
দান মানেই শুধু অর্থ দেওয়া নয়। কখনো এক ব্যাগ রক্ত, কখনো নিজের তৈরি পণ্যের জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম, আবার কখনো কয়েক কিলোমিটার দৌড়—ছোট ছোট উদ্যোগও হয়ে উঠতে পারে বড় পরিবর্তনের শুরু। এই ভাবনাকেই সামনে রেখে আইএইচজি হোটেলস অ্যান্ড রিসোর্টসের ‘গিভিং ফর গুড মান্থ ২০২৬’-এর অংশ হিসেবে সেপ্টেম্বরজুড়ে নানা সামাজিক উদ্যোগ আয়োজন করেছে ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশান।
আইএইচজির ‘জার্নি টু টুমরো’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে আয়োজিত এসব কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন হোটেলের কর্মী, নারী উদ্যোক্তা, করপোরেট পার্টনার, অতিথি ও স্থানীয় কমিউনিটির সদস্যরা। রক্তদান, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য মার্কেট, চ্যারিটি রান এবং ব্যক্তিগত অনুদানের মধ্য দিয়ে মাসব্যাপী এই উদ্যোগ শেষ হয়েছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ১২ লাখ টাকা তহবিল সংগ্রহের মধ্য দিয়ে।
‘গিভিং ফর গুড’-এর যাত্রা শুরু হয় ‘ড্রপস অব হোপ’ নামে রক্তদান কর্মসূচির মাধ্যমে। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আয়োজিত এই ক্যাম্পে ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানের প্রায় ৫০ শতাংশ কর্মী স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন থ্যালাসেমিয়া রোগী ও তাঁদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।

নারী উদ্যোক্তাদের সামনে এগিয়ে দেওয়ার ভাবনাও ছিল এই উদ্যোগের অন্যতম আকর্ষণ। ‘W.O.W Market—Women of Worth and Wonder’-এর দ্বিতীয় সংস্করণে অংশ নেন ৩০ জন নারী উদ্যোক্তা, কারিগর ও সৃজনশীল পেশাজীবী।
পোশাক, হস্তশিল্প, পাট ও নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি পণ্য থেকে শুরু করে ঘরে তৈরি খাবার— স্থানীয় সৃজনশীলতার নানা রূপ উঠে আসে এই বাজারে। প্রতিটি উদ্যোক্তা স্টল বাবদ ৩ হাজার টাকা করে দেন, যার পুরো অর্থ দেওয়া হয় সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করা ‘মজার স্কুল’-কে। অন্যদিকে তাঁদের পণ্য বিক্রির সম্পূর্ণ অর্থ যায় উদ্যোক্তাদের কাছেই।

স্বাস্থ্য, ফিটনেস আর সমাজসেবাকে একসঙ্গে নিয়ে আসে ‘রান ফর চ্যারিটি: মিনিংফুল ম্যারাথন ২.০’। পাঁচ কিলোমিটারের এই দৌড়ে অংশ নেন ২০০ জনেরও বেশি মানুষ। তাঁদের মধ্যে ছিলেন হোটেলের কর্মী, করপোরেট পার্টনার, কমিউনিটির সদস্য, দৌড়প্রেমী এবং বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক খেলোয়াড় জাহিদ হাসান এমিলিও।
প্রতিজনের ১ হাজার ৫০০ টাকা অংশগ্রহণ ফি থেকে ৩ লাখ টাকার বেশি সংগ্রহ হয়, যা ‘মজার স্কুল’-এর জন্য গঠিত তহবিলে যুক্ত করা হয়।
মাসব্যাপী উদ্যোগের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে ১ অক্টোবর আয়োজিত ‘জয় অব গিভিং চ্যারিটি ডিনার’-এর মধ্য দিয়ে। এই আয়োজনে হোটেলের কর্মীরা ব্যক্তিগতভাবে দেড় লাখ টাকা অনুদান দেন। সব মিলিয়ে ‘গিভিং ফর গুড’ উদ্যোগ থেকে ‘মজার স্কুল’-এর জন্য সংগ্রহ করা হয় মোট ১২ লাখ টাকা।
