পণ্যগুলো সত্যিই নজরকাড়া। সব পণ্যকেই রিকশাচিত্রের মাধ্যমে আলাদা মাত্রা দিয়েছেন শিল্পী।
মাটির জিনিস যাঁদের বিশেষ পছন্দ, তাঁরা মেকার্স মার্কেটে এলে ঢুঁ মারতে পারেন পটারি বুথের স্টলে।

শোপিস থেকে শুরু করে নানা ধরনের ফুলদানি, ছোট টব, গয়নার বাক্সের মতো পণ্য আছে তাঁদের। টুপি আর মোজা কিনতে ফ্যাশনিস্তারা আসতে পারেন স্ট্রেইট আউট টোকোর স্টলে। পাশেই ঢাকা মেকার্সের মার্চেন্ট স্টলে স্টিকার, টোট ব্যাগ, প্যাচওয়ার্ক, নোটবুকও বেশ বিক্রি হচ্ছে।
মেকার্স মার্কেটের শেষ মাথার কর্নারের দোকানটা যেন সবার চেয়ে আলাদা। আর এখানেই তরুণ-তরুণীদের বিশেষ আগ্রহ। ফুটপাত নামের এই স্টলে আছে সব সেকেন্ড হ্যান্ড পণ্য। কম দামে সুন্দর আর স্টাইলিশ সব পোশাক, অনুষঙ্গ বিক্রি করছেন স্বত্বাধিকারী শাহাদাত হোসেন।

মুখভর্তি সাদা দাড়ির এই মানুষকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে চেনেন না, এমন লোকের সংখ্যা কম। ঢাকা মেকার্সে এর আগের আসরেও এসেছিলেন তিনি।
যাঁরা একটু ফিউশনভিত্তিক পাহাড়ি গয়না ভালোবাসেন, তাঁরা মেকার্স মার্কেটে ঢুকে বক্স অব অর্নামেন্টসে চলে আসতে পারেন। হাতে তৈরি মেটাল ও ব্রাশ মেটালের গয়না নিয়ে তাদের কাজ। পার্বত্য অঞ্চলের গয়নাগুলো তুলে ধরাই ব্র্যান্ডটির মূল লক্ষ্য।

আদিবাসীদের নিজস্ব গয়নাগুলোর ডিজাইন ও মোটিফ থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মেটালে তৈরি করা হয়েছে ফিউশনধর্মী দুল ও নেকপিস। যেমন চাকমাদের পিনন–হাদির প্যাটার্ন ফুটে উঠেছে কিছু গয়নায়। ডিজাইনেও আছে পার্বত্য অঞ্চলের ছোঁয়া।

লাইফস্টাইল ব্র্যান্ড গেরোর স্টলে ঢুকলে যে কারোরই মন ভালো হয়ে যাবে। ছিমছামভাবে সাজানো হয়েছে তাদের পণ্যগুলো। কুরুশের তৈরি দুল, মালা, ব্রেসলেট আছে এখানে। জার, ওয়াল হ্যাংগিং, ব্যাগের মতো পণ্যগুলো পাওয়া যাবে এখানে।
আর ইকিগাইকে এখন চেনন না, এমন মানুষের সংখ্যা কম। কাঠের তৈরি তৈসজপত্র তৈরিতে নতুন মাত্রা দিয়েছেন ফ্যাশন ডিজাইনার মিয়া সানি। বেশ কয়েক বছর ধরে আলোকির আয়োজনগুলোতে তাঁর উপস্থিতি চোখে পড়ে। এবারও এর ব্যতিক্রম হয়নি।


মেকার্স মার্কেটে এমন অনেক অভিনব পণ্যের পসরা সাজিয়েছেন উদ্যোক্তারা। কী নেই এখানে। তবে নিজে দেখে, ছুঁয়ে পছন্দের পণ্য কিনতে হলে আজ শেষ দিনে ঢাকা মেকার্সে আসতেই পারেন। পাশাপাশি উপভোগ করা যাবে এখানকার খাবারদাবার, উষ্ণ আবহ আর মেতে ওঠা সংগীতের মূর্ছনায়।
ছবি: অনিক মজুমদার