ডোরিনের সিনিয়র গ্রুপ অ্যাডভাইজর ও বোর্ড সদস্য ফিরোজ আসাদ, ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানের জেনারেল ম্যানেজার কার্থি ভিকে এবং ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্ট–এর ক্লাস্টার জেনারেল ম্যানেজার অশ্বিনী নায়ার আনুষ্ঠানিকভাবে ১২ লাখ টাকার চেক তুলে দেন ‘মজার স্কুল’-এর প্রতিষ্ঠাতা আরিয়ান আরিফের হাতে। এই অর্থ ২০০ জনেরও বেশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুর শিক্ষা, পুষ্টি ও প্রয়োজনীয় সহায়তায় ব্যবহৃত হবে।
ডোরিনের সিনিয়র গ্রুপ অ্যাডভাইজর ও বোর্ড সদস্য ফিরোজ আসাদ বলেন,
ডোরিনের সিনিয়র গ্রুপ অ্যাডভাইজর ও বোর্ড সদস্য ফিরোজ আসাদ বলেন, “আমার কাছে সবচেয়ে আনন্দের বিষয় হলো, এটি কোনো একক আয়োজনে সীমাবদ্ধ থাকেনি: বরং পুরো টিম ‘ড্রপস অব হোপ’, ‘ওয়াও মার্কেট’, ‘মিনিংফুল চ্যারিটি রান’ এবং সর্বশেষ ‘জয় অব গিভিং ডিনার’-এর মধ্য দিয়ে দানের একটি অর্থবহ আয়োজনের ধারাবাহিকতা তৈরি করেছে।”
তিনি ‘মজার স্কুল’-এর প্রতিষ্ঠাতা আরিয়ান আরিফের উদ্যোগেরও প্রশংসা করেন। তাঁর মতে, শিশুদের জন্য শুধু আশ্রয় ও যত্ন নিশ্চিত করাই নয়, বরং তাদের শিক্ষা এবং একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ করে দেওয়ার ক্ষেত্রেও ‘মজার স্কুল’-এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানের জেনারেল ম্যানেজার কার্থি ভিকে বলেন, “কোনো সমাজসেবা তখনই সত্যিকার অর্থে অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা প্রচারণার সীমা পেরিয়ে একটি যৌথ অঙ্গীকারে পরিণত হয়। গেল মাসে আমাদের সহকর্মী, পার্টনার, উদ্যোক্তা, দৌড়বিদ এবং অতিথিরা নিজ নিজ জায়গা থেকে যেভাবে এগিয়ে এসেছেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।”
‘জয় অব গিভিং চ্যারিটি ডিনার’ ছিল শুধু তহবিল হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ছিল আনন্দ ও উদযাপনেরও উপলক্ষ। অনুষ্ঠানে জাদুকর সাকলাইন হোসেনের ম্যাজিক পারফরম্যান্স, কমেডি পরিবেশনা এবং ‘মজার স্কুল’-এর শিক্ষার্থীদের বিশেষ সাংস্কৃতিক পরিবেশনা অতিথিদের মুগ্ধ করে। পরে সংগীত পরিবেশনা ও বুফে ডিনারের মধ্য দিয়ে শেষ হয় সন্ধ্যা।
এক মাসের এই আয়োজন যেন মনে করিয়ে দিল—ভালো কাজ সবসময় বড় কোনো উদ্যোগ দিয়েই শুরু হয় না। কখনো রক্তদান, কখনো একজন উদ্যোক্তার পাশে দাঁড়ানো কিংবা কয়েক কিলোমিটার দৌড়ও তৈরি করতে পারে সম্মিলিত পরিবর্তনের পথ। ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানের ‘গিভিং ফর গুড’ সেই ছোট ছোট উদ্যোগগুলোকে একসঙ্গে এনে দুই শর বেশি শিশুর জন্য শিক্ষা, পুষ্টি ও ভবিষ্যতের নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।
ছবি: ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশান